পরাগ রায়

সময়টা উনিশশো সত্তরের দশক । কলকাতায় সাদা কালো টিভির যুগ। সেই সাদা কালো টিভির স্ক্রীনের সামনে নীল রঙের একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের পাত আলাদা করে লাগানো হতো । একটা ধারণা , কোথা থেকে গজিয়েছিল জানিনা, যে সরাসরি সাদা কালো ছবি টিভিতে দেখলে নাকি ছেলেপুলেদের চোখ খারাপ হয় । তখন পাড়ায় কয়েকটা বাড়িতে টিভি ছিল । টিভি আছে মানে দুপয়সা আছে সে বাড়ির লোকের … মানে অবস্থাপন্ন আরকি । টিভি মানে ছাদে একটা তিন ঠ্যাঙ এন্টেনা । হাওয়ার দাপটে সে নড়লেই টিভির সংবাদ পাঠিকার ছবিও লাফাতে থাকে। কাক বসলেও সে এন্টেনার দিক পরিবর্তন ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে জগঝম্প শুরু । প্রায় প্রতি টিভিওয়ালা বাড়িতে একজন রোগা পটকা , ছাদের কার্নিশ বেয়ে উঠতে পারে এমন সদস্য থাকতো যার কাজ হতো দিকভ্রষ্ট এন্টেনাকে বাগে আনা । নিচে বাড়ির কর্তা ও চলমান দুরদর্শন যন্ত্রটি । নির্দেশ যাচ্ছে ,” বাঁয়ে বাঁয়ে , আরেকটু ডাইনে, একটু সোজা, য়্যায় ঠিক আছে …।” টিভিতে উত্তমকুমারের বেঁকে যাওয়া মুখ অবশেষে সোজা হল …. হুড়মুড় করে সকলে টিভির সামনে আবার । এহেন এন্টেনায় রক্ষে নেই , বাজারে এল বাংলাদেশের এন্টেনা । আকারে সে ছোট, অনেকগুলো দাঁত, মূল এন্টেনার উপর তেরচা করে লাগানো হতো । তখন বাংলাদেশের টিভিতে প্রচুর হলিউডের ছবি দেখানো হতো। ঢাকার টিভির নাটকের মানও ছিল উন্নত । সেসব দেখতে মানুষ ভীড় করতো টিভির সামনে ।
কলকাতা দুরদর্শনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল বুধবারের হিন্দী সিনোমার গানের অনুষ্ঠান চিত্রহার আর বৃহস্পতিবার বাংলা সিনেমার গানের চিত্রমালা । এছাড়াও শনিবারের সন্ধ্যার হিন্দী ও রবিবারের সন্ধ্যার বাংলা সিনেমার অমোঘ হাতছানি। যে বাড়িতে টিভি আছে সেই বাড়িতে কাজ পাওয়ার জন্য গহ সহায়িকাদের শুনেছি গোপন প্রতিযোগিতা চলতো … বেতন হারে কুড়ি তিরিশ টাকা কম করার বোঝাপড়া করতেও আপত্তি হতোনা কিছু ক্ষেত্রে । তার বদলে শনি রবির সিনেমা দেখার সুবর্ণ সুযোগ বলাই বাহুল্য।

সত্তরের দশকে আমাদের পিকনিক পার্কের অধিকাংশ বাড়িতেই টিভি ছিল না। ফলে বিশেষত সিনেমা দেখার দিন যাদের বাড়ি টিভি ছিল তাদের বৈঠকখানা ভরে থাকতো পাড়া প্রতিবেশীতে । ওই জনসমাগমে বার দুই চা আর মুড়ি বিস্কুটের সাপ্লাইতে কারো বাড়িতেই আপত্তির কিছু দেখিনি।