উত্তম কুমারের প্রয়াণদিনে তাঁকে স্মরণে করলেন সংযুক্তা বসু

একদিন টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের নাম হয়ে গেল ‘মহানায়ক উত্তমকুমার’ স্টেশন।
দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জের মোড়ে বাগানে-ঘেরা বিশাল বেদীর উপর চলমান ভঙ্গিতে স্থাপিত হল মহানায়কের বিশাল মূর্তি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তাঁকে কেন্দ্র করে চওড়া রাস্তা পারাপার করেন, এদিক থেকে আবার ওদিকে চলে যান, ওদিক থেকে এদিকেও আসেন। আর তারই মাঝখানে প্রতিদিন, শীত, গ্রীষ্ম,বর্ষা পেরিয়ে বেদীর উপর দিয়ে হেঁটে চলেন আমাদের উত্তমকুমারও…
সেই মহানায়ক, এই বছর যাঁর শততম বছর বয়স হবে আর ক’দিন বাদেই। এই একশো বছর বয়সে যত দিন গিয়েছে, তত কাছের মানুষ হয়েছেন উত্তম। অকালমৃত্যু তাঁকে যেন আরও বেশি করে বিভিন্ন প্রজন্মের দর্শকের নিকটাত্মীয় করে তুলেছে। তিনি যেন আজ আরও চিরনবীন, চিরযুবক।
বাঙালির ভাগ্যে ক’জন এ রকম জনপ্রিয় অভিনেতা এসেছেন, যাঁর শতবর্ষেও বাঙালি তাঁকে উদযাপন করে?
দুশো তিনের বেশি ছবির নায়ক তথা অভিনেতা উত্তমের একটি বিশেষ ছবির প্রসঙ্গ নিয়ে আজ আসন্ন শতবর্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিছু কথা লিখতে চাই। যদিও এ ছবির গল্প প্রায় সকলেরই জানা। তবুও একবার খেই ধরিয়ে দেয়া।
সব মিলিয়ে একটি দিনের গল্প। সুপারস্টার নায়ক অরিন্দম দিল্লি যাচ্ছেন জাতীয় পুরস্কার আনতে। সেই সূত্রেই বিলাসবহুল ট্রেনে চেপে একাই দিল্লি যাত্রা। মূল উদ্দেশ্য পুরস্কার নেওয়া নয় বরং কিছুটা সময় নিজের মতো করে নিজে কাটানো। শহরের অনুরাগীদের ভিড়ভাট্টার একঘেয়েমি থেকে একটু পালিয়ে যাবার মুক্তি একটি বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এই ট্রেন সফরেই দেখা হয়ে যায় এক আধুনিক মহিলা ম্যাগাজিনের স্বাধীনচেতা সাংবাদিক অদিতির (শর্মিলা ঠাকুর) সঙ্গে। ওদের এই ট্রেন-আলাপ থেকেই জেগে ওঠে অরিন্দমের বিবেক এবং তার মনস্তত্ব। যেখানে অরিন্দম একেবারে একলা। নিঃসঙ্গ। আয়নার সামনে দাঁড়ালে অরিন্দম বুঝতে পারে খ্যাতির শীর্ষে থেকেও তার পথচলা একজন একলা মানুষের পথচলা।

সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে একলা মানুষের পথচলা বারবারই সামনে এসেছে। উনি যে আখ্যানেই প্রবেশ করুন না কেন, সেখানে সমষ্টির চাইতে একজন ব্যাক্তিই প্রধান হয়ে ওঠে। সেই কারণে বিভূতিভূষণের অপুর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের অপুর অনেক তফাৎ। বিভূতিভূষণের গল্পে পরিবেশ, নিসর্গ, চারপাশের মানুষ সবাইকে নিয়ে অপু বড় হয়। অন্যদিকে ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপুর সংসার’, ‘অপরাজিত’, অপু সিরিজের সব ক’টা ছবিতেই পরিচালক সত্যজিৎ অপুকে নির্জন করে রাখেন। নারীচরিত্র হিসেবে ‘চারুলতা’র চারুর মতো একলা মানবী বিরল। ‘মহানগর’ ছবির আরতি ও তাঁর সংসারের একমাত্র রোজগেরে নারী হয়ে সদরকে অন্দর ভাবতে শুরু করে। একা কে নয়? ‘হীরক রাজার দেশ’-এর উদয়ন পণ্ডিত তার কর্ম এবং দর্শন নিয়ে একাই একশো হয়ে ওঠে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সিদ্ধার্থ ( ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) থেকে ‘গণশত্রু’র অজয় গুপ্ত ( সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) থেকে ‘আগন্তুক’-র মনমোহন (উৎপল দত্ত) যে যার বৃত্তে একা পরিক্রমা করে।
সেই নিরিখে দেখতে গেলে ‘নায়ক’ ব্যাতিক্রম নয়। চলন্ত ট্রেন ভর্তি যাত্রীর মাঝখানে টুকটাক সংলাপ বলা ছাড়া সবটাই তার একক পরিভ্রমণ। তার চলন, বলন নায়কোচিত হলেও চোখে সেই রোমান্টিক চাহনি নেই। নেই সুন্দরী নারী দেখলে বিহ্বল মনোযোগ আকর্ষণের রোমাঞ্চ। সাংবাদিক ও মহিলা ম্যাগাজিনের সম্পাদক অদিতির সঙ্গে অরিন্দমের একদিনের সম্পর্কটা যেন মত বিনিময়ের চাপান উতোর।
ষাট বছর আগে এই রকম একজন বাঙলা সিনেমার সুপারস্টারকে নিয়ে নির্মেদ একটি ছক ভাঙা গল্প বলার প্রয়াস দেখিয়ে অনবদ্য আধুনিকতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন পরিচালক। এই ছবি তৈরির নেপথ্যে কাজ করেছে সে সময়ের হলিউডের সুপারস্টারদের ইমেজ। হলিউড অভিনেতা মার্লন ব্র্যান্ডো, রিচার্ড বারটন ও ইতালির জনপ্রিয় অভিনেতা মারচেল্লো মাস্ত্রইয়ানির মতো সুপারস্টারদের আবহে বাংলা ছবির সুপারস্টারকে নিয়ে ছবি করতে গিয়ে নাম ভূমিকায় উত্তমকুমার ছাড়া আর কাউকেই ভাবতে পারেননি সত্যজিৎ রায়। চিত্রনাট্য লিখেছেন মহানায়কেরই আদলে।

