লিখছেন: সৌম্যা ঘোষ

পুজোর ভিড়ে পুজোর চারদিন প্রায় সবাই তাকিয়ে থাকে বনেদি বাড়ির খোঁজে। কিন্তু এইসব ঐতিহ্যময় বনেদি বাড়ির ইতিহাসগুলো কী? বিডন স্ট্রিটের দত্ত বাড়ির সঙ্গে কথা বলল ট্রামলাইন।
দত্ত পরিবারের পুজোর বিশেষত্ব, সপরিবারে দুর্গা প্রতিমাটি। সেখানে উপস্থিত স্বয়ং শিবও। শিবের কোলেই দেবী দুর্গার অবস্থান।
কিন্তু কেন এমন প্রতিমা পরিকল্পনা? এর পিছনে রয়েছে দত্ত পরিবারের নিজস্ব পারিবারিক বিশ্বাস।
দত্ত পরিবারের সদস্য অজয় দত্তের দাবি, তাঁরা চাঁদ সওদাগরের উত্তরসূরি। চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবের উপাসক। সেই সূত্রেই দত্ত পরিবারের আরাধ্য দেবতা শিব। পরিবারের বিশ্বাস, অসুর নিধনের পর দেবী দুর্গা সপরিবারে বাপের বাড়ি আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন স্বামী শিবকেও। তাই শ্বশুরবাড়িতে জামাইয়ের যে রকম আপ্যায়ন হয়, মহাদেবকেও তেমনই মর্যাদায় বরণ করে নেওয়া হয়।
তবে এই আপ্যায়নে ভোগ নয়, থাকে নৈবেদ্য। ফলমূল, চাল, ডাল-সহ পাঁচ রকম শস্য। রাতে দেবীর জন্য থাকে ‘শীতল ভোগ’। ঘিয়ে ভাজা লুচি, আলুভাজা, পাঁচ রকম ভাজা, ক্ষীর, পায়েস, রাবড়ি-সহ নানা মিষ্টির আয়োজন করা হয়। জামাইকে আপ্যায়নের মতো করেই হয় এই বিশেষ আয়োজন।
দত্ত পরিবারের আদি ভিটে বীরভূম। পরবর্তীকালে ভাগ্যান্বেষণে তাঁরা বর্ধমানে আসেন। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে, আনুমানিক ১৭৮০-৯০ সালের মধ্যে, পরিবারের সদস্যরা চলে আসেন সুতানুটিতে।তিনি জানান, ১৮৭৫ সালে শোভাবাজারের বাড়িতে শুরু হয়েছিল কালীপুজো। পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে নতুন করে দুর্গাপুজো শুরু হলেও বাড়ি ছোট হওয়ায় পুজোর আয়োজন হয় বারাণসীতে। সেখানে নিজস্ব বাড়ি ও ঠাকুরদালান তৈরি করে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত পুজো চলে। এরপর ১৯১৪ সালে পুজো ফিরে আসে কলকাতার শোভাবাজারের বাড়িতে।
১৯২৩ সালের শেষ দিকে বিডন স্ট্রিটের ভোলানাথ ধাম বাড়িটি বিশ্বাস পরিবারের কাছ থেকে কেনা হয়। সংস্কারের পর থেকে বিডন স্ট্রিটের এই বাড়িতেই দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।
সময়ের সঙ্গে প্রতিমার আকার বড় হয়েছে। পুজোয় একসময় এন. সি. পাল ও কালী পাল প্রতিমা নির্মাণ করেছেন। গত প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর ধরে প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সুরেন্দ্রনাথ পাল ও তাঁর পরিবার। বর্তমান প্রতিমা শিল্পী লক্ষ্মণ চন্দ্র পাল।সময়ের সঙ্গে শহরের পুজোয় এসেছে পরিবর্তন। বদলেছে মণ্ডপসজ্জা, বেড়েছে থিমের চাকচিক্য। আর এইসব কিছুর মাঝে এখনও বনেদি পরিবারগুলো এভাবেই তাদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে।