– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি নিয়ে লিখেছেন অরিজিৎ দত্ত।
পর্ব–১
——–
“ রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্বন্ধে ভারি একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। তাঁর শিল্প-ইতিহাসের মধ্যবর্তী স্তরগুলি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা নেই। এক্ষেত্রে পতন প্রায় অনিবার্যই হয়, কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময় তা হল না। তাঁর শ্রেষ্ঠ ছবিগুলিকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি এদিকে নব আগন্তুক মাত্র। তাঁর এই অভিজ্ঞতার অভাব ঢাকা পড়ার একমাত্র ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাই তাঁর কল্পনার অসামান্য ছন্দোময় শক্তিতে।”
বিশ্বকবির পেইন্টিং ও ড্রইং সম্বন্ধে এই কথাগুলি বলেছিলেন বিশিষ্ট লোকায়ত দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ প্রবন্ধে। প্রকাশ করেছিলেন তাঁর বিস্ময়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলা নিয়ে আলোচনায় বসে এই বিস্ময়ের সম্মুখীন হতেই হয়।প্রশ্ন জাগে, পারলেন কিভাবে? আর ওই বয়সে?
ছবির লীলাময় জগতে যখন প্রবেশ করছেন বিংশ শতকের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা, তখন ষাটের কোঠার তিনটি জন্মদিন পেরিয়ে এসেছেন তিনি। সাহিত্যের প্রায় সব বিভাগে ততদিনে রবীন্দ্রনাথের সোনার ফসলে বিমুগ্ধ সবাই।এই বিন্দুতেই তিনি কলমের পাশাপাশি হাতে তুলে নিলেন তুলি-কালি-রঙ।
হাঁটি-হাঁটি-পা পা নবাগতের মতো নয়, বরং দ্রষ্টা পথপ্রদর্শকের মতো।শুরু করলেন চিত্রকলার জগতে এক নতুন নিরীক্ষা, অন্তত তৎকালীন ভারতীয় শিল্পের নিরিখে যা একপ্রকার অভাবনীয়।আবারও পুলকিত হল বিশ্ব। নতুন করে চিনল রবীন্দ্রনাথকে। আন্তর্জাতিক মানের চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে।সৃষ্টির এক অদম্য ইচ্ছা ছাড়া আর কী ভাবে ব্যাখ্যা মেলে এর?
শুরুটা হয়েছিল খুব সম্ভবত আর্জেন্টিনায়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ। সে দেশের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-র আমন্ত্রণে, প্লাতা নদীর ধারে তাঁর বাড়িতে অসাধারণ সখ্যে দিন কাটাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। পাশাপাশি লেখালেখি চলছে।হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের লেখার খাতায় চোখ পড়তে চমকে ওঠেন ওকাম্পো।দেখেন, লেখার মধ্যে যে সব কাটাকুটি হয়েছে, লেখার কালি দিয়েই সে গুলিকে পরস্পরের সঙ্গে এক ছন্দোবদ্ধতায় জুড়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া সব নকশা তৈরি করেছেন বিশ্বকবি। রবীন্দ্রনাথের এই অভ্যাস বহুদিনের। কিন্তু সম্ভবত ওকাম্পো-ই সেই নারী, যিনি ওই সব নকশার গভীরে প্রথম আবিষ্কার করলেন ছবি আঁকার এক অসাধারণ কিন্তু সুপ্ত থাকা প্রতিভাকে।খুলে বললেন সেই অনুভূতির কথা প্রিয় কবিকে।
অনুরোধ করলেন, রবীন্দ্রনাথ যেন প্রকাশ করেন এই লুকিয়ে রাখা হীরকদ্যুতি। যেন শুরু করেন ছবি আঁকা।
