পর্ব–৩
খেয়াল রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকা শুরু করছেন বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগে। ইউরোপের শিল্পে-সাহিত্যে আধুনিকতা (modernism)-এর সূত্রপাত হয়ে গিয়েছে ততদিনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচে পুড়েছে বিশ্ব। বিজ্ঞানে, শিল্পে, অর্থনীতিতে, মানবমনে তুমুল ভাঙচুর ঘটিয়ে, নানা সমস্যা-সম্ভাবনা প্রসব করতে করতে জোর কদমে পা ফেলছে আধুনিক যুগ। ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ বইতে রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ আবু সয়ীদ আইয়ুব আধুনিক শিল্পীসত্ত্বার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ‘তীব্র অমঙ্গলবোধ’-কে। মানুষের পূর্ণতার সম্ভাবনায় আস্থাশীল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে এই অমঙ্গলবোধের সঙ্গে। বারেবারে জিতিয়ে দিয়েছে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোকেই। অন্য অনেক আধুনিক সাহিত্যিকের সঙ্গে তার ফারাক হয়েছে এখানে। কিন্তু চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের বেলায় যেন আলাদা কিছু হল। ছবিতে হয়তো আলগা হয়ে গেল তাঁর এই নাছোড় ইতিবাদী দর্শনের স্ব-আরোপিত রাশ। তাঁর নিজের যুগের সর্বব্যাপী অমঙ্গলবোধ-ই অন্ধকার হয়ে প্রবেশ করেছে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে, এ কথাকে একেবারে ভুল বলা যাবে কি? হয়তো না। অনেকেই স্বীকার করবেন যে, বিশ্বব্যাপী মানদণ্ডের নিরিখে সাহিত্যে নয়, বরং চিত্রকলাতেই ধ্রুপদী অর্থে ‘আধুনিক’ শিল্পের মর্মস্থলে পৌঁছতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

এ প্রসঙ্গে আমরা ফের স্মরণ করব দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ প্রবন্ধটির কথা। তাঁর কথায়ঃ
“ রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকেন খাঁটি ইওরোপিয়ান আঙ্গিকে। তাই তাঁর ছবি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে আধুনিক ইওরোপিয়ান ছবির আসল সমস্যা ও উদ্দেশ্য কী।”
দেবীপ্রসাদবাবুর মতে, ইউরোপের ‘আধুনিক’ শিল্পীরা রিয়ালিজম-এর চর্চা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। ক্রমাগত ‘নিখুঁত করার’ আর ‘পালিশ করার’ চেষ্টার বদলে তাঁদের মধ্যে ‘প্রাণের দিকে নজর’ দেওয়ার ইচ্ছা জেগেছে। এ জন্য তাঁরা প্রেরণা নেওয়ার চেষ্টা করছেন আদিম যুগের শিল্প থেকে। কারণ এই শিল্পীরা দেখছেন আদিম শিল্পেঃ
“ ঝোঁক পড়েনি ফটোগ্রাফিক ফাইডেলিটির দিকে। বিষয়বস্তুর সামান্য লক্ষণ যে আবেগ জাগায় তাকে নগ্নভাবেই প্রকাশ করাই ছিল উদ্দেশ্য। ফলে কোনও গুহায় প্রাগৈতিহাসিক ছবি যখন দেখি – একটা ঘোড়া আঁকা হয়েছে, বুঝি যে ওটা ঘোড়াই, কিন্তু এই ঘোড়া বা ওই ঘোড়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মতো নিখুঁত বর্ণনা তাতে নেই। অর্থাৎ ঘোড়ার মূল কথাটা আছে শুধু।”
তবে আদিম শিল্পের সঙ্গে আধুনিক শিল্পের একটা তফাৎ আছে। আদিম শিল্পী ‘নগ্ন’ সত্যের আভাস পেয়েছিলেন ‘আকস্মিক’ ভাবে। তা ছিল মূলত ‘অবচেতনার স্তরে’। আর আধুনিক শিল্পের উদ্দেশ্য হলঃ
“ এই অবচেতনা ও আকস্মিক সত্যকে চেতনার স্তরে আনা …।”
এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয় শ্রীলঙ্কার তামিল বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট ভারতীয় শিল্পতাত্ত্বিক আনন্দ কুমারস্বামীর কিছু কথার। ১৯৩০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রদর্শনী দেখে কুমারস্বামী লিখেছিলেনঃ
“ An exhibition of drawings by Rabindranath Tagore is of particular interest because it puts before us, almost for the first time, genuine examples of modern primitive art. One may well wonder how those artists and critics who have so long striven for and praised the more calculated primitivisms, archaisms, and pseudo – barbarisms of European origin will respond; will they admire the real thing?”
