সৌম্যা ঘোষ, প্রত্যুষা পান
কথা যেখানে থেমে যায়, গান ও ছবির বিমূর্ত কারুকাজ সেখান থেকেই শুরু…
অথচ এই বিমূর্ত চিত্রাবলী দেখতে আপনাকে যেতে হবে না বিলাসবহুল কোনও আর্ট গ্যালারিতে। বরং হাওড়ার ঘিঞ্জি
মাছের বাজারেই দেখা গেল আন্তর্জাতিক চিত্রশিল্পীর বিমূর্ত চিত্রকলা…

হ্যাঁ, আমরা বলছি, প্রখ্যাত চিত্রকর হিরণ মিত্রের হাওড়ার জনপ্রিয় কালীবাবুর মাছের বাজারে সাম্প্রতিক প্রদর্শনীর কথা। বিগত দু বছর আয়োজিত হয়েছিল পরপর এই প্রদর্শনী। ২০২৩ ও ২৪। সেখান থেকেই নিজের কিছু ছবি বাছাই করে ও তার সাথে আরও কিছু ছবি যোগ করে এবারেও সেই প্রদর্শনীতে হাজির হিরণদা।
“কেমন লাগল এবারের গোটা অভিজ্ঞতাটা? মাছের বাজারের ক্রেতারা কি বলছেন?”

প্রশ্নটা শুনে একটুও না ভেবে হিরণদা জানালেন, যেহেতু আগে কয়েকবার হয়ে গিয়েছে এই প্রদর্শনী, তাই প্রস্তুতি একটা ছিলই। তবে চারপাশের যা অবস্থা, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামাজিক যে সব নির্লজ্জ ঘটনা বেড়ে চলেছে, সমস্ত শুভবোধ যেভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে সেই জটিল রাজনীতির আবর্তে, সেখানে বারবার এমন ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী আয়োজন করে যাওয়া তো সহজ কাজ না! তবু লড়াই জারি আছে ও থাকবে…
ষাটের দশক থেকেই ব্যতিক্রমী চিত্রকলার কাজ
নিরলসভাবে করছেন হিরণদা। বারেবারে নিজেকে ভেঙেছেন তিনি। বদলেছে তাঁর ছবির ভাষা। এই উদ্যোগটি নিয়েও গত দশ বছর ধরে এগোনোর চেষ্টা করছিলেন। নানা নাট্যদলের সাথে কথাও বলছিলেন। শেষবেশ, এগিয়ে আসে “জোনাকি” নাট্যদলের সদস্যরা। তাঁদের প্ররোচনাতেই এই বাজারকে বেছে নেওয়া হয়। বাজারের স্পেস দেখে রাজিও হন হিরণদাও।

কিছু বছর আগে জাপান ও চিন সফরের কথা বলছিলেন হিরণদা। বলছিলেন পটুয়াদের সাথে কাজের স্মৃতিও। বিস্তীর্ণ এইসব অভিজ্ঞতা পার হয়ে এসে তাই শ্রেণি ও আভিজাত্যের বাধা ভেঙে মাছের বাজারে আজ নিজের ছবি টাঙাতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয় না তাঁর। বরং মনে করেন, সাধারণের ঘামে রক্তে ও বাজার সফরে এভাবেই তো মিশে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর ছবির। এমন উদ্যোগ এ শহরে আগে কিছু নেওয়া হলেও, সেগুলিকে ‘সস্তা লোকশিল্প’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে অভিজাত শিল্পীমহল। হিরণদার লড়াই তার বিরুদ্ধে, তাঁর নিজের মত করেই, আজও…

আশি পেরোনো মহীনের ঘোড়াগুলির প্রবীণ এই ঘোড়া আরও জানালেন, এর আগে নিজের আঁকা নানা দৈর্ঘ্যের ছবি টাঙানো হয়েছিল কালীবাবুর বাজারে। কিন্তু কিছু ছবির দৈর্ঘ্য ছিল বেশি। কাজেই সেগুলি গুটিয়ে রাখা হয়। তবে এরপর এই প্রদর্শনীর কথা মাথায় রেখেই এখন ছবি আঁকেন তিনি। এবং বর্তমানে অনেকেই তাঁর এহেন প্রদর্শনী আয়োজন করতে চাইছেন বলেও জানালেন।

হিরণদা মনে করেন, সবার মধ্যে একটা ধারণার বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে ‘ছোটলোক’রা শিল্প বোঝে না। মূলত সাহেবরাই করেছে এটা। এবং সাহেবদের যারা চাকরবাকর তারাও এটা সমর্থন করেছে।
কারণ, ছোটলোকরা শুধু মারামারি ঝগড়াঝাঁটি, খুনোখুনি করে, এটাই ছোটলোকদের কাজ! কিন্তু এটা তো ভয়ঙ্কর ভ্রান্ত ধারণা সমাজের পক্ষে!
নিজে বামপন্থী হয়েও তাই স্বীকার করলেন, বামপন্থীরাও এ ব্যাপারে কোনও কার্যকরী ভূমিকা নেয়নি। বললেন, ‘আমি সকাল থেকে রাত একটানা কালীবাবুর বাজারে যখন ছবি আঁকলাম, তথাকথিত এই ‘ছোটলোকরা’ই কিন্তু আমার সাথে সুন্দর ব্যবহার করল। অর্থাৎ, মৎস ব্যবসায়ীদের সমিতি আমাদের সাথে সহযোগিতা করল খুবই, তাঁরা সব সময়ে সচেতন থাকতেন, তাই নিরাপত্তা নিয়ে কোনও অসুবিধাই হয়নি। তাঁদের দাবী, আগামী দশ বছর আমাকে এই প্রদর্শনী করে যেতে হবে..

হিরণ মিত্রকে নিয়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়র অধ্যাপক এবং চিত্রশিল্পী পরাগ রায় বলছিলেন, ‘হিরণদার ছবির দুটো গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাকে খুবই টানে। একটা হচ্ছে হিরণ দা’র রেখা এবং ক্যলিগ্রাফি নিয়ে যে চর্চাটা বহুদিন ধরে করেছেন তিনি, এই সবটার আমি বিশেষ ভক্ত। এ ছাড়া যেভাবে উনি স্পেসকে ব্যবহার করেন, সেটাও আমাকে বারবার বিস্মিত করেছে…

অর্থাৎ একটা ছবির যে ফর্ম বা যে মূল ইমেজ থাকে, তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে তো জড়িয়ে থাকে ছবির স্পেস অর্থাৎ ফাঁকা পরিসর। এই ফাঁকা স্পেসটাকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা থেকে একজন বড় শিল্পীর মুন্সিয়ানা বোঝা যায়। বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের সময়ে যে শিল্পীরা কাজ করছেন, হিরণ মিত্র তাঁদের মধ্যে এই কাজটা অত্যন্ত সুচারুভাবে করেন। আর তৃতীয় জায়গাটা যেটা বলব, হিরণদা খুবই ডায়নামিক। আমাদেরও আগের প্রজন্মের একজন শিল্পী তিনি। বিভিন্ন সময়ে কাগজের ওপর কাজ করেছেন তিনি, তা ছাড়া বিভিন্ন মিডিয়ামের ওপরও কাজ করছেন, এই যে বিভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গে একাত্ম হওয়া ও বিভিন্ন জায়গায় চ্যালেঞ্জের সামনে বারবার ফেলা, এই জায়গাগুলো হিরণদাকে তাঁর সময়ের অন্যান্য শিল্পীদের থেকে বিশিষ্ট করে রেখেছে বলে আমার বিশ্বাস।