বাবা সন্দীপন সম্পর্কে দু একটা কথা:
কন্যা তৃণা চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ
শুনলেন দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে বাবা হিসেবে পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। ওঁর মত এত দায়িত্ববান পিতা ক জন আছেন জানিনা।
আমি দীর্ঘদিন কলকাতার বাইরে থাকি। যখন অল্প বয়েস তখন ফেরার সময়ে প্রতিবার বাবা স্টেশানে ফ্লাস্কে চা আর বাচ্চার জন্য সেন মহাশয়ে-র সন্দেশ নিয়ে আসতেন। বাবা রোজ বাজার করতে যেতেন চেতলা বাজারে। শাক সবজি ছোট মাছ কিনে আনতেন সেখান থেকে। মারা যাবার কিছুদিন আগেও বাজার করতে গেছেন তিনি।

আমার মেয়ে বাইরেই বড় হয়েছে। বাংলা ভালো বলতে পারত না। কিন্তু বাবা হিন্দি শিখেছিলেন মেয়েকে চিঠি লিখবেন বলে। নানা ইন্ডোর গেমস খেলা হত একসাথে। বাবাও তাতে যোগ দিতেন। মনে আছে, ক্যারাম ইত্যাদি সবেই বাবা প্রথম হতেন। আমার ছেলে ছোট ছিল বলে খেলাতা বুঝত না ঠিক। তাতে বাবা ওকে মজা করে বলত, গয়ে আকার ধয়ে আকার! প্রত্যেক মাসে স্পিড পোস্টে ভালো চা এবং পুজোর সময় পুজাবার্ষিকিও পাঠাতেন। শেষদিকের একটা স্মৃতি মনে পড়ছে। আমরা সেবার ফিরছি কলকাতা থেকে। স্টেশানে বাবা আমার মেয়েকে জড়িয়ে ধরব বললেন, তুই কিছু বুঝতে পারলি? মেয়ে বলে, না তো। বাবা সোয়েটার থেকে একটা হ্যারি পটারের বই ওকে উপহার দিল। মেয়ে হ্যারি পটার অসম্ভব ভালোবাসতেন।
আমি আমেরিকাতে পড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে কাকা কাকিমার কাছে থাকতাম আমি। একটা গাড়ির দুর্ঘটনায় কাকারা মারা যান। যে ঘটনা নিয়ে পড়ে বাবা ‘হিরোশিমা মাই লাভ’ লেখেন। তো, আমাকে ফিরে আসতে হয় তারপর। কারণ আমি ওঁদের কাছেই ছিলাম। দুজনেই ডাক্তার ছিলেন। ওঁরা মারা যাবার পর অনেকে আমাকে রাখতে চান কিন্তু খুবই ছোট ছিলাম তখন স্কুলে পড়ি তাই বাবা একা রাখতে চাননি আমাকে। বাবা চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পাসপোর্ট করিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। তখন তো এসব এত সহজ ছিল না। তবু চলে এসছিলেন তাড়াতাড়ি।
পরিবারেও সবার খুব প্রিয় ছিলেন বাবা। আজকাল পত্রিকাতেও ওঁদের সাথে কাজ করেছেন উনি। আমার মাও খুব ভালো মানুষ ছিলেন। অসম্ভব সুন্দরী। আমাদের বাড়িতে কেউ এসে না খেয়ে কোনওদিন যায়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় জ্যোতির্ময় দত্ত মাকে অন্নপূর্ণা বলতেন। জ্যোতির্ময় দত্তকে যখন জরুরি অবস্থার সময়ে পুলিশ খুঁজছেন, তখন রাত্রি দুটো আড়াইটা নাগাদ আমাদের বাড়িতে এসে থাকতেন। তখন বরানগরে থাকতাম।

আমি আর বাবা কড়াইশুটি ছাড়ানোর প্রতিযোগিতা করতাম। কখনও আমি উঠে গেলে বাবা আমার থেকে নিয়ে এগিয়ে যেতেন কড়াইশুটি ছাড়ানোয়। বাবা আমাকে আর মেয়েকে দুজনকেই বই উপহার দিতেন। লিখে দিতেন, অসুখের জন্য না সেরে ওঠার জন্য। খুবই একাত্ম সম্পর্ক ছিল আমাদের। সোমবার বাবা মারা গেলেন, শনিবারেও আমার সাথে কথা বলেছেন। যেদিন চলে যান, তার আগের দিন গলাটা ধরা ছিল। শরীর খারাপের খবর পেয়েই আমি বারবার ফোনে যোগাযোগ রাখছিলাম। আমার স্বামীকেও বলে কাজে গেছিলাম যোগাযোগ রাখতে। বাবা তার পরদিন ঘুমের মধ্যেই চলে যান। অবাক কাণ্ড, তার কিছুদিন আগেই একটা কবিতা লেখেন তিনি। তাতে এমনই ঘুমের উল্লেখ আছে। ওঁর স্মরণসভাই আমি পড়েছিলাম কবিতাটা।
অনেকেই বলেন বাবার বোহেমিয়ান সত্তার কথা। কিন্তু বাবা আবার একই ভাবে ঘরোয়াও ছিলেন। বছরে আমরা চার বার করব বেড়াতে যেতাম। প্রচলিত জায়গায় বেড়াত্ব যেতে বাবা ভালোবাসতেন না। তুম্বনি বলে রামুপুরহাটের একটা জায়গায় আমরা খুব যেতাম। একটু অফবিট জায়গা বলেই বারবার যাওয়া হত। বাবা ভালোবাসতেন যেতে। বাবার বন্ধুরাও কেউ কেউ যেতেন, যেমন বরুণ চৌধুরী বা চিকিৎসক শান্তনু মুখোপাধ্যায়। আমাদেএ বাড়ি প্রথম থেকে আমার মায়ের নামে। সমস্ত কিছু আমার মায়ের প্রথম থেকেই। বাড়ির সবার জন্যেই এত করেছেন অকাতরে। বন্ধুদের মধ্যে শক্তি সুনীল তারাপদবাবু সবার বাড়ি যেতেন। আমার মামাবাড়ির আর বাবার বাড়ি-দুটোই বড় পরিবার। যখন লিখতেন তখন ওপরের ঘরে চলে যেতেন। আবার যখন হইহই করতেন তখনও সেটা মন খুলে করতেন।
বাবার মারা যাবার পর দু দিন গোটা এলাকা কালো পতাকা ঝোলানো ছিল। এলাকা বন্ধ ছিল। কাজেই বাবা ঘরে বাইরে দু দিকেই একশো শতাংশ ছিলেন। আজও কলকাতা থেকে দূরে থেকে প্রায়ই সেসব দিনের কথা মনে পড়ে খুব।
(অনুলিখন)