মহাকাল সাক্ষী, সেই অনুরোধ রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শুধু তাই নয়, মহানন্দে মজেছিলেন নতুন পাওয়া এই মজায়।তারই ফসল হিসেবে আমরা পাই প্রায় তিন হাজার ছবি – যেগুলি ১৯২৪ থেকে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আঁকা! ১৯৪১-এ তাঁর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ ছবির নেশা প্রায় মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁর সঙ্গী ছিল।বিশ্ব সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় যাকে, ফ্রান্সের সেই প্যারিস নগরীতে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার প্রথম প্রদর্শনীর আসর বসে।১৯৩০ সালে,মূল আয়োজক ওকাম্পোই! ১৯৩০ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যেই ইউরোপ, আমেরিকা আর সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে ‘গুরুদেবের’ আঁকা ছবি ছোঁয়া পায় বার্মিংহ্যাম, লন্ডন, বার্লিন, মিউনিখ, ড্রেসডেন, কোপেনহেগেন, জেনেভা, মস্কো, বস্টন, নিউ ইয়র্ক আর ফিলাডেলফিয়া শহরের হাজার হাজার দর্শকের উষ্ণ রোমাঞ্চের।
‘রাশিয়ার চিঠিতে’ কবি লিখছেনঃ
“ মস্কৌ শহরে আমার ছবির প্রদর্শনী হয়েছিল। এ ছবিগুলো সৃষ্টিছাড়া সে কথা বলা বাহুল্য। শুধু যে বিদেশী তা নয়, বলা চলে যে তারা কোনোদেশীই নয়। কিন্তু লোকের ঠেলাঠেলি ভিড়। অল্প কয় দিনে পাঁচ হাজার লোক ছবি দেখেছে।”
রবীন্দ্রনাথের আঁকার শৈলী আর বলিষ্ঠতা দেখে মুগ্ধ হন পাশ্চাত্যের শিল্পরসিকরা। উপচে পড়ে প্রশংসা।বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি দ্রুত কিনে নেয় তাঁর পাঁচটি পেইন্টিং সন্দেহ নেই, এই স্বীকৃতি চিত্রশিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের আত্মবিশ্বাসকে আরও মজবুত করে তোলে।

প্রশ্ন জাগে, শুধুই কি ওকাম্পোর অনুরোধ? আর কোনও বিশেষ প্রেরণা কি কাজ করেনি পরিণত রবীন্দ্রনাথের এই নতুন খেলার পিছনে? করেছিল।সেই কারণগুলিকে দেখতে পেলে তাঁর ছবিকে উপলব্ধি করার কিছুটা কাছাকাছি আমরা হয়তো আসতে পারব।আসলে ছবির মধ্যে জীবনবীক্ষা ও আত্মপ্রকাশের এক নতুন শক্তিশালী মাধ্যম পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।দেখেছিলেন, যা লিখে বোঝানো যায় অতি কষ্টে, বা একেবারেই যায় না, তা-ও অবলীলায় বোঝানো যায় রঙ-রূপ-রেখায়।তাঁর নিজের কথায়ঃ
“ অয়ি চিত্রলেখা দেবী, ক্ষম মোরে, তোমার মহিমা
যদি খর্ব করে থাকি দিতে গিয়ে বাক্যে ঘেরা সীমা,
বাক্যের অতীত তুমি। আপন প্রকাশ আপনাতে
নিয়ে সাথে নিজে দাও দেখা …”
আর একটি কারণও আছে।সৌন্দর্য তথা সৌন্দর্যবোধকে রবীন্দ্রনাথ মনুষ্যত্বের মহৎ প্রেরণার সঙ্গে, মানুষের পূর্ণতর হওয়ার আন্তরিক স্বভাবের সঙ্গে এককরে দেখেন। কেজো প্রয়োজনের অনেক উপরে স্থান দেন একে।তাঁর মতে, ভাতের প্রয়োজনের থেকে সৌন্দর্যের প্রয়োজন মানুষের জীবনে একতিল কম নয়।হয়তো সেই ‘বিশুদ্ধ’ সৌন্দর্যের এক আদর্শ প্রকাশ তিনি দেখেছিলেন ছবির মধ্যে।কারণ, যতই হোক, ভাষার সঙ্গে দরকারের এবং সাধারণ ভাবে বোধগম্য হওয়ার একটা আত্মীয়তা যেন কিছুতেই যেতে চায় না। কিন্তু ছবি কিছু ক্ষেত্রে সে সব থেকে একেবারে মুক্ত থাকতে পারে।পাশাপাশি, মানুষের কেজো দেনাপাওনার বাইরেও তো এই অস্তিত্বের, এই জগৎসংসারের একটা নিজস্ব তাৎপর্য থাকতে পারে। ছবি যেন, কবির ভাবনায়, তারই প্রতীক হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেনঃ
“ The world of sound is a tiny bubble in the silence of the infinite. The Universe has its only language of gesture, it talks in the voice of pictures and dance. Every object in this world proclaims in the dumb signal of lines and colours the fact that it is not a mere logical abstraction or a mere thing of use, but it is unique in itself, it carries the miracle of its existence.”