সেই সময় কলকাতার ফুটবল শহর জীবনের অন্যতম অঙ্গ ছিল। আমাদের পিকনিক পার্ক হাউসিং এস্টেটের খেলার মাঠে সকাল বিকেল ফুটবল চলতো। পার্কের ছেলেপুলেদের থেকে দুপাশের দুটি বাঙাল উদ্বাস্তু কলোনীর ছেলেদেরই দাপট বেশি । বাঙালী হিন্দুরা ফুটবলগতভাবে মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত – ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান। পিকনিক পার্কের ফুটবল জনতার নব্বই শতাংশ ইস্টবেঙ্গলের সমর্থক। এর মাঝে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় বইমেলার মাঠে ” ফুটবলের সোনার পরী ” নামের একটা বই কিনলাম যা মূলত ফুটবলের বিশ্বকাপের ইতিহাস । সেখানে পেলে, ইউসোবিও, লেভ ইয়াসিন, বেকেনবাওয়ার নামক নানা নাম না জানা মানুষের কথা আর জার্মানি, ইতালীর পাশে উরুগুয়ে এবং ব্রাজিল নামক এক রূপকথার দেশের গল্প ।
আর্জেন্টিনার উপস্থিতি তখনও বিশ্ব ফুটবলে তেমন ছিলনা । তো নবলদ্ধ এই জ্ঞানের ঝুড়ি একদিন খানিকটা উপুড় করলাম পাড়ার হাবুদাদার কাছে । বিশ্বকাপ ফুটবল বিষয়টি তাঁর মগজে বিশেষ ঢুকল না । খানিকটা শুনে তিনি রায় দিলেন,”ইউসোবিও বা ববি চার্লটন যাই হোক, আমাগো ভৌমিকের ( সুভাষ ভৌমিক) চাইতে ভালো প্লেয়ার অরা হইতেই পারেনা ।” ফলে বুঝলাম নিজের জ্ঞান নিজের কাছে রাখাই ভালো। যদিও পরের বছর ( 1977 )বিধাতা পুরুষ মুচকি হাসলেন কারন আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকায় একযোগে খবর হলো যে আমেরিকার কসমস ফুটবল ক্লাব, পেলে এবং আরো কয়েকজন বিশ্বকাপ খেলোয়াড়দের নিয়ে কলকাতায় খেলতে আসছে। কয়েকদিনের মধ্যেই খবরের কাগজ আর পত্রিকাগুলি ঝাঁপিয়ে পড়লো পেলে এবং বিশ্ব ফুটবলের খবর নিয়ে। ক্রমশত ফুটবল নিয়ে হৈচৈ পাগলামির পর্যায়ে পৌঁছালো ।
কাগজের লেখায় পেলে ক্রমশ বড়ো খেলোয়াড় থেকে মহামানব আর তারপর অতিমানবে পরিণত হলেন। অথচ তাঁর খেলার বিশেষ কোন নমুনা ৯০% বাঙালী দেখেনি । কলকাতা বিমানবন্দরে জনসমুদ্র দেখে পেলে নিজেও অবাক হয়েছিলেন। এই ফাঁকে কলকাতায় দোকানে দোকানে হাহাকার!! অতিরিক্ত চাহিদায় টিভির দোকান ফাঁকা । গোডাউনের পিছনে পড়ে থাকা , বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানীর টিভি নিয়েও কাড়াকাড়ি। লোকে ধারকর্জ করেও নাকি টিভি কিনেছিল তখন। অবশেষে সেই খেলা হলো । দইএর মতো কাদা ভরা ইডেন গার্ডেনে যে কোন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের খেলতে বলা উচিত নয় সেই বোধও মনে হয় আয়োজকদের ছিলনা । কসমসের সকলে সাবধানে, গা বাঁচিয়ে খেললেন। পেলে দর্শকদের আবেগকে সম্মান দিয়ে মাঠে থাকলেন । কিন্তু মিডিয়া যে প্রত্যাশার অলীক বেলুন ফুলিয়েছিল তা চুপসে গেল । কলকাতার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে হাবুদাদার ধারনায় তেমন আঁচড় পড়লনা।

আমাদের বাড়িতে টিভি ছিলনা । আর্থিক কারন ছাড়াও মূলতঃ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাড়ীতে টিভি এলে ছেলেপুলেদের পড়াশোনা যে উচ্ছন্নে যাবে সে বিষয়ে বহু অভিভাবক সহমত ছিলেন। সরকারি দুরদর্শন তখন একমাত্র চ্যানেল । ভাবতে এখন অবাক লাগে যে সন্ধ্যার সময় অনুষ্ঠান আরম্ভ হতো আর রাত এগারোটা বাজলে ঘোষিকা সেদিনের অনুষ্ঠান শেষ হতো বলে জানাতেন । তারপর কোন সিগন্যাল থাকতোনা।বিদেশী টেলিভিশন নির্মাতাদের কোন হদিশ ছিলনা । দেশীয় নানা কোম্পানীর টিভি বাজার ছেয়ে থাকতো যেমন টেলিভিস্টা, ওয়েস্টন, বিগস্টোন, ভারত, সোনোডাইন, কেলট্রন, আপট্রন ইত্যাদি নামগুলো মনে পড়ছে । খুব জনপ্রিয় ছিল ইলেকট্রনিক কর্পোরেশনের ইসি টিভি । নব্বই দশকে মুক্ত বানিজ্য নীতি চালূ হয় । জাপানী, কোরিয়ান, চীনে নানা ব্র্যান্ডে বাজার ছেয়ে গেল। তারপর খেয়ালও নেই যে কবে কখন সেই দেশী কোম্পানীরা বাজার থেকে ধীরে ধীরে অপসৃত হলো। যাই হোক সেই ধূসর সত্তরের দশকে, নকশাল আন্দোলন, বাংলাদেশের যূদ্ধ, জরুরী অবস্থার ঘোষনা, ইন্দিরার পতন, বামপন্থীদের বিজয়ের ক্রমাগত পটপরিবর্তনের মাঝে আমাদের জীবনে এল মাল্টি চ্যানেল টিভি । খটখট করে নব ঘুরিয়ে চ্যানেল বদলানো যায় আর অন্য দুটো নব ঘোরালে brightness contrast যার মাত্রা নিয়ে প্রায়শঃ ভাই বোনেদের ঝগড়া হতো। সব কেরামতি অবশ্য ঐ সাদা কালো টিভিতেই । রঙীন টিভি তখনও গল্পকথা। সত্তরের দশকে রঙীন সম্প্রচারই আরম্ভ হয়নি এদেশে ।
আমাদের বাড়িতে রবিবারের আড্ডা হতো বাবার বন্ধু ও প্রতিবেশী কাকু জ্যেঠু দের। টিভি সংক্রান্ত আলোচনায় সকলেই একমত হতেন যে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বারোটা বাজাতেই এই টিভি নামক উপদ্রবটি আমেরিকান ষড়যন্ত্রে তৈরী হয়েছে। বলে রাখা ভালো যে রাজ্যে সদ্য বামফ্রন্ট সরকার তৈরী হয়েছে । তবে কংগ্রেস ও বাম সকলেই আমেরিকার উপর যে হাড়চটা তা বুঝতাম। তবে সংবাদ এবং খেলা দেখায় তাঁদের উৎসাহ কম দেখতাম না।
আমার মাতামহী কিরণময়ী রায়চৌধুরী আর আমার অবিবাহিতা ছোটমাসী থাকতেন বালীগঞ্জের পন্ডিতিয়ায় । কিরণময়ী অর্থাৎ দিদার মনোরঞ্জনের জন্য সে বাড়িতে টিভি কেনা হলো। টেলিভিস্টা কোম্পানীর চার পা ওয়ালা টিভি যার কারুকাজ করা শাটার টিভির অনুষ্ঠান শেষে মহা সমারোহে বন্ধ করা হতো । আমার ফুটফুটে ফর্সা দিদা ধবধবে শাড়ি পড়ে বিকাল চারটের সময় তাঁর পানের বাটা ও জর্দা সহকারে টিভির সামনে এসে বসতেন । সংবাদ, গান, খেলা, কৃষিকথা সব অনুষ্ঠান শুনতেন, দেখতেন, ঝিমোতেন কিন্তু নড়তেন না । সব অনুষ্ঠান শেষে যখন ঘোষিকা নমস্কার করে বিদায় নিতেন তখনও টিভির শাটার বন্ধ করতে গেলে দিদা তাঁর সহায়িকাকে তাঁর বিশুদ্ধ ঢাকাই উচ্চারণে বকতেন ,” দিসে বন্ধ কইরা ! কি জানি যদি আর কিসু দেখায় ?”
