ফ্রান্সিস হ্যালজেন: ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী এবং ‘ভুতুড়ে কণা’ নিউট্রিনোর শিকারী

সুবীর সেন
২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর, স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ঘোষণা করল পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের নাম। বিজয়ী একজনই—বেলজিয়াম-জন্মিত আমেরিকান পদার্থবিদ ফ্রান্সিস লুই হ্যালজেন (Francis Halzen)। তিনি পুরস্কৃত হন “আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে তাঁর নির্ণায়ক অবদান এবং জ্যোতির্পদার্থিক উৎসের উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য”।
হ্যালজেন ১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামের টিনেন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে লুভেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৬৯ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কিছুদিন সার্নে কাজ করার পর ১৯৭২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন—মহাকাশের সবচেয়ে রহস্যময় কণাকে ধরার স্বপ্ন।
নিউট্রিনোকে বলা হয় ‘গোস্ট পার্টিকল’ বা ভুতুড়ে কণা। এরা প্রায় ভরহীন, চার্জহীন এবং পদার্থের সঙ্গে অত্যন্ত কম মিথস্ক্রিয়া করে। প্রতি সেকেন্ডে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে কোটি কোটি নিউট্রিনো চলে যায়, কিন্তু আমরা কিছুই টের পাই না। সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো সহজেই ধরা যায়, কিন্তু মহাবিশ্বের দূরবর্তী বিস্ফোরণ বা কৃষ্ণগহ্বর থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো ধরতে হলে দরকার বিশাল আকারের ডিটেক্টর।
১৯৮৮ সালে হ্যালজেন একটি বিপ্লবী ধারণা উপস্থাপন করেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ বরফই হতে পারে সবচেয়ে আদর্শ ডিটেক্টর। যখন একটি নিউট্রিনো বরফের কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়, তখন ক্ষণিকের জন্য আলোর ঝলকানি সৃষ্টি হয়। সেই আলো ধরতে পারলেই নিউট্রিনোর পথ ও উৎস জানা সম্ভব।
প্রথমে অনেকেই তাঁর ধারণাকে পাগলামি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। হ্যালজেন নিজেও পরে স্বীকার করেছেন, “যখন আমরা শুরু করেছিলাম, সবাই বুঝত এটা ভালো আইডিয়া হতে পারে, কিন্তু খুব কম লোকই বিশ্বাস করত যে এটা সত্যি কাজ করবে—আমি নিজেও না।” তবু তিনি হাল ছাড়েননি। প্রথমে তৈরি হয় ছোট আকারের এএমএএনডিএ (AMANDA) পরীক্ষা। তারপর শুরু হয় বিশাল প্রকল্প—আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
দক্ষিণ মেরুর আমন্ডসেন-স্কট স্টেশনে এক ঘনকিলোমিটার বরফের মধ্যে হাজার হাজার অপটিক্যাল সেন্সর বসানো হয়। ২০০৫ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ২০১১ সালে পুরোপুরি চালু হয় আইসকিউব। এতে অংশ নিয়েছিল ১৪টি দেশের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪৫০ জনেরও বেশি বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। হ্যালজেন ছিলেন এর প্রধান গবেষক।
২০১৩ সালে আইসকিউব প্রথমবারের মতো মহাজাগতিক উৎসের উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো স্পষ্টভাবে শনাক্ত করে। এরা এত শক্তিশালী যে সার্নের লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের কণার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি শক্তিসম্পন্ন। ২০১৭ সালে একটি ব্লাজার (TXS 0506+056) থেকে আসা নিউট্রিনোর উৎস নিশ্চিত করা হয়। ২০২৩ সালে আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কি ওয়ে থেকেও নিউট্রিনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এভাবে নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা হয়—যেখানে আলো বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বাইরেও মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করা যায়।
নোবেল ঘোষণার সময় হ্যালজেন ইতালিতে এক সম্মেলনে ছিলেন। ফোনে তিনি বলেন, “এটা এক বিরাট বিস্ময় এবং আনন্দ। আমি আশা করি এই পুরস্কার সেই সাহসী মানুষদের প্রতিফলিত করবে, যারা প্রকল্পের শুরুতে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল।” ৮২ বছর বয়সে এই স্বীকৃতি পেয়ে তিনি আরও বলেন, “আজ আমি একটা প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছি। আশা করি এই পুরস্কার সেটা অনুমোদন পেতে সাহায্য করবে।”
হ্যালজেনের গল্প শুধু একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়। এটা অধ্যবসায়, সাহস এবং বিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প। দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই ক্ষণিক আলোর ঝলকানি আজ মহাবিশ্বের দূরতম বিস্ফোরণ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অজানা মহাজাগতিক ঘটনার বার্তাবাহক হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সিস হ্যালজেন সেই বার্তাবাহকদের শিকার করে মানবজাতিকে এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছেন—যেখানে নিউট্রিনোরাই মহাবিশ্বের গোপন কথা বলে।