হালকা হালকা তুলির আঁচড়ে এঁকেছেন ‘নায়ক’-র সহযাত্রীদের জীবনের আভাস। এসেছেন কামু মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা যিনি নিজের ব্যবসার সুবিধের জন্য স্ত্রীকে ব্যবহার করতে চান।
আসেন ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় সিনেমার বিরুদ্ধে নানা নিন্দামূলক লেখার লেখক যোগেশ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে নায়ক অরিন্দমের রসিকতাময় কথাবার্তার আকর্ষক আদানপ্রদান।
এটা লক্ষণীয় যে ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তমকুমার ও শর্মিলা ঠাকুর বাদে যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁদের সংলাপ খুবই কম। কেবলমাত্র মৌন প্রকাশভঙ্গি বা স্বল্প কথাতেই তাঁরা নিজেদের ভেতরটাকে বাইরে ফুটিয়ে তুলেছেন। সারিয়েল বা পরাবাস্তব স্বপ্নদৃশ্যে নায়কের টাকার পাহাড়ের উপর দিয়ে হেঁটে চলা কিংবা স্বপ্নের ভেতর স্থানীয় নাটকের দলের পরিচালক শঙ্করদার অভিনয় সম্পর্কে দর্শন নায়ককে যখন বিচলিত করে, বিভ্রান্ত করে সেই দৃশ্য আজ ‘নায়ক’ মুক্তির ষাট বছর পরেও আমাদের একই ভাবে শিহরিত করে।
সত্যজিৎ রায় উত্তমকুমারকে প্রথমে ছবি দেখে চিনেছিলেন। মহানায়কের ছবির সমালোচনাও করেছিলেন। এবং আনেকদিন তাঁর প্রতি লক্ষ্য রাখার পর সত্যজিৎ ‘নায়ক’ এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। কারণ দর্শক মনে উত্তমকুমারের জন্য যে জায়গা ততদিনে তৈরি হয়েছিল, তার কোনও বিকল্প নেই। সত্যজিৎ নায়কের প্রয়াণের পর স্মরণসভায় বলেছিলেন যা, তার সারমর্ম হল এই যে, যখন কোনও অ্যাকশান নেই তখনও তিনি দর্শককে ধরে রাখতেন। তাঁর মধ্যে এক ধরনের ধৈর্য, স্থৈর্য, গাম্ভীর্য ছিল। শুটিঙের ডাক পরার আগে পর্যন্ত তিনি এই স্থিরতা বজায় রাখতেন। এইখানেই উত্তমকুমার অন্য অভিনেতাদের চেয়ে আলাদা। এই স্বকীয়তার জোরেই তিনি আজও মহানায়ক।

ফিরে আসি ‘নায়ক’ ছবির কথায়। ট্রেন যাত্রার সময় নিজেকে ধীরে ধীরে মেলে ধরেছিলেন অদিতি তথা শর্মিলা ঠাকুরের সামনে। সিনেমা জগত সম্পর্কে প্রচণ্ড অনীহা সত্ত্বেও শর্মিলা কি করে যেন উত্তমের একদিনের দোসর হয়ে উঠেছিলেন। সংবেদনশীল ভাবে শুনেছিলেন নায়কের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা।
ছবির শেষে চোখে সানগ্লাস পড়া নায়ক মাটির পৃথিবী থেকে ফিরে যান তার নিজস্ব নক্ষত্রলোকে। আর স্টেশনের জনারণ্যে মিশে যান সাংবাদিক শর্মিলা বা অদিতি।
মহানায়ক পার্থিব ভাবে আমাদের সঙ্গে নেই। কিন্তু চোখের আলোয় ধরা আছে তাঁর কালজয়ী অবয়ব আর হৃদয় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া অভিনয়।
মহানায়ক নেই কিন্তু আমাদের মধ্যেই জমে থাকবে নায়কের না বলা কথারা। আর ‘নায়ক’ ছবি ষাট বছর পেরিয়ে গেলেও কোথাও তার রেশ পুরোনো হবে না। সমস্ত স্টুডিও পাড়া পেছনে রেখে তিনি হেঁটে যাবেন জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে অনন্ত মহাবিশ্বের দিকে।
‘নায়ক’ ছবির ষাট বছর উপলক্ষে এর চেয়ে বেশি বরণ তাঁকে কী ভাবে করা যায়? তিনি আমাদের সংস্কৃতি যাত্রার সাথী হয়ে চিরকাল চলতে থাকুন। এই পথ যেন সত্যি না শেষ হয়…
যদিও আমরা জানি যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের চলার পথ সাধারণত একলাই হয়, তাই না?