অরূপরতন চক্রবর্তী

দিল্লির যন্তর-মন্তরে প্রায় এক মাস ধরে চলা অনশন, দেশজুড়ে ছাত্র-যুবাদের বিক্ষোভ, বিদেশে ভারতীয়দের সংহতি সমাবেশ এবং সামাজিক মাধ্যমে অভূতপূর্ব জনমতের চাপে অবশেষে মাঝ রাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর তার পরেই অনশন ভাঙলেন সমাজকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। কিন্তু প্রশ্ন একটাই— অনশন শেষ হলেও কি আন্দোলন শেষ? নাকি আন্দোলন এখন আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্বের দিকে এগোচ্ছে?
গত কয়েক সপ্তাহে NEET এবং অন্যান্য সর্বভারতীয় পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা শুধুমাত্র একটি পরীক্ষার বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়। এটি ধীরে ধীরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট, যুব সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং জবাবদিহির দাবিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারও সেই চাপ অনুভব করতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী দ্রুত বিচার, কঠোর আইন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে, শুধু আশ্বাসে তারা সন্তুষ্ট নয়; কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই তাদের প্রধান দাবি হিসেবেই রয়ে গেছে।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এটি দিল্লির গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক চরিত্র পেয়েছে। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, ইউনাইটেড কিংডম, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডার বিভিন্ন শহরে প্রবাসী ভারতীয়রা প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া থেকে শুরু করে তরুণ পেশাজীবীরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন— যদি পরীক্ষা ব্যবস্থার উপরই আস্থা না থাকে, তবে মেধার মূল্য কোথায়? ভারতের অভ্যন্তরীণ একটি শিক্ষাগত সংকট যে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা হয়তো কয়েক মাস আগেও কল্পনা করা যায়নি।
দেশের ভেতরেও প্রতিবাদের ভাষা নানা রূপ নিয়েছে। মুম্বইয়ে আন্দোলনকারী রিয়া আহির পুলিশের একটি গাড়ি থামিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রশ্ন করছেন— এমন একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। অনেকের মতে, এই একটি ছবি গোটা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ তরুণীর প্রশ্ন আজ বহু পরীক্ষার্থীর মনের কথা প্রকাশ করছে।

বিহারের ঘটনাও একইভাবে আলোচনার কেন্দ্রে। সেখানে পুলিশের টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের প্রতিবাদে ছাত্ররা পালিয়ে না গিয়ে উল্টে পুলিশের কাছেই প্রশ্ন তুলেছে। কোথাও কোথাও জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে প্রতিবাদকারীরা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে— তাঁদের দাবি, তাঁরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জবাবদিহি চাইছে। এই প্রতীকী প্রতিবাদ আন্দোলনকে আরও আবেগঘন মাত্রা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গেও এই আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট। কলকাতায় বামপন্থী ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত দীর্ঘ মিছিল করেছে। শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পরীক্ষার নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান উঠেছে। একই সঙ্গে আরজি কর হাসপাতালের ঘটনার সময় যে “রাত দখল” কর্মসূচি দেখা গিয়েছিল, সেই ধাঁচেই আবার রাতের শহর দখলের ডাক দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ছাত্র আন্দোলন এখন শুধুমাত্র ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা জনপরিসরের আন্দোলনে পরিণত হচ্ছে।

শুক্রবার কলকাতায় বাম সংগঠনগুলির প্রতিবাদ মিছিল এবং রাত দখল নিয়ে চিত্রনাট্যকার ও সমাজকর্মী অদিতি মজুমদার জানান, ‘দুর্নীতি যেটা সারা দেশ জুড়ে, সেটা নিয়ে সরব হয়েছে ছাত্র সমাজ দিল্লিতে। আর সেটার সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কলকাতায় আমরা আজকে একটা মিছিল করেছি। আগের দিনও একটা মিছিল হয়েছিল যেটা যাদবপুর থেকে গোলপার্ক পর্যন্ত ছিল। আজকের মিছিলটা বামপন্থী সংগঠনগুলি মিলে ডাক দিয়েছিল। আজ যে রাত জাগো হচ্ছে সেটাতেও বামপন্থী সংগঠনরা আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা সংহতি জানিয়েছি। আমরা একক হিসেবেই সেটার পাশে দাঁড়িয়েছি এবং সংহতি জানাচ্ছি এবং তা জানিয়েই আজকের রাত জাগা। দেশের মানুষ বিভিন্ন রাজ্যে এই আন্দোলনকে সংহতি জানিয়ে সবাই একত্রিত হচ্ছে। সেই একইভাবে আমরাও একত্রিত হচ্ছি।’
এ আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, সাহিত্য এবং ক্রীড়া জগতের একাধিক পরিচিত মুখ ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন তেন্ডুলকরও পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেলিব্রিটিদের সমর্থন আন্দোলনের নৈতিক শক্তি বাড়িয়েছে এবং বিষয়টিকে আরও বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ককরোচ জনতা পার্টি (Cockroach Janata Party) আপাতত কোনও আপসের পথে হাঁটতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট— শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া আন্দোলন প্রত্যাহারের প্রশ্নই ওঠে না। পাশাপাশি তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার, পরীক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণ সংস্কার এবং ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁস রোধে কার্যকর ব্যবস্থার দাবিও তুলেছে। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে একাধিক দফা বৈঠক হলেও এখনও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
সরকার অবশ্য চাপের মুখে কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ করেছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র ৪৭ জন আধিকারিকের পরিষেবা বাতিল করা হয়েছে এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থারও প্রস্তুতি চলছে। এত বড় প্রশাসনিক রদবদল থেকে স্পষ্ট যে কেন্দ্রও স্বীকার করছে, পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার উপর জন-আস্থা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন— কয়েক জন আধিকারিককে সরিয়ে দিলে কি বহু বছরের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে?
আসলে এই আন্দোলনের মূল শক্তি তার বিস্তারে। কোনও একটি ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের সীমাবদ্ধতায় এটি আটকে নেই। চিকিৎসক হতে চাওয়া ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী যুবক-যুবতী, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রবাসী ভারতীয় এবং সাধারণ নাগরিক— সকলের উদ্বেগ এখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ভাইরাল ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে প্রশাসনের প্রতিটি পদক্ষেপই এখন জনসমক্ষে বিচারাধীন।

তবে আন্দোলনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দীর্ঘ আন্দোলনে ক্লান্তি আসে, রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের সুবিধামতো আন্দোলনের দিশা বদলানোর চেষ্টা করতে পারে, আবার সরকারও সময় নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কৌশল নিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, সোনাম ওয়াংচুকের অনশন ভাঙা কোনও সমাপ্তি নয়; বরং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সরকার আলোচনার দরজা খুলেছে, কিন্তু আন্দোলনকারীরা আন্দোলনের ময়দান ছাড়েনি। আগামী কয়েক দিনই নির্ধারণ করবে, এই বিক্ষোভ প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রশমিত হবে, নাকি তা আরও বৃহত্তর যুব আন্দোলনে পরিণত হবে।
একটি বিষয় অবশ্য ইতিমধ্যেই পরিষ্কার। NEET-কে ঘিরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন আর কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের কাছে যুবসমাজের এক মৌলিক প্রশ্ন— যোগ্যতা, পরিশ্রম এবং স্বচ্ছতার উপর কি এখনও বিশ্বাস রাখা যায়? সেই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের আগুন সম্পূর্ণ নিভে যাবে, এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই।