অভিজিৎ বসু
আগে যা ঘটেছে : দুশো বছর বা তারও বেশি সময়ের পুরনো বাস্তুভিটে ছেড়ে চলে গিয়েছিল অর্পণ, যেতে বাধ্য হয়েছিল ‘পরিবর্তনে’র সময়ে। আর অর্পণের চোখ দিয়েই দেখা আর-এক কিশোরের গল্প পড়তে শুরু করেছিলাম আমরা। অর্পণের যেমন ছিল ক্রিকেট, তার ছিল ফুটবলার হবার অদম্য স্বপ্ন যা বাস্তবায়িত করতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তার গুরু, ঈশ্বরতুল্য সতুদা। সেই সতুদাকেই একদিন খেলার মধ্যে গুলিবিদ্ধ হতে দেখে ভজা। সে পাগল হয়ে যায়, ভোরের ঘুম ভেঙে গেলে বুঝতে পারে না— এ স্বপ্ন, নাকি বাস্তব! সকালের আলো ফুটতেই সে দৌড় লাগায় বোসপাড়ার দিকে, যাবার সময়ে মা বলে দেন ফেরার পথে রামধনিয়ার মাঠ থেকে একটু কাঠের গুঁড়ো আর গোবর নিয়ে আসতে। সাতসকালে বোসপাড়ার ব্যানার্জিবাড়ির দরজায় ধাক্কা দেয় ভজা। তারপর? পড়তে থাকুন ‘ঝাপসা চোখে দেখা, সেই শহর’।
৪
‘You that build the death planes
You that build all the bombs…’
— Bob Dylan
হরেকরকমের পাখি উড়ে বেড়াত পদ্মদের দিঘিটাকে ঘিরে। কত বিচিত্র রূপ আর রঙ তাদের! হাতিশুঁড়, কাঠঠোকরা, ফিঙে, দোয়েল, শ্যামা, মাছরাঙা ছাড়াও আরও কত কী! স্টেশন-ফেরত অর্পণকে এই সবকিছু চিনতে শিখিয়েছিল তার মেজদাদু আর ছোটমামা। রেললাইনের ধারে ছিল সারি-সারি আকাশছোঁয়া তালগাছ, তাতে বসে থাকত ইয়া বড়-বড় সব শকুন। ওই অল্প বয়সেই একদিন জীবনে প্রথমবার যুদ্ধের আঁচ পেয়ে গেল সে! এক ভরা শীতের দুপুরে মামাবাড়ির ছাদ থেকে হাউইয়ের মতো সাঁইসাঁই করে উড়ে যেতে দেখল ঝাঁকে-ঝাঁকে যুদ্ধবিমান। তারা যে পুব আকাশের মুক্তিযুদ্ধে উড়ে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছিল অর্পণের। যুদ্ধকালীন ওই সময়টায় সন্ধে হলেই গোটা এলাকাজুড়ে নেমে আসত অন্ধকার, যার পোশাকি নাম ছিল ব্ল্যাক-আউট! গৃহস্হেরা সব দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে থাকতেন, আর নিতান্ত দরকার পড়লে টর্চের কাঁচে ভুসোকালি লেপে নিয়ে রাস্তায় বের হতেন। যুদ্ধপরিস্থিতির অবসানে অবশ্য শকুনগুলোকে আর দেখা যায়নি।
সীমান্তের ওপার থেকে দলে-দলে মানুষের এপারে চলে আসা, সেই সময়ে। বহুকাল পরে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ভিডিও-য় নিজেদের বাপঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে আসা লক্ষ-লক্ষ নিরন্ন সহায়সম্বলহীন মানুষকে ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে সীমান্ত পেরোতে দেখেছিল অর্পণ।

ছবি: অভিজিৎ বসু
