উত্তর কলকাতার এক বাজারে একদিন
লিখছেন সৌম্যা ঘোষ

ছবিঃ সংগৃহীত
চারপাশে ছড়িয়ে প্লাস্টিক-বস্তা-কাদাজল, দেশি মদের বোতল। কয়েকপাটি ছেঁড়া চটি। সামনে একহাঁটু নোংরা জল। একটু উঁচুতে তাঁবু খাটিয়ে কেউ মাথার ছাদ করেছে, কারও বা পাকা ঘর। ঘিঞ্জি। কোলে সন্তানকে নিয়ে দোরগোড়াতেই বসে খাচ্ছে সকালের জলখাবার। দু’চারটে কুঠুরির পাশেই ওদের জন্য বরাদ্দ একটা শৌচাগার— আধ ভাঙা ঘুটঘুটে অন্ধকার। একজনের ঘরের মুখেই পচা-গলা ইঁদুরের দেহাংশ। নাড়ি-ভুঁড়ি আর গলা-পচা মাংস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে… মাছিগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে… গন্ধে একমুহূর্তও টেকা দায়! একটা বেনামী সাদা ফুল ফুটে আছে পাশেই, কাদামাটির স্তূপে… (স্বপ্নের মতো)…
ক্যানেল রোড পেরিয়ে খাল পাড় ধরে সোজা চলে এলেই শ্যামবাজার পাঁচ মাথা মোড়। জ্বলজ্বল করছে নেতাজির তীক্ষ্ণ দুটি চোখ আর হ্রেষাধ্বনির মূর্তিটি।
ঝাঁ-চকচকে-জৌলুসের মাঝে পড়ে আছে অন্ধকার-পুরোনো-ঘেমো ‘ন্যাশনাল ইকোনমিক রেস্টুরেন্ট’। বয়স্কদের ভিড় বেশি, সবার হাতেই ধরা ব্রিটিশ আমলের পুরোনো সাদা চায়ের কাপ আর কড়কড়ে টোস্ট। মুখোমুখি দু’জনের কথাবার্তা চলছে, — ‘এমন কোনও রাজনৈতিক ঘটনা দেখেছ যে পাঁচ মাথা মোড়কে ছুঁতে পারেনি!’
—‘কেন! অভয়ার সময়… মনে নেই?’
—‘দেখলে, দিল্লির যন্তরমন্তর! আজকের প্রজন্ম কিন্তু করে দেখালো।’
রাস্তা পার হলেই পিছনে প্রশস্ত বাজার। শ্যামবাজারের বাজারে কী না পাওয়া যায়! তাও সস্তায়! দাঁত মাজার একটা ব্রাশ কিনলেও পাঁচ টাকা ফেরত আসে!
হরিদাস মোদক আর গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে লাইন পড়ে গিয়েছে। শ্যামবাজার বাজারের ফুটপাতে হাঁটাচলা মুশকিল হয়ে যায় পুজোর আগের দিনগুলোয়। পরপর লাইন দিয়ে দশকর্মা ভান্ডার। সবার হাতেই পুজোর ফর্দ। একটা করে জিনিস দিয়েই আগে ফর্দে দাগ দিচ্ছেন দোকানদার।
পুজোর আগের দিনগুলোয় শ্যামবাজারের ছবিটা একদম অন্যরকম। ম’ম করে নাড়ু-বাতাসা-ধূপধুনোর গন্ধ। পুজো-পুজো একটা গন্ধের আমেজ। একদম আলাদা একটা ব্যস্ততার ছবি। কেউ দর করে নারকেলের, কেউ তো ডাবের, কেউ বা আখের…
আর একটু ভিতরে, ফুটপাথ ছেড়ে আসল বাজারে প্রবেশ করলেই, কেউ খুড়ির দরদাম করছে, কেউ ঘটের আকার দেখে দাম জিগ্যেস করে নিচ্ছে… সোজা চলে গেলে তাজা খোয়া ক্ষীরের দোকান। তার পাশেই মাছের বাজার। এক মাছওয়ালা তার প্রতিদিনের দরদামকারি খদ্দেরকে বলছে, আজ আমার কাছে শুধু ইলিশ মাছ দাদা। আপনার জন্য মাছ নেই।
অনেকদিন পর চোখে পড়ল, কাঁকড়া। কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটাতেও দাঁড়া নেই। এমনকি, দাড়ার উপস্থিত মাত্র নেই। জিগ্যেস করতেই, থাকবে কী করে? সব তো বাইরে চলে যাচ্ছে দিদি।
—চলে যাচ্ছে বললেই? ডিম তো ঘরেই রয়েছে। এদিকে মানুষ খেতে পায় না, ওদিকে ডিম ছোঁড়াছুঁড়ি করে রোজ এক টাকা করে দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে! মানুষ খাবে কী!
