মেঘে ঢাকা ঘটক: জেন-জি’র চোখ দিয়ে…

লিখছেন: সৌম্যা ঘোষ
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল/একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো—
প্রেমে পড়লে, ভালোবাসলে দিব্যি সবকিছুই রঙিন লাগে। মা-বাবা প্রথম থেকেই সতর্ক করেছিল, ওই ছেলেকে একদম বিয়ে নয়। পরে পশ্চাতে হবে। কিন্তু, কে কার কথা শোনে! প্রেম বা বৈবাহিক সম্পর্ক— কমিউনিস্ট আদর্শের মতোই স্বচ্ছ হবে। এর থেকে আর কি-ই বা আশা করা যায়…!
ছেলেটার মধ্যে দোষ বলতে, একটু পাগলাটে গোছের। চালচুলোহীন। বড্ড প্রেমিকমার্কা। নাটক-সিনেমা-সাহিত্য নিয়ে পড়তে পড়তে মাথাটা এক্কেবারে গেছে! সবকিছুই সাহিত্যের হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চায়… আর যে-টুকু দোষ, ও কেটে-ছেঁটে মাফ করে দেওয়া যায়। মেয়েটাও সাহিত্যের ছাত্রী। তবে, চূড়ান্ত বাস্তবসম্মত। ন্যাকামি-বর্জিত আর বাঙালির চেনা ছকের গদগদ প্রেম থেকে শতহস্ত দূরে থাকে।
এক্কেবারে দুই মেরুর। তা, যাই হোক… তাতে কি আছে!
এরকম তো কতশত পাগলাটে মানুষদের ভালোবেসে সংসার করেছে কত মেয়েরা… সমস্যা কি ছিল না!আলবাত ছিল।ঋত্বিক ঘটক-সুরমার সম্পর্ক! ওঁদের চিঠিপত্রতেই তো স্পষ্ট।‘দুনিয়ায় টাকা থাকবে না লক্ষ্মী, কাজগুলো থেকে যাবে’। আপসহীন ভাবনার কেন্দ্রেই তো ছিলেন ঋত্বিক।সিলেট-দেশভাগ-শিলং হয়ে সুরমা ঘটকের এ পার বাংলায় আসা, ঋত্বিক ঘটকের প্রেমে পড়া, বিয়ে করা।
শুনেছি, সুরমা ঘটকের গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের জন্য, ঋত্বিক তাঁকে মজা করে ‘দাস ক্যাপিটাল’ বলে ডাকতেন। আর, সেই কঠোর ব্যক্তিত্বের সুরমাই কি না প্রেমে পড়লেন ঋত্বিকের! বিয়েও করে ফেললেন! যদিও, তাদের এই প্রেম আর বিয়ের মাঝে একটা ঝাঁঝালো ‘নিষেধাজ্ঞা’ও ছিল।এই সুরমাই তো… এই সুরমাই দু-হাত দিয়ে আগলে রেখেছিলেন ঋত্বিক আর তাঁদের সংসারকে।
ঋত্বিক-সুরমার প্রজন্মদের ভালোবাসার মধ্যে, সম্পর্কের মধ্যে একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল, দুপুরের রোদ ছিল, ফিরতি পথে খোলা আকাশ ছিল, পাখির ডানার অবকাশ ছিল, পায়ের তলায় সর্ষে ছিল, উত্তেজনার উজান ছিল, বাক্য বিনিময় ছিল, গোপন ব্যথার মতো একগুচ্ছ ফুল ছিল! যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল, ছিল তাদের গন্ধখানি!চিঠি ছিল, শ্রেষ্ঠ কবিতা ছিল, সাদা ঘোড়ার পাহারা ছিল, কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তর ছিল, নিওলিথ-স্তব্ধতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে দেখার আকুতি ছিল! অভিমান ছিল, অনুযোগ ছিল! ছিল ‘সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে’র দুনিয়ায় একটুকু শান্তি…
(একদিকে সংসারের চূড়ান্ত আর্থিক সংকট আর অন্যদিকে বারবার ঋত্বিকের শিল্পীসত্তার মুখ থুবড়ে পড়া! ছবি করার জন্য কখনও টাকা নেই, তো কখনও ঘোর রাজনীতি।)
ঋত্বিকের ছবি বানানো নিয়ে রাজনীতি, রাজনৈতিক দলেও রাজনীতি… রীতিমতো কোণঠাসা করে দেওয়া। একটা ভুল সময়ে জন্মে যাওয়া একটা প্রতিভার নাম ই হয়তো ঋত্বিক। সংসারটা একটু থিতু হলো, হঠকারিতায় পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতাও ছেড়ে ছুড়ে চলে আসলেন!
একদিকে সংসার-আর্থিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে ঋত্বিক ঘটক! সমাজ ঋত্বিককে ব্রাত্য করেছে, পাগল বানিয়েছে, শেষপর্যন্ত খুন করেছে।
ভাবুন তো, সুরমা ঘটকের ক্রাইসিসটা!মাতৃ সত্তা, সাংসারিক গোছগাছ আর স্ত্রী সত্তার সঙ্গে আজীবন সংঘাতের মাঝেও ঋত্বিককে ছেড়ে কোনও দিনও পালাননি সুরমা।
সংশয়ের সংকট তো এখনকার সময়। ‘সংকট’— কী থেকে? বিশ্বাস থেকে, প্রতিশ্রুতি থেকে। চচেষ্টাচরিতে সেসব সহজেই বয়কট করাই যায়। কিন্তু, না।এই সেদিনই… স্ক্রিনে একটা কল— ‘ঐশী’! এর আগেও একাধিকবার স্ক্রিনে এই নাম সে দেখেছে। হঠাৎ, অশান্তি-ডিভোর্সের প্রস্তাব। ‘আমি তোমার সঙ্গে থাকতে আর চাই না!’বর অনেকবারই বুঝিয়েছিল, সহকর্মী ছাড়া সে আর কেউ নয়। অতএব, এটা স্রেফ ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া আর কিছুই নয়। স্ত্রী মানতে নারাজ। পরে অবশ্য প্রমাণ পাওয়ার পর স্ত্রীর মুখ লুকানোর জায়গা নেই… আর এক দম্পতির অশান্তি, স্পেস নিয়ে! স্পেস না দিলে, সম্পর্ক টেকানো দায়।
এইসব ঠুনকো গায়েপরা ঝামেলার পাশেদেশভাগ-আর্থিক অনটনের মতো সিরিয়াস ইস্যুতে এঁরা কেউ কখনও কারও হাত ছেড়ে যাননি।বদলে আগলে রেখেছিলেন শেষ পর্যন্ত।মৃত্যু যন্ত্রণার দিনগুলোতেও।
আজকের এই প্রজন্মের কাছে এই বিশ্বাস, এই প্রতিশ্রুতিটা সত্যিই কি থাকে?বেটার অপশন খুঁঁজতে খুঁজতে সবাই আজ অপশনের চক্রব্যূহে… বেরোবার পথ নয়…