প্রায় একছুটে হাঁপাতে-হাঁপাতে সতুদার ঘরে এসে ঢুকল ভজা। ঘরের বেশিরভাগটাই বইয়ে ঠাসা। ছোট একটা খাটে সতুদার শোবার জায়গা। দেয়ালে আটকানো নানা মানুষের পোস্টার, যাদের কাউকেই প্রায় ভজা চেনে না। কেবল একজনকে ছাড়া, তিনি পেলে। সতুদা প্রায় জোর করেই পেলের গোটা নাম মুখস্থ করিয়েছিল ভজাকে দিয়ে, যা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভজা মনে রেখেছিল: এডসন এরান্তস ডি নাসিমেন্টো ডি পেলে। ঘরে বিবিধ খবরের কাগজের কাটিং। এসব নিয়ে সতুদার কী কাজ, ভজা তা জানে না। সতুদার সঙ্গে তার আলাপ বেশিদিনের নয়। স্কুলের বর্তমান বনাম প্রাক্তনীদের ফুটবল ম্যাচে ভজার দেওয়া দু-গোলে প্রাক্তনীরা স্কুল টিমের কাছে হেরে যায়। সতুদা, মানে সত্যেন্দ্র ব্যানার্জি নিজে থেকেই ভজার সঙ্গে আলাপ করে এবং বাড়িতে আসতে বলে। গেম টিচার কানাইবাবু বলেছিলেন সতুদা নাকি পড়াশুনোয় খুব ভালো ছিল। কলেজ স্ট্রিটের প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ত ফিজিক্স নিয়ে। কিন্তু মাথায় কী পোকা ঢুকল কে জানে! সব ছেড়েছুড়ে দিল। মা বলেছিল— সতু পার্টি-পলিটিক্স করে, ওর সঙ্গে বেশি মিশিস না! সতুদার গলার আওয়াজে ভজার ঘোর ভাঙে, ‘সাতসকালে হাঁপাতে-হাঁপাতে! কী ব্যাপার রে ভজু?’ সতুদা জানতে চায়। ভোরের স্বপ্নটার কথা বলতে গিয়েও বলে উঠতে পারে না ভজা। ছলছল চোখে দুম করে সে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘তুমি কি নকশাল করো সতুদা?’
সীমান্ত আর জীবনের যুদ্ধ কোথাও কি একাকার হয়ে যায়?
সাতের দশক একদিকে যেমন ছিল মুক্তির দশক, একই সঙ্গে তা ছিল খুনোখুনিরও। আর ওই সাতের দশকেই কোনো এক বৃষ্টিস্নাত দিনে একহাঁটু কাদা ভেঙে অর্পণের ছোটদাদু তাকে কাঁধে করে জ্যোতি বসু দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন।
‘তা এই সাতসকালে এমন একটা উদ্ভট প্রশ্ন কেন? আর এ প্রশ্নের উত্তর আমি কী করে দিই বল তো! আগে বল, এরকম একটা প্রশ্ন করছিসই বা কেন?’ এবার ভজা সোজাসুজি ভোরের স্বপ্নটার কথা সতুদাকে বলে ফেলে। সতু বেশ খানিকটা গম্ভীর হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘আসলে এক-একজন মানুষ এক-একধরণের কাজ করার জন্য জন্মায়, এই যেমন তু্ই। তু্ই জন্মেছিস ফুটবল খেলার জন্য। অবশ্য ফুটবল খেলতে গিয়ে হাত-পা ভাঙা এমনকি ফুটবল মাঠে মারা যাবার ঘটনাও আকছারই ঘটে থাকে। তা বলে কি ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে গেছে? আমার যা কাজ তু্ই সেটা বুঝবি না, তবে সে-কাজে ঝুঁকি আছে, মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে! ওসব ছাড়, তোর খেলার কথা বল। ঠিকমতো প্র্যাকটিস করছিস তো? শরীরের যত্ন নে। মনে হচ্ছে ফুটবল খেলাটা এবার কুস্তিগীরদের খেলা হয়ে দাঁড়াবে। মাঠের বদলে ছেলেপিলেরা এবার আখড়ায় যাবে। পেলে, বেকেনবাওয়ার, জর্জ বেস্ট, ইউসেবিওদের যুগ বোধহয় শেষ হল রে ভজা। শরীর— শরীর তৈরি কর, নাহলে খেলতে পারবি না। সকালে কিছু খেয়েছিস, না খালিপেটে চলে এসেছিস?’ ভজা ঘাড় নাড়ে।