সত্যিই তো, যে সব গাছপালা, মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি আর উপাদানসমূহ আলোআঁধারির ভিতর থেকে মাথা তোলে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে, তাদের মধ্যে রিয়ালিজম বা ‘নিখুঁত বর্ণনা’-র লেশমাত্র মেলা ভার। তবু তাদের পাওয়া যায় স্বমহিমায়। বিশ্বকবির আঁকা পাখিকে পাখি বলে চেনা যায় নির্ভুল ভাবে, কিন্তু জগতের ঠিক কোন পাখির সঙ্গে তার মিল আছে, তার উত্তর মেলে না – অর্থাৎ ওতে পাখির ‘মূল কথাটা আছে শুধু’। আর আধুনিক যুগের শিল্পী রবীন্দ্রনাথ সেই পাখি এঁকেছেন আকস্মিক ভাবে নয়, সচেতন ভাবে। এখানেই পিকাসো বা মাতিসের মতো চিত্রকরদের সঙ্গে তাঁর প্রাণের মিল।
এখানে তাঁর প্রাণের মিল ভারতীয় শিল্পরীতির এক অন্যতম বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও। কারণ একই। ভারতীয় শিল্প রিয়ালিস্টিক নয়, আইডিয়ালিস্টিক। সেখানেও যার মূর্তি গড়া বা ছবি আঁকা হচ্ছে, তার বহিরঙ্গের নিখুঁত অনুকৃতির বদলে সারবত্ত্বা বা মর্মবস্তু (essence)-কে ফুটিয়ে তোলার উপরেই জোর দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, গ্রিক রীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ গান্ধার শিল্পজাত বুদ্ধ মূর্তির সঙ্গে সাঁচির বুদ্ধ মূর্তির তুলনা করা যায়। গান্ধার শিল্পের বুদ্ধ অস্থি-পেশী সব নিয়ে যেন এক আসল মানুষ। অন্য দিকে, সাঁচির বুদ্ধ অদ্ভুত কমনীয়তা ও শান্ত ভাব নিয়ে যেন পরম বোধির এক দৃশ্যগ্রাহ্য রূপ। মানবশরীরের অঙ্গসংস্থানের সঙ্গে নিখুঁত মিল তার নেই। কিন্তু বুদ্ধকে চিনতে অসুবিধে হয় না একফোঁটা। সে রকমই, রবীন্দ্রনাথের আঁকা পাখির মধ্যে ধরা আছে পক্ষী জাতের সারবত্ত্বা। তাই এক লহমায় তাকে চিনে ফেলা যায়।
তবে ভারতীয় শিল্পের সঙ্গে একটা বেমিলও আছে রবীন্দ্রনাথের তথা আধুনিক শিল্পীদের। প্রাগৈতিহাসিক চিত্রের সঙ্গে ভারতীয় শিল্পের তফাতও ঠিক এই জায়গায়। তা হল, ভারতীয় শিল্পের ভাবগত ভিত্তি হিসেবে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে পুরাণ। খাপছাড়া ভাবে একটা হরিণ বা একটা গাছের ছবি, এমনটা নয়, বরং সবটা মিলিয়ে এক ভাবজগত। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়ঃ
“ যে-জগৎ আগাগোড়া সামান্য লক্ষণের জগৎ, এবং একটা পুরোপুরি সংহত পুরাণের উপর যার স্থিতি। সেখানে যে জটায়ু সে ত আর মরলোকের কোনো বিশেষ পাখী নয়, অথচ পাখীর মূল কথাটা তার মধ্যে রয়েছে। সেখানে যে হনুমান সে ত আর কোনো দৃষ্ট বানর নয় ; তার জন্ম ইতিহাস, ক্রিয়া-কলাপ, এর কোনোটাই মরলোকের নয়। তবু বানর বলে তাকে চিনতেও ভুল হয় না। আর সেই জটায়ু, সেই বানর, সেই রাক্ষস সবের মধ্যে আশ্চর্য সংহতি …।”

পৌরাণিক এই ভাবজগত এক বিশাল আশ্রয় দেয় ভারতীয় শিল্পকে। এক রকমের স্থিতি দেয়। ইউরোপের শিল্প বহু আগে থেকেই ‘সামান্য লক্ষণের’ পথ ছেড়ে চূড়ান্ত রিয়ালিজম-এর দিকে হাঁটা শুরু করলেওঃ
“ বহুদিন খ্রিস্টের পুরাণে বিশ্বাস অটুট রাখতে পেরেছিল এবং যতদিন পেরেছিল ততদিন অশান্তি জোটেনি।”