প্রাত্যহিক হিসেবনিকেশের বাইরে এই জগত এবং তার যাবতীয় উপাদানের এই অন্তর্লীন ‘অ- লৌকিকতা’-কেই প্রকাশ করেন চিত্রশিল্পী – অন্তত রবীন্দ্রনাথের তাই মত। ছবির উৎকর্ষ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নৈতিক বা বৈজ্ঞানিক প্রণোদনার থেকেও তিনি বেশি গুরুত্ব দেন ছবির শৈল্পিক সত্য তথা আত্মনিষ্ঠাকে। তাই তাঁর মতেঃ
“ In a picture the artist creates the language of undoubted reality, and we are satisfied that we see. It may not be the representation of a beautiful woman but that of a commonplace donkey, or of something that has no external credential of truth in nature but only in its own inner artistic significance.
… People often ask me about the meaning of my pictures. I remain silent even as my pictures are. It is for them to express and not to explain. They have nothing ulterior behind their own appearance… if that appearance carries its ultimate worth then they remain, otherwise they are rejected and forgotten even though they may have some scientific truth or ethical justification.”
অনেকে বলতেই পারেন, ছবি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের এই দর্শন নির্ভুল নয়।ছবি তো এমন কিছু নিয়ে আঁকা যেতেই পারে, যার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিনের সম্বন্ধ, কাজের ও জীবনযাত্রার সম্বন্ধ, যা সহজে বোধগম্য। বহু শিল্পীই তেমনটা করেছেন, এবং সার্থকতা পেয়েছেন। আসলে জীবন-শিল্পী রবীন্দ্রনাথ এর বিরোধী নন।মানবজীবনের অসংখ্য আবেগ, ঘটনা আর বিষয়ের ছবি তো এঁকেছেন এই ভাষার জাদুকর। এঁকেছেন তাঁর সাহিত্যে।তাঁর গানে, কবিতায়, নাটকে, ছোটগল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে, নৃত্যনাট্যে।ভাষায় প্রকাশের এক চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছেন তিনি।সেই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে তিনি দেখতে পেয়েছেন, এত বলার পরেও কিছু যেন বাকি থেকে যাচ্ছে প্রকাশ করতে।ভাষা যা পারছে না। সেই ভাষাতীতের প্রকাশমাধ্যম হিসেবে তিনি আঁকড়ে ধরেছেন ছবিকে।তাই ছবি সম্বন্ধে চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের ‘বিশুদ্ধ শিল্পবাদী’ দর্শনকে আমাদের বুঝতে হবে জীবনশিল্পী রবীন্দ্রনাথের নির্দিষ্ট অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে। তাতে এড়ানো যাবে বহু অনাবশ্যক বিভ্রান্তি আর কোন্দল।
পর্ব–২
——–
ছবি আঁকা শুরু করার বহু আগে, ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্য’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থটি।একটি ছবির রস কী ভাবে সম্যক ভাবে উপলব্ধি করতে হয়, এ বিষয়ে তিনি আলোচনা করেন ওই বইয়ের এক জায়গায়, একটি উপমা হিসেবে।রবীন্দ্রনাথ হয়তো অবচেতনে জানতেন যে, তাঁর নিজের ছবি বোঝার ক্ষেত্রে দর্শকদের কাজে লাগবে সেই বিবরণ।পাশাপাশি, ছবির বহিরঙ্গের চটক সম্বন্ধে শিল্পী হিসেবে তাঁর নিজের কী দৃষ্টিভঙ্গি হবে, তারও ইঙ্গিত মিলবে সেখানে।দেখা যাক কী লিখেছিলেন তিনিঃ