সতুদা বেরিয়ে যায়, ভজা দু-চোখ দিয়ে ঘরটা দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সতু দু-হাতে লুচি-তরকারি নিয়ে ঘরে ঢোকে। ভজা আস্তে-আস্তে খেতে থাকে। খাওয়া শেষ হলে সতুদা বলে, ‘শোন, কিছুদিনের জন্য আমাকে কলকাতার বাইরে যেতে হচ্ছে। কবে ফিরব জানি না। ফিরে এসে দেখা করব। আর যাবার আগে ওই প্যাকেটটা নিয়ে যাস। একজোড়া ফুটবল-বুট আছে। জানি না সাইজটা তোর ঠিক হবে কিনা, একটু লুকিয়ে নিয়ে যাস, বাপটা দেখলে আবার খিচখিচ করবে।’

ছবি: শীলভদ্র দত্ত
ভজার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করে ‘তুমি ফিরবে তো সতুদা?’ কোনো উত্তর আসে না। ঘর থেকে সে বেরিয়ে যায়। বারান্দায় আলতাপিসি সতুদার মাকে আলতা পরাচ্ছে। মা বলেছে আলতাপিসিরা কেবল বড়লোকদের বাড়িতেই আলতা পরায়। ভজা ফুটবল-বুটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগাল আর মা’র বলে-দেওয়া গোবর আর কাঠের গুঁড়োর কথাটা বেমালুম ভুলে গেল।
অর্পণের মাথায় কেবল ক্রিকেট। তা সে শীত-গ্রীষ্ম-বসন্ত যা-ই হোক। অর্পণ বিশ্বনাথের মতো ব্যাটসম্যান হতে চাইত, স্বপ্নে জাগরণে। ‘অপরাজিত আনন্দ’-তে ঠিক যেমনটা হয়েছিল।
কখনও কোনো নিস্তব্ধ, নিঝুম গ্রীষ্মকালীন দুপুরে জানালার খড়খড়ি দিয়ে খুচরো গুঁড়ো আলো ঝরে পড়ত অর্পণের মুখের ওপর, বুনে দিত এক মায়াবী নকশা। নৈঃশব্দ্য ভেঙে এবার এক ফেরিওলা ডেকে উঠল, ‘পুরনো কাপড় দিয়ে নতুন বাসন লাগবে, মা?’ মাথার ওপর পাখা ঘুরছে শব্দহীন। অন্ধকার ঘরের কোণ থেকে একটা নেংটি ইঁদুর হঠাৎ-ই ত্রস্ত লাফে বন্ধ দরজার চৌকাঠ পেরোতে চাইছে! খড়খড়িটা অকারণ একবার উঠিয়ে, একবার নামিয়ে একরাশ আলো ঘরে ছিটিয়ে দিত অর্পণ। এ ছিল তার একান্ত নিজস্ব খেলা। দ্বিপ্রাহরিক ঘুম ভেঙে গেলে মা রেগে যেতেন, বলতেন— সারাদিন খাটাখাটনির পর একটু ঘুমোতেও দিবি না ঠিক করে! পাশেই কাপুরদের বাড়ির ছোট্ট ছেলেটা বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ঘুড়ি হাতাতে গিয়ে ছাদের আলসে থেকে পড়ে গেল। সেই থেকে অর্পণের একা ছাদে ওঠা বারণ। ও শুনেছে ওর বড়দার ঘুড়ি আর ছোড়দার পায়রার শখ ছিল। অর্পণ কিন্তু কোনোদিন শাদা, নীলচে অথবা কালো আকাশে ঘুড়ি ওড়ায়নি। ওদের জানালায় কাঁচের শার্সি ছিল, কড়ি-বরগা জুড়ে সার দিয়ে বাসা বানাত উইপোকারা। সন্ধেবেলায় ঘরে-ঘরে শাঁখ বেজে উঠত। ঠাকুরঘরে আরতি হত। মা গিয়ে দাঁড়াতেন। অর্পণও যেত মা’র সঙ্গে কোনো-কোনো দিন।

ছবি: অভিজিৎ বসু
একদা বিশাল বোসবাড়ির ছাদটিও ছিল বিশাল। ভাগাভাগির চিহ্নস্বরূপ এবাড়ি-ওবাড়ি-সেবাড়ির মধ্যিখানে দরজা বসানো হয়েছিল। দরজাগুলো খোলা না বন্ধ, তা দেখে ঠাহর করা যেত দু-বাড়ির মধ্যেকার সম্পর্কের বহর!
