রেস্তোরাঁর পচা মাংসের শহরে টাটকা আড্ডায় চলছে কাটাছেঁড়া
অরূপরতন চক্রবর্তী

গড়িয়াহাট বাজার থেকে ফেরার পথে পাড়ার চায়ের দোকানটায় আজকাল আর শুধু চা পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় খাদ্য নিরাপত্তা, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম, রেস্তোরাঁ ব্যবসা এবং বাঙালির পাকস্থলী নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গোলটেবিল বৈঠক।
বিচারপতির আসনে অবশ্য কেউ নেই। তবু বিচার চলছে।
এখন বিষয় একটাই —পচা মাংস, মিষ্টি।
হরিদা চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে বললেন, ‘এসব নিয়ে এত হইচই করার কী আছে? বাঙালির পেট বলে কথা! সব হজম হয়ে যায়। ‘সঙ্গে সঙ্গে ঘোষালবাবু বললেন, ‘ঠিক বলেছেন। আশির দশকে ভেজাল সর্ষের তেল খেয়ে যে প্রজন্ম বেঁচে আছে, তাদের কাছে এই পচা মাংস-টাংস আর কত বড় ব্যাপার?’
চন্দবাবু যোগ করলেন, ‘ধুলো-মাখা ফুচকা খেয়ে বেঁচে আছি। চারদিনের তেলে আলুরচপ খেয়েছি। পেঁয়াজি খেয়েছি। রাস্তার ধারে কেটে রাখা শসা খেয়েছি। গড়েরমাঠে খেলা দেখে ফেরা সময় লাল-হলুদ শরবত খেয়েছি। কিচ্ছু হয়নি।’
‘কিছু হয়নি মানে?’ হয়েছে। দু’দিন পেট খারাপ হয়েছিল।দু-একবার জন্ডিস।’
‘তা হলে?’
‘তা হলে আবার কি? ওষুধ খেয়েছি। ডাক্তারকে তো খেয়ে পরে বাঁচতে হবে। পাড়ার দে-বাবুদের ওষুধের দোকানটাকে তো বাঁচাতে হবে!’
চায়ের দোকানে হাসির রোল।
মজা করতে করতে হঠাৎ কথাটা একটু গম্ভীর হয়ে যায়।
ঘোষালবাবু বিদেশী সিনেমার পোকা। বললেন, ‘আইজেনস্টাইনের বিখ্যাত সিনেমা ব্যাটলশিপ পোটেমকিন মনে আছে? রুশ যুদ্ধজাহাজে নাবিকের সেই বিখ্যাত উক্তি – “We’ve had enough rotten meat! Even a dog wouldn’t eat this!It could crawl overboard on its own!” তারপরই কিন্তু রুশ বিপ্লব!’
