দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

১
মধুপুরে এসছি ক দিন হল। অদ্ভুত শান্ত এক জনপদ। এককালে বাঙালিরা থাকতেন অনেকেই। যেমন থাকতেন বেনারস বা ঘাটশিলা বা দেওঘরেও। আমাদের সাহিত্য-সিনেমায় ফিরে ফিরে এসেছে তাই এইসব এলাকা। আজ, বাংলা হোর্ডিং প্রায় নেই বললেই চলে এখানে। বাঙালিরাও হাতেগোনা। মাঝে রাজনীতির দৌরাত্ম্যে এত স্বাস্থ্যকর হাওয়ার জায়গাতে, যেখানে নিয়মিত বাঙালিরা ‘হাওয়া বদল’ করতে আসত, সেখানে ট্যুরিস্ট স্পট গজিয়ে উঠতে পারেনি। তবু, বাঙালির এই আবহমানের ‘পশ্চিম’ বড় সুন্দর। গাছপালা প্রচুর। হাওয়ায় কিছু একটা আছে, যাতে বারবার মনে হচ্ছে, মনটা হালকা হয়ে যাচ্ছে…আর, খুব খিদেও পাচ্ছে…
২
এই যে জনপদ, অর্থাৎ দেওঘর-মধুপুর-গিরিডি-ঘাটশিলা, বাঙালির প্রিয় পশ্চিম, ছোটবেলায় প্রফেসর শঙ্কুর কারণেই আমাদের চেনা হয়ে যায়। গিরিডির উশ্রী নদীর ধারে কত বড় বড় গবেষণায় ব্যস্ত তিনি। সাথে প্রিয় বেড়াল নিউটন। ভাবছিলাম, সত্যজিৎ কত না কৌশলে নিজের দেশকে বড় করে দিয়েছেন বারবার শিশুদের মনে। সারা দুনিয়া শঙ্কুকে ডাকলেও, শঙ্কু এই পোড়ো গরিডিতেই থাকবেন। কোত্থাও যাবেন না। পাশেই উশ্রী নদী। আসলে শঙ্কুর মতই এককালে, বহু বাঙালি থাকতেন এসব জায়গায়। আজও তাঁদের সুন্দর বাড়িগুলো রাখা নানা জায়গায়। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এ যেমন সত্যজিত ধরে রাখেন বেনারসে বাঙালির বসবাসের ইতিহাস। আজ সেটাও অতীত প্রায়।
এসবই ভাবছিলাম রাস্তায় যেতে যেতে। ঘাটশিলায় থাকতেন বিভূতিভূষণ। আরেক বিস্ময় বিশ্বসাহিত্যের। সুমন বিভূতিভূষণের গানে, ঘাটশিলার কথা লিখতে লিখতে শেষে লিখেছিলেন, এই পথে একা একা হাঁটতেন বিভূতিভূষণ…
বাঙালির পয়সা ছিল না তেমন কোনওকালে। কিন্তু কল্পনা ছিল। এইসব জনপদ তাঁর সাখ্য দেয়, আজও…
৩
কাল সারাদিন জার্নি করছিলাম। মধুপুর থেকে দেওঘরের দিকে। রাস্তায় বিকেলের পর সন্ধ্যা নামছিল। কমলা রঙের আকাশ গধূলিতে। তারপরেই এই চাঁদের দেখা পেলাম। কোজাগরীর চাঁদ! সারাটা রাস্তা তারপর ওঁর সাথেই…নিজেকে মনে হচ্ছিল আদিম এক ভবঘুরে, হিউ এন সাঙ ধরণের কেউ, যাঁকে একমাত্র পথ চিনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে ওই চাঁদ, কোজাগরীর দিনের অপরূপা…
৪
শিমুলতলা। নামটা শুনলেই কেমন মনকেমন করে ছেলেবেলা থেকে। কেন যে মনে পড়ে যায়, সত্যজিতের গল্পের একা চরিত্রদের! যাদের পুজোর ছুটিতে কেরানি জীবনে একা ঘুরতে এসে অদ্ভুত কিছু ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে হয় বা দাদার কীর্তি-র সেই ছন্দবাণী ক্লাব…বা আরও অনেক কিছু…এবারেও মধুপুর-দেওঘর আসব ভেবে, প্রথমেই মনে পড়ল শিমুলতলা আর শিমুলতলার এই বিখ্যাত নলডাঙা রাজবাড়ি…কত সিনেমায় দেখেছি এই ভাঙা রাজবাড়ি যেন জলসাঘরের ছবি বিশ্বাস হয়ে বুক চিতিয়ে খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আজও…
ফাইনালি, আজ পৌঁছনো গেল সেই ভুতূড়ে ভাঙা রাজবাড়িতে…মৃণাল সেনের ‘খণ্ডহর’ মনে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সিনেমার সেটে চলে এসছি…সেই বিস্তীর্ণ চরাচর, দূরে ঝাপসা পাহাড় আর ঢেউ খেলানো মাঠ…তার পেছনে আরও ঝাপসা অরণ্য…
ভেবে কান্নাই পেল, একটা সময়ে বাঙালি জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এই শিমুলতলা, আজ সেখানে শুধুই অবহেলা আর অযত্নের ছাপ সর্বত্র…শুধু এই যশোরের রাজার রাজবাড়ির ভেতরে ঢোকার পর কিছুটা সময় হারিয়ে গেলাম…শুনতে পেলাম, রাজা বলছেন, রাজত্ব যদি করতে হয়, তবে এরকম রাজকীয় প্রকৃতির মাঝেই করব…নাহলে করব না!
৫
সব যাত্রারই শেষ হয়। এবারের আমাদের ট্রিপও শেষ হল যথা নিয়মেই। আবার ফিরে রোজকার দৌড়। কি পেলাম এ ক দিন? বাঙালি যুগ যুগ ধরে সাধের পশ্চিমে এসে, নিজেকে হাওয়া বদলে যেভাবে খুঁজে পেয়েছে, কিছুটা হয়ত তাইই…অনেকেই ফেসবুকে এই ট্রিপের ছবি দেখে জানতে চাইছেন, কীভাবে আসবেন…বুঝতে পারছি, নতুন বাঙালির মানচিত্রে কিছুটা ফিরে হয়ে গেছিল এই জনপদ। হয়ত তাই হঠাৎ অনেকে ফিরে পেতে চাইছে অতীত, শেকড়…অজানা শেকড়…আর, সে সন্ধানের সাথেই
সবার জন্য প্যাড়া কিনে ফিরছি…এখান থেকে নেওয়ার মত তেমন গিফট নেই যেহেতু…