“ছবি সম্বন্ধে যে ব্যক্তি আনাড়ি সে একটা পটের উপরে খুব খানিকটা রঙচঙ বা গোলগাল আকৃতি দেখিলেই খুশি হইয়া ওঠে।ছবিকে সে বড়ো ক্ষেত্রে রাখিয়া দেখিতেছে না।… রাজবাড়ির দেউড়ির দরোয়ানজির চাপরাস ও চাপদাড়ি দেখিয়া তাহাকেই সর্বপ্রধান ব্যক্তি মনে করিয়া সে অভিভূত হইয়া পড়ে, দেউড়ি পার হইয়া সভায় যাইবার কোনো প্রয়োজন সে অনুভব করিতেই পারে না। … রাজার মহিমা কেবলমাত্র চোখে পড়িবার বিষয় নহে, তাহাকে মন দিয়াও দেখিতে হয়।এইজন্য রাজার মহিমার মধ্যে একটা শক্তি শান্তি ও গাম্ভীর্য আছে।

… যে ব্যক্তি সমজদার ছবিতে সে একটা রঙচঙের ঘটা দেখিলেই অভিভূত হইয়া পড়ে না। সে মুখ্যের সঙ্গে গৌণের, মাঝখানের সঙ্গে চারিপাশের, সম্মুখের সঙ্গে পিছনের একটা সামঞ্জস্য খুঁজিতে থাকে। রঙচঙে চোখ ধরা পড়ে, কিন্তু সামঞ্জস্যের সুষমা দেখিতে মনের প্রয়োজন। তাহাকে গভীরভাবে দেখিতে হয়, এইজন্য তাহার আনন্দ গভীরতর।
এই কারণে অনেক গুণী দেখা যায়, বাহিরের ক্ষুদ্র লালিত্যকে যাঁহারা আমল দিতে চান না; তাঁহাদের সৃষ্টির মধ্যে যেন একটা কঠোরতা আছে। তাঁহাদের ধ্রুপদের মধ্যে খেয়ালের তান নাই।হঠাৎ তাহার বাহিরের রিক্ততা দেখিয়া ইতর লোকে তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইতে চাহে; অথচ সেই নির্মল রিক্ততার গভীরতর ঐশ্বর্যই বিশিষ্ট লোকের চিত্তকে বৃহৎ আনন্দ দান করে।
তবেই দেখা যাইতেছে, শুধু চোখের দৃষ্টি নহে, তাহার পিছনে মনের দৃষ্টি যোগ না দিলে সৌন্দর্যকে বড়ো করিয়া দেখা যায় না।এই মনের দৃষ্টি লাভ করা বিশেষ শিক্ষার কর্ম।”
অন্তত রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্বন্ধে কথাগুলি খাঁটি সত্য। ‘গভীরভাবে’, ‘মনের দৃষ্টি যোগ’ করে দেখতে হয় তাঁর পেইন্টিং আর ড্রয়িং-গুলি। কারণ সেই সব ছবির বহিরঙ্গে আছে এক ‘নির্মল রিক্ততা’, আর অন্তরঙ্গে লুকিয়ে আছে ‘গভীরতর ঐশ্বর্য’। কেজো বুদ্ধিতে তার কিনারা মেলা কঠিন। কারণ তা বার্তা আনে অনুভূতি প্রদেশের। সে ঐশ্বর্য পেতে হলে চোখের দেখার সঙ্গে চাই হৃদয়ের দেখা। তবেই তো খুলে যাবে ‘চিত্তকে বৃহৎ আনন্দ’ দেওয়ার দরজা-জানালা।
রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্বন্ধে প্রথমেই যা মাথায় আসে, তা হল ছবিগুলির অদ্ভুত রস। এক অনাস্বাদিতপূর্ব জগতকে ছবির পর ছবিতে এঁকেছেন তিনি। বিচিত্র সব পশু-পাখি-প্রাণী, মেদুর নিসর্গচিত্র, চিত্তাকর্ষক সব ভঙ্গীমায় নারী-পুরুষের মুখ, দেহাবয়ব, নির্মোহ আর ছদ্ম-নির্লিপ্তিময় আত্মপ্রতিকৃতি, আবেগঘন নকশা, মূর্ত বিমূর্ততা – কী নেই সেখানে! মাধ্যমের ক্ষেত্রেও কোনও নির্দিষ্ট গণ্ডীর বাইরে ছিলেন তিনি। কালো কালি, জলরঙ, প্যাস্টেল রঙ, কালো সীসের পেনসিল, রঙিন কালি, রঙিন পেনসিল, এমনকি খেলাচ্ছলে বার্নিশের রঙ দিয়েও ছবি এঁকেছেন। এঁকেছেন পেন দিয়ে, তুলি দিয়ে, হাতের আঙুল দিয়ে। মাঝেমধ্যে নাকি পরনের ঢিলেঢালা জামাটির হাতা দিয়েও! ছবি আঁকার কাগজ হাতের সামনে যা পেতেন তা-ই ব্যবহার করতে দ্বিধা করতেন না। সে কাগজ টিকবে কি টিকবে না, ওসব নিয়ে বেশি ভাবার দুর্নাম তাঁর ছিল না। আঁকার ক্ষেত্রে ভক্ত ছিলেন দ্রুততার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছবি সম্পূর্ণ করতেন একটা সিটিং (sitting)-এ। শোনা যায়, তিনি চাইতেন, ছবি তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাক। তাই একবার নাকি ক্যানভাসে তেলরঙে ছবি আঁকতে শুরু করেও মাঝপথে ছেড়ে দেন, কারণ তেলরঙ শুকোতে সময় লাগে!
