অরূপরতন চক্রবর্তী

বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে সত্যজিৎ রায়ের নাম বহুদিন ধরেই এক অনতিক্রম্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। আকিরা কুরোসাওয়া থেকে মার্টিন স্করসেসি, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, ওয়েস অ্যান্ডারসন— একের পর এক বিশ্ববিখ্যাত নির্মাতা তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভার প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হল আর-একটি উজ্জ্বল নাম— অস্কারজয়ী ব্রিটিশ-আমেরিকান পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন’-এর বিখ্যাত ‘ক্রাইটেরিয়ন ক্লোজেট’ সফরে গিয়ে নোলান তাঁর প্রিয় চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে বেছে নেন সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ‘অপু ট্রিলজি’। এক হাজারেরও বেশি বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রের সংগ্রহের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, সত্যজিৎ রায় বিশ্ব সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাতা।
‘পথের পাঁচালী’ হাতে তুলে নিয়ে নোলান বলেন, ‘এটি সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ট্রিলজি’— ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারের সৃষ্টি। ট্রিলজির প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ এক কথায় অবিশ্বাস্য। ছবিটি আমাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখনও দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব দেখা হয়নি। তাই এই সংগ্রহটি নিয়ে পুরো গল্পটি সম্পূর্ণ করার জন্য আমি ভীষণ উৎসাহী।”
নোলানের এই মন্তব্য শুধু একজন পরিচালকের ব্যক্তিগত পছন্দের প্রকাশ নয়; বরং এটি বিশ্ব সিনেমায় সত্যজিৎ রায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, নোলান তাঁর চলচ্চিত্রজীবনে সময়, স্মৃতি ও মানবিক অনুভূতির জটিল নির্মাণের জন্য পরিচিত। সেই নির্মাতার মুখে সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসা ভারতীয় সিনেমার মর্যাদাকে আরও একবার আন্তর্জাতিক পরিসরে উজ্জ্বল করে তুলল।
অবশ্য বিশ্ববরেণ্য নির্মাতাদের কাছে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি এই মুগ্ধতা নতুন নয়।
মার্টিন স্করসেসি বহুবার সত্যজিৎ রায়কে বিশ্ব সিনেমার শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু প্রশংসাতেই থেমে থাকেননি, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফিল্ম ফাউন্ডেশন-এর মাধ্যমে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।

‘দ্য গডফাদার’-খ্যাত পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলাও সত্যজিৎ রায়কে নিজের অন্যতম চলচ্চিত্র-প্রেরণা হিসেবে স্বীকার করেছেন। মানবিক অনুভূতির সূক্ষ্ম ও গভীর প্রকাশে রায়ের অসাধারণ দক্ষতার প্রতি তিনি বারবার শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

সমসাময়িক মার্কিন পরিচালক ওয়েস অ্যান্ডারসনও প্রকাশ্যে বলেছেন, তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের নন্দনতত্ত্ব ও ভিজ্যুয়াল ভাষার উপর সত্যজিৎ রায়ের গভীর প্রভাব রয়েছে। এমনকি রায়ের অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত চলচ্চিত্রগুলির পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগেও তিনি সক্রিয়ভাবে সমর্থন জানিয়েছেন।
আর আকিরা কুরোসাওয়ার সেই ঐতিহাসিক মন্তব্য আজও বিশ্ব সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে বিবেচিত হয়— “যে মানুষ সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখেনি, সে যেন সূর্য কিংবা চাঁদ না দেখেই পৃথিবীতে বেঁচে আছে।

প্রখ্যাত মার্কিন পরিচালক উডি অ্যালেনও স্বীকার করেছেন, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মানুষের সম্পর্ক, হাস্যরস এবং বেদনার সূক্ষ্ম মিশেলে যে মানবিক চলচ্চিত্রভাষা রায় নির্মাণ করেছিলেন, তা অ্যালেনের নিজের কাজেও নানা মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে।

অন্যদিকে, সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বিশ্বখ্যাত পরিচালক জেমস আইভরিও প্রকাশ্যে বলেছেন, চরিত্র নির্মাণ, দৃশ্যের সূক্ষ্মতা এবং গল্প বলার শিল্পে সত্যজিৎ রায় তাঁর অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। রায়ের চলচ্চিত্র তাঁকে আরও সংবেদনশীল এবং মানবিক চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণে পথ দেখিয়েছে। আইভরির মতে, সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব কখনও ভারতের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। তাঁর চলচ্চিত্র মানুষের জীবন, সম্পর্ক, স্মৃতি, দারিদ্র্য, আনন্দ ও বেদনাকে এমন এক সার্বজনীন ভাষায় তুলে ধরেছে, যা পৃথিবীর নানা দেশের নির্মাতাদের সমানভাবে আলোড়িত করেছে। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিশ্বের সেরা চলচ্চিত্রকাররা তাঁর কাছে ফিরে আসেন, তাঁর কাছ থেকেই নতুন করে শেখেন সিনেমার মানবিক ব্যাকরণ।

ক্রিস্টোফার নোলানের সাম্প্রতিক এই স্বীকৃতি সেই দীর্ঘ আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধার ধারাবাহিকতাকেই আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল। সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, চলচ্চিত্রের ভাষাও পরিবর্তিত হয়; কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের শিল্পভুবন আজও বিশ্ব সিনেমার নির্মাতাদের কাছে এক অনন্ত আলোর উৎস হয়ে রয়ে গেছে।