সত্তরের দশকের সেই শেষ লগ্নে এল আটাত্তরের বিশ্বকাপের খবর । এমন এক দেশে যার ফুটবলের খবর আমি বা কলকাতার অনেকেই শোনেনি … সেই দেশ ….. আর্জেন্টিনা । সরাসরি সম্প্রচার না হলেও অব্যবহিত পরেই কলকাতার দর্শক সেমিফাইনাল ও ফাইনালের দুটো ম্যাচ দেখলেন। সেই সাদা কালো টেলিভিস্টা টিভির পর্দায় গতি, দক্ষতা, শক্তি ও সৌন্দর্যের মিশ্রনের অপূর্ব শিল্প সেই আধুনিক ফুটবলের রূপকথা যা কলকাতার দর্শকদের কাছে ছিল অভূতপূর্ব। আর ক্লাস সেভেনের রোমাঞ্চিত এক বালক দেখছিল ঝাঁকড়া চুলের এক অপূর্ব রাজপুত্রকে যে বুনো ঘোড়ার মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে —- মারিও কেম্পেস । শুনেছি আর্জেন্টিনার সেই জয় নিয়ে কিছু বিতর্কের কথা পরবর্তীকালে, কিন্তু, কেম্পেস, লিওপোল্ড লুকে বা উইলবার্দো ফিলোলরা হাজার হাজার মাইল দুরের এক বিশ্ব ফুটবলে অপাঙ্কতেয় প্রাচীন সভ্যতার হাজার হাজার মানুষদের আধুনিক ফুটবল শিল্পের যে স্বাদ যুগিয়েছিলেন তার ঘোর আর কাটলো কই ? পরদিন আমাদের পিকনিক পার্কের মাঠে ফুটবল কোলে নিয়ে বসে থাকা হতভম্ব হাবুদাদাদের কথা মনে পড়ছে ,” কি দ্যাখলাম রে ভাই , কি অপূর্ব খ্যালে অরা ! মানুষ না দ্যাবতা !”
আমার বাড়িতে আজ কোরিয়ান কোম্পানীর রঙীন টিভি । গত পঁয়তাল্লিশ বছরে কতোগুলো রাত জাগা বিশ্বকাপ দেখলো আমার শহর । নীল ডোরাকাটা জার্সিতে ফুটবলের ঈশ্বর মারাদোনার ঘোর কাটতে না কাটতেই আরো এক জাদুকর লিওনেল মেসি সবুজ মাঠে কবিতা লিখতে এলেন । দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এক ক্লান্ত মহানগরের অখ্যাত গলিপথ, পিকনিক পার্কের বহু যুদ্ধে টিঁকে থাকা এক ফালি সবুজ মাঠ আর উদ্বাস্তু কলোনীর বুট না কিনতে পারা ছেলেটার মহল্লার আকাশ দখল নিল সে জাদুকরের ছবিময় ফ্লেক্স । অমিত বিস্ময়ে টিভিতে যখন দেখলাম সেই মেসির পায়ের জাদু তুলিতে সেই আশ্চর্য ফ্রী কিক যা ঈশ্বরের বরপুত্রেরাই রচনা করতে পারেন । আর তার পরেই ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিল এক টাই কোট পরা অতি সুদর্শন পৌঢ়কে — মারিও কেম্পেস , হাসছেন প্রেস বক্সে বসে।বিংশ শতাব্দীর এক ক্লান্ত ধূসর দশক, এক বিস্ময়মুগ্ধ হতবাক কিশোর, সাদা কালো বোকাবাক্সের রঙীন স্মৃতির চিত্রহার সব যেন বিনি সুতোয় গেঁথে দিয়ে গেল ফুটবল নামের একটি খেলা যা কেবল এই গ্রহেই খেলা হয়।