সময় ছুটে চলে ভজার। সতুদার দেওয়া বুট, পাঁচ নম্বরের ফুটবল আর একমুঠো ছোলা নিয়ে মাঠে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের বল পেটানো, অল্প দৌড়, তারপর বাড়িতে ফিরে-আসা। চান করে দু-মুঠো মুখে গুঁজে স্কুল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ফের বল পেটানো। এ-ই হচ্ছে ভজার দুনিয়া। সতুদার খবর নেই বেশ কিছুদিন হল। ভজার যখন তিন বছর বয়স, ওর বাবা মারা যান। একটু বড় হয়ে বাবাকে নিয়ে ভজার কোনো অভাববোধ ছিল না। কারণ ভজার মা ছিল। খুব ভোরে উঠে মা রান্নাঘরে যেতেন। ঘুঁটে, গুল, কাঠ, কাঠের গুঁড়ো এবং অল্প কয়লায় উনুন ধরাতেন। একটা ভাঙা হাতপাখা দিয়ে হওয়া করতে-করতে প্রায় আধ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় উনুনে আঁচ উঠত। বহুক্ষণ ধোঁয়ার মধ্যে বসে থেকে কোনো-কোনো দিন খুব কাশতেন, ওঁর লাল-হয়ে-যাওয়া চোখ থেকে তখন টপটপ করে জল পড়ত। বাড়িতে কড়া শাসন না থাকলেও মা চাইতেন ভজা নিয়ম করে পড়তে বসুক। ভজা তা-ই করত। ও স্কুলে চলে গেলে মা-ও বেরিয়ে পড়তেন শেঠিয়ার ছাতার কারখানার উদ্দেশে। মা’র ওই একশো পঁচিশ টাকার মাসিক রোজগারই ওদের সংসারের একমাত্র সম্বল। শত অভাবেও ভজা মাকে কখনও ধার করতে দেখেনি।
অর্পণদের বাড়ির কালীপুজো সে-যুগে ওই অঞ্চলে ছিল বেশ নামকরা। পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে ঠাকুরদালান পরিষ্কারে মেতে উঠত ছোটরা। আগের দিন একটু গভীর রাতের দিকে প্রতিমা আসতেন ডোলায় চড়ে। পুজোর দিন সকাল থেকেই সাজসাজ রব! সন্ধ্যা বা একটু রাতের দিকে পুজো হত। ছোটরা বাজি পোড়ালেও শব্দবাজির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ঠাকুরদালানটা ওর এক জ্যাঠাবাবুর ভাগে পড়েছিল। উনি আবার সেটাকে ওই অঞ্চলের শ্রদ্ধেয় ডাক্তারের স্মৃতিতে গড়ে-ওঠা এক লাইব্রেরিকে ভাড়া দিয়ে দেন।
পুজো শেষ হলে ওর সেই জেঠু মা কালীকে নিজের হাতে ভোগ খাওয়াতেন। তখন অন্যদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। জেঠু কাঁদতেন, ওর চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ত আর বিলাপের মতো সুর করে-করে তিনি বলে যেতেন, ‘খাও, খাও মা!’
এইরকম এক কালীপুজোর সন্ধেবেলাতেই অর্পণ ফুলঝুরি দিয়ে ওর দিদির গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। নাহ্, তেমন বড় কিছু ঘটেনি।
বাতাস তখন বারুদে ঠাসা আর আকাশে বিদ্যুতের চমক!

ছবি: অভিজিৎ বসু
ঠাকুরদালানের টিনের পার্টিশনের ওপার থেকেই এই সবকিছু দেখেছিল ছোট্ট অর্পণ। আর, একবার তার চোখ পড়ে গেছিল পাশের ঝাপসা কাঁচের দেওয়াল-আলমারিতে রাখা একটা বইয়ের দিকে— ‘Das Kapital: Kritik der politischen Ökonomie’। জেঠু কেঁদেই চলেছেন, বাইরে হালকা বাজির শব্দ, দূরে কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে : পৃথিবীর কেউ ভালো তো বাসে না, এ পৃথিবী ভালোবাসিতে জানে না…।
(চলবে)