পাড়ার চায়ের দোকানে মেহেঙ্গাই – চায়ের চিনিতে মুদ্রাস্ফীতির এফেক্ট !

অরূপরতন চক্রবর্তী
গড়িয়াহাটের মোড়ে বিল্লাদার চায়ের দোকানে সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কেটলিতে চা ফুটছে, পাশে বিস্কুটের কৌটো, আর সামনে বসে তিনজন বাঙালি—তিনজনের হাতে তিন কাপ চা, কিন্তু আলোচনা একটাই—চিনি গেল কোথায়?
বিল্লাদা গম্ভীর মুখে বলল, ‘চিনি আর আগের চিনি নেই। দাম শুনলে দাঁত মিষ্টি হয়ে যাবে!’
কথাটা মিথ্যে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে চিনির দাম দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ থেকে অগস্টে খুচরো দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। কলকাতার বাজারেও কোথাও কোথাও কেজি পিছু ৬৯–৭০ টাকা পর্যন্ত চিনি বিক্রির খবর এসেছে।
তখনই পাশ থেকে প্রবীণ খদ্দের হরেনবাবু বললেন, আমি তো আগেই বলেছিলাম, চিনি কম খাও। এখন সরকারও আমার কথাই প্রমাণ করছে!’
বিল্লাদা হেসে বলল, ‘আপনি স্বাস্থ্য নিয়ে বলছেন, না সংসারের বাজেট নিয়ে?’
হরেনবাবু গম্ভীর। ‘দুটোই। চিনি কম খেলে সুগারও কম হবে, খরচও কম হবে।’
এই সময় আলোচনায় ঢুকে গেল আসল বিতর্ক—ইথানল!
কেউ বলল, ‘আখ থেকে চিনি না বানিয়ে পেট্রোলে ইথানল মেশানো হচ্ছে বলেই তো চিনি কম!’
বিল্লাদা সঙ্গে সঙ্গে চামচ থামিয়ে বলল, এই যে! পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মেশানো হচ্ছে বলে আমার চায়ের সঙ্গে চিনি কম মেশাতে হবে—এটা কেমন অঙ্ক?’
বিষয়টি অবশ্য এত সরল নয়। ভারত E20—অর্থাৎ পেট্রোলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর লক্ষ্যে পৌঁছেছে।
বাজার করে ফেরা রিটায়ার্ড কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসার বিনোদবাবু কেন্দ্রের বক্তব্যতা খোলসা করে বললেন যে, বর্তমান চিনির দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ ইথানলের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়া নয়। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ইথানলের জন্য চিনির diversion বরং ২০২২-২৩-এর প্রায় ১২ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬-এ প্রায় ৯ শতাংশে নেমেছে। উৎপাদন কমে যাওয়া, খারাপ আবহাওয়া, উৎসবের আগে চাহিদা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজার এবং মজুতদারি—সব মিলিয়েই বর্তমান চাপ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বিল্লাদার দোকানে সরকারি ব্যাখ্যা দিয়ে বিতর্ক থামে না। কারণ বাঙালির কাছে অর্থনীতি মানেই—’তাহলে আমার পকেট থেকে কত গেল?’
পাকিস্তান থেকে চিনি আনার কথাও উঠল। আড্ডার আরেক রেগুলার সন্তোষ দা বললেন, ‘ওদিকে পাকিস্তানে নাকি বাড়তি চিনি আছে, এদিকে আমাদের বাজারে দাম বাড়ছে। তাহলে জাহাজটা এদিকে ঘুরিয়ে দাও না!’
সঙ্গে সঙ্গে হরেনবাবু বললেন, ‘ওটা এত সহজ নয় মশাই। পাকিস্তান থেকে ভারতে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই পাকিস্তানের বাড়তি চিনি থাকলেও সেটাই এখন ভারতের বাজারে ঢুকে পড়ছে—এমন নয়।’
বিনোদবাবু সরকারি খবরগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তিনি বললেন, ভারত অবশ্য অন্য দেশ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর রাস্তা খুলেছে। সরকার ১০ লক্ষ টন কাঁচা চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার মধ্যে ৭,৯৭,৪৫০ টনের বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে; বাকি ২,০২,৫৫০ টনের জন্যও আবেদন নেওয়া শুরু হয়েছে।
এর মধ্যেই বিল্লাদার চায়ের দামও বেড়েছে। ‘আগে দশ টাকায় চা, এখন বারো!’—বিল্লাদা ঘোষণা করতেই সবাই চুপ।
কারণ চায়ের কাপটা বাঙালির কাছে চা নয়—মুদ্রাস্ফীতির সূচক। চিনি বাড়ে, চা বাড়ে। দুধ বাড়ে, চা বাড়ে। গ্যাস বাড়ে, চা বাড়ে। শেষে খদ্দের প্রশ্ন করে, ‘বিল্লাদা, চা খেলে আর কত টাকা বাড়বে?’
বিল্লাদা বলে, ‘চা না খেলে মাথা ধরবে। মাথা ধরলে ডাক্তার দেখাতে হবে। তাই চা-ই সস্তা!’ হাসির রোল পড়ল।
গড়িয়াহাট বাজারের বাইরে আখের রসও নাকি আগের দামে নেই। যে জিনিসটা দেখে মনে হতো—’আখ তো সামনে, এত দাম কেন?’—সেটাও এখন মধ্যবিত্তের কাছে গবেষণার বিষয়।
তারপর আলোচনার শেষ বিস্ফোরণ—কেক, পেস্ট্রি, লজেন্স, চকোলেট!
বিল্লাদা বলল, “চিনির দাম বাড়লে শুধু চায়ের কাপেই ধাক্কা লাগে না। বিস্কুট, কনফেকশনারি, চকোলেট, কেক—সবেতেই উৎপাদন খরচ বাড়ার চাপ পড়ে।” সত্যিই, বাজার বিশ্লেষণে চিনি এসব পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হওয়ায় FMCG সংস্থাগুলির খরচ বাড়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
হরেনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘তা হলে মিষ্টি খাব না, চা খাব না, চকোলেট খাব না—বাঁচব কী করে?’ বিল্লাদা বলল, ‘বাঁচবেন কেন? মধ্যবিত্ত বাঙালি সবসময় বাঁচে—হিসেব করে।’
সবাই চুপ। তারপর একজন বলল, ‘একটা চা দাও তো বিল্লাদা। চিনি কম।’
বিল্লাদা তাকিয়ে বলল, ‘কতটা কম?’
‘চিনি অর্ধেক। কিন্তু চা পুরো কাপ।’
বিল্লাদা হেসে বলল, ‘এই হল বাঙালি! স্বাস্থ্যেও সাশ্রয়, সাশ্রয়েও চা চাই—কিন্তু আনন্দটা ফুল কাপ!’