এ সব ঘটনা শুনলে চোখের সামনে পাশ্চাত্যের কোনও খামখেয়ালি চিত্রকরের ছবি ভেসে ওঠে। ভুলে যেতে হয় যে, কথা হচ্ছে ভারতের এক ‘উপনিষদ-ভক্ত’, ‘ঋষিতুল্য’ কবিকে নিয়ে। আসলে শিল্প নিয়ে পরম নিরীক্ষার সঙ্গে ছন্নছাড়া হওয়াকে গুলিয়ে ফেলেননি মানুষ রবীন্দ্রনাথ। তিনি জানতেন কেমন করে বিশৃঙ্খলাকেও হজম করে নিয়ে প্রকাশ করা যায় চরম সুষমায় – যেমন শিল্পে, তেমনই জীবনে। অন্তঃকরণকে ফালা ফালা করে দেওয়া দুঃখের ক্ষেত্রেও নড়চড় হয় না এই যাপন-প্রক্রিয়ার। যেমন, শিল্পী নন্দলাল বসুকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, নারীমুখ আঁকতে গেলেই তাঁর মনে পড়ে যায় কাদম্বরী দেবীর কথা। প্রিয় বৌদিমণি কাদম্বরী দেবীর আকস্মিক মৃত্যু রবীন্দ্রনাথকে ব্যথাতুর করেছে আজীবন। অজস্র গান ও কবিতার মতো তাঁর ছবিতেও প্রভাব ফেলে গিয়েছে সেই ব্যথা। তাই কি রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারীদের চোখে অমন বিষণ্ণতা? তাই কি হাসতে গিয়েও মাঝপথে থমকে থাকে তাদের ঠোঁট? বিষাদের ছায়া এসে পড়ে সেখানেও? কেন কখনও দৃশ্যমান, কখনও বা অদৃশ্য অবগুণ্ঠনে ঢাকা থাকে তাদের মুখ, তাদের সত্ত্বা? কেন এত অন্ধকারের জাল ঘনিয়ে থাকে তাদের ভিতরে বাইরে?
সত্যিই যেন এক বিষাদ, এক অন্ধকার ছেয়ে থাকে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে। কালো রঙ, গাঢ় চকোলেট রঙ, কালচে বাদামী, বাদামী মেশানো লাল রঙ যেন ঘন-ঘন ব্যবহার করেন তিনি। আন্দাজ করা যেতেই পারে, মানুষ রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবন এবং তাঁর দেখা মানবজীবন থেকে আসা যন্ত্রণাদীর্ণ আবেগগুলির বিশোধন (catharsis)-এ সাহায্য করে ছবিতে ওই গাঢ় রঙের ব্যবহার। মানুষের মধ্যে তো বাসা বেধে থাকে কিছু অপার দুঃখ। তার তল পায় না কেউ। বহু ক্ষেত্রে যার দুঃখ, সে-ও না। সেই দুঃখই হয়তো অন্ধকারের রঙ হয়ে ছড়িয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ছবিগুলিতে। নীরবে বলতে চায় মানুষের অস্তিত্বের বিশ্বজনীন মর্মবেদনার কথা।