আসলে, দুর্গাপুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা অভিযানে কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ এবং ফুড কোর্টে যে ছবি সামনে এসেছে, তাতে ফুচকার জলকে আর ভয় লাগছে না—ফ্রিজটাই ভয় লাগছে। কোথাও কেজির পর কেজি বাসি মাংস। কোথাও পচা মুরগি। কোথাও পুরনো সামুদ্রিক খাবার। কোথাও ছাতাপরা মিষ্টি। কোথাও খাবারের গায়ে এমন সব ছত্রাকের শিল্পকর্ম, যা দেখে রবীন্দ্রভারতীর ফাইন আর্টসের ছাত্ররাও লজ্জা পেতে পারে।
সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাদুড়িয়ার একটি রেস্তোরাঁ থেকে প্রায় ৪০ কেজি পচা মাংস উদ্ধারের খবর এসেছে। ট্যাংরার একটি জনপ্রিয় চাইনিজ রেস্তোরাঁয় প্রায় ৫০০ কেজি বাসি মুরগি ও চিংড়ি বাজেয়াপ্ত হয়েছে। মিষ্টির দোকানের গল্পও খুব মিষ্টি নয়। কোথাও ছানায় ছত্রাক, কোথাও বাসি মিষ্টি, কোথাও খাবারে এমন রং ব্যবহারের অভিযোগ, যা দেখে মনে হয়—মিষ্টি নয়, দুর্গাপুজোর আলপনা খাওয়া হচ্ছে।
এখানেই বাঙালির স্মৃতির অ্যালবাম খুলে গেল। আড্ডায় উঠে এলো, ২০১৮-র ভাগাড়-কাণ্ড। মৃত পশুর মাংস সংগ্রহ করে রাসায়নিক দিয়ে সংরক্ষণ, তারপর বাজার ও রেস্তোরাঁয় চালান—সেই কাণ্ডের পর বহু বাঙালি রেস্তোরাঁয় চিকেন কষা অর্ডার করার আগে চিকেনটার দিকে এমনভাবে তাকাতেন, যেন আধার কার্ড চাইছেন। তারপর সময় গিয়েছে। ভয় গিয়েছে। ক্ষুধা ফিরে এসেছে। এবং বাঙালি আবার বলেছে— ‘চল, একটা চিকেন তন্দুরি হোক।’
তবে এবারের কাণ্ডে আর একটি মজার মোচড় আছে। রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠন NRAI-এর বক্তব্য—নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নিন, জরিমানা করুন, লাইসেন্স বাতিল করুন, যা করার করুন। কিন্তু অভিযান মানেই যেন টেলিভিশনের লাইভ ‘অপরাধী শনাক্তকরণ অনুষ্ঠান’ না হয়ে যায়।তাদের অভিযোগ, কোনও রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে আইনগতভাবে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই ক্যামেরার সামনে ব্র্যান্ডের নাম তুলে ধরে সামাজিক হেনস্থা করা হচ্ছে।
ব্যাপারটা সত্যিই গোলমেলে।
একদিকে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে যদি পচা মাংস থাকে, তাকে ‘গোপন রেসিপি’ বলা যায় না। আবার অন্যদিকে, ক্যামেরায় ফ্রিজ খুলে গেলেই মালিককে জনতার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করাও খুব স্বাস্থ্যকর গণতন্ত্র নয়। অর্থাৎ, খাবারটা যেমন টাটকা চাই, বিচারটাও তেমন টাটকা হওয়া চলবে না—সময় নিয়ে, প্রমাণ দেখে হতে হবে। আড্ডার মধ্যেই উঠে এলো গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ – পুজোয় বাঙালিকে নিরামিষ খোয়ার চেষ্টা।
চায়ের দোকানে এতক্ষণে দ্বিতীয় দফা চা এসেছে।
হরিদা বললেন,’তা হলে বাইরে খাওয়াই বন্ধ?’
‘না,’ বললেন ঘোষালবাবু, ‘বাড়িতে রান্না করুন।’
‘বাজারের মাংস?’
নীরবতা।
‘সেটা কোথা থেকে এসেছে?’
আরও নীরবতা।
শেষে পাড়ার সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘বাঙালির পেট শক্ত—এ কথা ঠিক। কিন্তু পেটকে ফুড সেফটি সার্টিফিকেট ভেবে বসাটা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি।’
চায়ের কাপ নামল। আদালত মুলতুবি। রায় অবশ্য এখনও বেরোয়নি। কারণ সামনে পুজো। আর পুজোয় বাঙালির তিনটে জিনিস চাই— নতুন জামা, অষ্টমীর অঞ্জলি, আর নবমীর রাতে ‘একটু বাইরে খেয়ে আসি’।
পচা মাংসের খবর যতই আসুক, তৃতীয়টাকে আটকানো সহজ নয়।কারণ বাঙালির পেট শুধু শক্ত নয়। পেটের সঙ্গে স্মৃতিও আছে। আর সেই স্মৃতির নাম—’এই দোকানের মাটনটা কিন্তু দারুণ!’