সামনের দোকানের একজন বললেন,
—‘এইসব প্লাস্টিকের ডিশ দেবেন না। আপনার কাছে ডিসপোজেবল কিছু নেই?’
—সোজা গিয়ে বাঁ-দিকে চলে যান। পেয়ে যাবেন।
আশ্চর্য বাজার! একটা এলাকা জুড়ে অলিগলি পাকস্থলীর গোলকধাঁধায় নানা জিনিসপত্রের বিশাল সমাহার। মনে পড়ে যায়, প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো নগরসভ্যতা মহেঞ্জোদারোর বাজারের ইতিহাস। শহরের প্রধান সড়কের ধারে এরকমই ছোট ছোট দোকানঘরে চলত কেনাবেচা। আজ সেখানে ব্লিঙ্ককিট, জ়েপ্টো, বিগবাসকেট… ভাবা যায়! এক ক্লিকেই বাজার চলে আসবে বাড়িতে। কিন্তু, জমজমাটি বাজারের মধ্যে তরতাজা মাছ-সবজি বাছা বা দরদামের জন্য হাঁকাহাঁকি… এগুলো কি তবে ভূত হয়ে থেকে যাবে!
শ্যামবাজার চত্বরে ‘স্পেনসারস্’ জাতীয় কোনও দোকান এখনও গজায়নি। তাই, বাজার করাটা একটা আর্ট যাদের কাছে, তারা নিশ্চিন্তেই বাজার করার আনন্দ থেকে রসদ সংগ্রহ করে বেঁচে আছে… পায়ে হেঁটে, দোকান ঘুরে খুঁজে ভালো জিনিসটা তাই, খুব সহজেই পাওয়া সম্ভব।
বাজার নিয়ে প্রসেনের একটা গান ‘হয়তো তোমাকে আমি কোনওদিনও বলিনি/তুমি একদমই বাজার করতে পারো না’
বাজার করতে পারো না বললেই, প্রেমের সম্পর্কে ওখানেই ইতি! কমবেশি সব মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছেই বাজার করা একটা আর্ট। পাতে মাছের পিসটা গাদা পড়ল না পেটি… তার থেকেও বড় প্রশ্ন, তাজা তো? তাই, ভোর-ভোর বেড়িয়ে সবচেয়ে ভালো বাজার করে দু-হাতে দুটো ব্যাগ নিয়ে হাজির না হলেই নয়।
বাজার নিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কে ঝুটঝামেলার আদিখ্যেতা আর বাজার করা নিয়ে রোমান্টিসাইজ করা… এ বাঙালিদের পক্ষেই সম্ভব। নয়তো, সব বাঙালিই একদিন কবি হয়ে যেত! দাগার ঠেলায় বাজার করাটা আর শিখতে পারত না…
শ্যামবাজার ছাড়িয়ে সোজা এলেই মণীন্দ্র কলেজ। ওর উল্টো দিকে মিও আমোরের কাচের দরজা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ময়লা প্যান্ট পরা ছেলে।
গ্যালিফ স্ট্রিটে বস্তির কয়েকটা বাচ্চাকে নিয়ে খেলা করছে কয়েকজন সাদা চামড়ার মানুষ। একটা শহরেরই কতরকম চেহারা…
জ়োমাটো-সুইগি-ক্যাফের বা চার মহল শপিং মলের বাইরে এ এক আশ্চর্য কলকাতা!
কেউ বেঁচে থাকে ভালো থাকার বিলাসিতায় আর কেউ-কেউ পেটের দায়… জঞ্জাল-বস্তায়…