কিন্ত রবীন্দ্রনাথের মতো আধুনিক চিত্রশিল্পীদের এই পুরাণ-নির্ভর নিশ্চিন্তি নেই। মানুষ ও জগত সম্পর্কে এক সাধারণ বিজ্ঞান-চেতনার বিস্তার, তথাকথিত ধর্মবিশ্বাসে ভাঙন, কলকারখানার আগমন, যন্ত্রের দিগ্ব্বিজয়, আর্থ-সামাজিক ভাবে সমাজের গঠনগত দ্রুত রদবদলের মতো বহু কারণে হারিয়ে গেছে শিল্পীর চিত্তের সেই পৌরাণিক স্থিতি। জন্ম নিয়েছে হাজারো জিজ্ঞাসা, সংশয়। চেতনা, কল্পনা আর দুর্নিবার সৃষ্টিপিপাসা নিয়ে তাঁরা উত্তর খুঁজেছেন সে সবের। সেই সব জিজ্ঞাসারাই হয়তো ভিড় করে এসেছে রবীন্দনাথের ছবির গাঢ় রঙে, প্রাণী ও মানুষের বিভ্রান্তিময় শরীরী ভাষায়, অবোধ্য আকৃতি আর জটিল নকশায়।

কিন্তু চিত্রকলায় কোনও তথাকথিত শিক্ষা ছাড়া অমন সাফল্য কীভাবে পেলেন রবীন্দ্রনাথ? রহস্যটা কী? এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ভ্রান্তি। তথাকথিত শিক্ষা ছাড়া কি শিক্ষালাভ অসম্ভব? পড়াশোনার কথা যদি বলতে হয়, রবীন্দ্রনাথ তো কিছুদিন যাওয়ার পর স্কুলের পাটই চুকিয়ে দিয়েছিলেন। তা বলে কি তার বিদ্যালাভ হয়নি? হয়েছিল। এই সূত্রই অনেকটা কাজে আসতে পারে চিত্রকলায় তাঁর বিশেষ ধরনের পারদর্শিতাকে বোঝার ক্ষেত্রে। দেবীপ্রসাদবাবু বলেছেন বটে, রবীন্দ্রনাথের “শিল্প-ইতিহাসের মধ্যবর্তী স্তরগুলি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা নেই”, কিন্তু এই বক্তব্য পুরোপুরি ঠিক নয়। ‘অভিজ্ঞতা’ বলতে যদি হাতেকলমে ছবি আঁকার কথা হয়, রবীন্দ্রনাথের সত্যিই সেই ‘মধ্যবর্তী’ রিয়ালিজম-এর স্তরের অভিজ্ঞতা নেই, যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন বিশ্বখ্যাত আধুনিক শিল্পীরা। দেবীপ্রসাদবাবুর কথায়ঃ
“ আজ ইউরোপে যাঁরা প্রাগৈতিহাসিক ছবির দিকে ঝুঁকছেন তাঁরা প্রায় সকলেই প্রথমে কী পরিশ্রম করেছেন রিয়ালিস্টিক ছবির আঙ্গিককে দখল করতে ; অথচ মজার কথা, উদ্দেশ্য এই রিয়ালিস্টিক ছবিকেই ভাঙাঃ পিকাসো, মাতিস সকলেরই – হবেই বা না কেন? আইন অমান্য যিনি করতে চান তাঁকে তো প্রথম হতে হবে আইনের ব্যাপারেই পাকা।”
তবে ‘অভিজ্ঞতা’র অর্থ যদি হয় দেশ বিদেশের নানা সময়কালের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা, খোঁজখবর রাখা, সে সম্বন্ধে জ্ঞান, বোধ, তা হলে রবীন্দ্রনাথের সে অভিজ্ঞতা একেবারেই ছিল না বলাটা কষ্টকল্পনার ব্যাপার হবে। ইতিহাস উল্টো সাক্ষ্যই দেয়। এমনকি ভ্যান গঘ, পিকাসো, মাতিসের মতো শিল্পী যখন বিশ্বখ্যাতি পাননি, তখনও তাঁদের কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৪ সালে ইউরোপ ভ্রমণের সময় তাঁদের ছবির ব্যাপারে খোঁজ নেন তিনি।
পর্ব—৪
নিজের লেখার খসড়ায় যাবতীয় কাটাকুটি আর আঁকিবুঁকিকে জুড়ে জুড়ে নকশা তৈরি করার নেশা তো রবীন্দ্রনাথের ছিলই, সাহিত্যচর্চার প্রায় শুরুর দিক থেকেই, যা তাঁর ছবি আঁকার ক্ষেত্রে মহড়া হিসেবে একটা অভ্যাসগত ভিত্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা নেয়। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথায়ঃ
“ I try to make my corrections dance, connect them in a rhythmic relationship and transform accumulation into adornment. This has been my unconscious training in drawings.”

