অরূপরতন চক্রবর্তী

কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে যুক্ত হল এক নতুন অধ্যায়। আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্বরে ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ভারতের প্রথম ইমার্সিভ ভাষা জাদুঘর – মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড, যার বাংলা নাম ‘শব্দলোক’। গত ১৯ জুলাই, ২০২৬ উদ্বোধন হওয়া এই অভিনব জাদুঘর ভাষাকে শুধুমাত্র পড়া বা শোনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং অনুভব করার এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
‘শব্দলোক’-এর মূল আকর্ষণ হল এর ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্যালারি, নয়টি স্বতন্ত্র বিভাগ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী। দর্শনার্থীরা এখানে ভাষার ইতিহাস, বিবর্তন, বৈচিত্র্য এবং শব্দের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে এক নতুন আঙ্গিকে আবিষ্কার করতে পারবেন। শিশু থেকে গবেষক—সব বয়সের মানুষের জন্যই এই জাদুঘর সমানভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।
জাদুঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর মাল্টি-সেন্সরি বা বহু ইন্দ্রিয়ভিত্তিক নকশা। এখানে শব্দ ও ভাষাকে শুধুমাত্র দৃশ্য বা শ্রবণের মাধ্যমে নয়, বরং শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ ভিজ্যুয়াল বোর্ডের সাহায্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভারতের ২২টি তফসিলভুক্ত ভাষা-সহ প্রায় ৩৮০টি ভাষা সম্পর্কে নানা তথ্য, সে সঙ্গে বৈশিষ্ট্য এবং ভাষাগত ঐতিহ্যকে এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরাও হয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও ‘শব্দলোক’-কে অন্য মাত্রা দিয়েছে। জাদুঘরে রয়েছে হলোগ্রাম, ডিজিটাল টাচ ডিসপ্লে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি (VR) এবং মোশন-সেন্সর প্রযুক্তি। ফলে দর্শনার্থীরা কেবল প্রদর্শনী দেখবেন না, বরং তার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে ভাষার জগৎকে নতুনভাবে অনুভব করতে পারবেন।
জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলির একটি হল বিশেষ অডিও স্টেশন। নির্দিষ্ট স্থানে পায়ের ছাপ বা ফুটপ্রিন্ট চিহ্নিত সাউন্ড প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শোনা যাবে ভারতের ইতিহাস ও সাহিত্যের স্মরণীয় মুহূর্তগুলির অডিও রেকর্ডিং। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক “Tryst with Destiny” ভাষণ। এ ছাড়াও শোনা যাবে কালিদাসের ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ থেকে নির্বাচিত অংশ, যা ১৯৮৮ সালের জনপ্রিয় তথ্যচিত্র ‘ভারত এক খোঁজ’-এ ব্যবহৃত হয়েছিল। পাশাপাশি ভারতীয় সাহিত্যের বিভিন্ন ক্লাসিক রচনার অংশও এই অডিও অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত।
ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস এবং প্রযুক্তির এক অভিনব সমন্বয় হিসেবে ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ বা ‘শব্দলোক’ শুধু কলকাতার নয়, সমগ্র দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ভাষার বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য এবং শব্দের শক্তিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই জাদুঘর নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।