তবু সেটুকুও যেন যথেষ্ট ছিল না। খসড়ায় আঁকিবুঁকির সেই ‘অচেতন তালিম’-এর স্তর পেরিয়ে যখন সত্যি সত্যি ছবি আঁকতে বসলেন রবীন্দ্রনাথ, তখন যার যাদুর পরশ তিনি পেলেন, তা তাঁর আজীবনের পাথেয়, এমনকি সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও। তা হল ছন্দ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের সহজাত বোধ, কল্পনার অসাধারণ বিস্তার আর জীবন তথা শৈল্পিক সৃষ্টি সম্বন্ধে এক নিমগ্ন দার্শনিকতা। দেবীপ্রসাদবাবু একেই বলছেন ‘কল্পনার অসামান্য ছন্দোময় শক্তি’। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথায়ঃ
“ … one thing which is common to all arts is the principle of rhythm which transforms inert materials into living creations. My instinct for it and my training in its use led me to know that lines and colours in art are no carriers of information ; they seek their rhythmic incarnation in pictures.”
রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে এই ছন্দময়তার এক গভীরতর তাৎপর্য আছে। ক্ষুদ্রের নিজের মধ্যে নিজের সম্পূর্ণতা নেই, বৃহতের সঙ্গে তার সুর না মিললে আসে অসঙ্গতি, আর মিললে আসে সার্থকতা। মানুষের জীবন বা বিশ্বসংসারের যে কোনও ঘটনার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি – সবের ক্ষেত্রেই এ কথা সত্য। এটা হল রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক ভাবনার একটা মূল কথা। তাই রঙ বা রেখার বিক্ষিপ্ত আঁচড় তাঁকে ব্যথা দেয়। আর সেগুলিই যখন পরস্পরের সঙ্গে মিলে স্থান করে নেয় এক ছন্দময় সংহতির মধ্যে, তখনই শান্তি পান শিল্পী রবীন্দ্রনাথ। বলে ওঠেনঃ
“ It interests me deeply to watch how lines find their life and character, as their connection with each other develops in varied cadences, and how they begin to speak in gesticulations. I can imagine the universe to be a universe of lines which in their movements and combinations pass on their signals of existence along the interminable chain of moments. The rocks and clouds, the trees, the waterfalls, the dance of the fiery orbs, the endless procession of life send up across silent eternity and limitless space a symphony of gestures with which mingles the dumb wail of lines that are widowed gypsies roaming about for a chance union of fulfillment.”

রিয়ালিস্টিক ছবির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার অভাবের কথা অনেকেই বলে থাকেন। এখানে সেই সব সমালোচকদের উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন রাখা যাক। এটা ঠিক যে পিকাসো বা মাতিসের মতো জগদ্বিখ্যাত আধুনিক শিল্পীরা রিয়ালিজম-এর বাইরে বেরনোর আগে রিয়ালিজম এর ব্যাপক চর্চা করেছেন। এর একটা কারণ হতে পারে যে, তাঁরা শুরুতেই ভেবে বসেননি যে তাঁদের রিয়ালিজম-কে ভাঙতেই হবে। গতানুগতিক পথে তাঁরা তাই রিয়ালিজম থেকে শুরু করেছেন। কিন্তু কোনও শিল্পী বা ভাবী শিল্পী যদি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি রিয়ালিস্টিক ছবি আঁকবেনই না, তা হলেও তাঁদের রিয়ালিজম থেকে শুরু করতেই হবে, এমন শাস্ত্রবাক্য কোথাও লেখা আছে কি? রিয়ালিজম-কে এড়িয়ে তাঁদের হাতেকলমে শিল্পশিক্ষা অন্য নতুন পথ ধরে এগোনোর সম্ভাবনা থাকতেই পারে। পরিস্থিতির খাতিরে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার বিকাশ যে পথে ঘটেছে, তা তাঁদের ক্ষেত্রে পরিকল্পনামাফিক করা যেতেই পারে, এবং আবিষ্কার করা যেতে পারে আরও নতুন নতুন পথ, যার সঙ্গে রিয়ালিজম-এর অন্তত সরাসরি কোনও সম্পর্কই নেই। “আইন অমান্য যিনি করতে চান তাঁকে তো প্রথম হতে হবে আইনের ব্যাপারেই পাকা” – দেবীপ্রসাদবাবুর তোলা এহেন যুক্তি এ ক্ষেত্রে খাটে না, কারণ আইন আর শিল্প এক ব্যাপার নয়।
এই দিক থেকে দেখলে, রবীন্দ্রনাথকে চিত্রশিল্পী হিসেবে ‘সৌভাগ্যবান’ ভাবাটা অসম্ভব নয় – ‘রিয়ালিজম’-এর বোঝা তাঁকে কখনোই বইতে হয় নি।