ইরা ইরা ইরানী
রাঙা মাথায় চিরুনি।
ইরা যাবে তেহারান
ওরা ভেবে হয়রান।
ছোটদের মুখে মুখে ফেরা অন্নদাশঙ্করের সেই বিখ্যাত ছড়া। কিন্ত কারা এই ইরানিরা?
কলকাতায় ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, শহরের প্রাচীন রাস্তায় ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস আর সংস্কৃতির অসংখ্য স্রোত এসে মিশেছে এক সুন্দর সহাবস্থানে। সেই সহাবস্থানেরই মূল্যবান অধ্যায় পার্সি সম্প্রদায়।
সংখ্যায় তারা কখনও খুব বেশি ছিলেন না। আজ তো আরও কম। তবুও কলকাতার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি পুরনো বাড়ি, একটি অগ্নিমন্দির, কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্মৃতিতে বা পার্ক স্ট্রিটের পুরোনো রেস্তোরার গল্পে। কিড স্ট্রিটের মানচেরজি রেস্তোরাঁই হোক না বো ব্যারাকসের পার্সি ধর্মশালা, শহরের দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে তারা এখন কলকাতার স্থায়ী স্থপতি।

আজ পার্ক স্ট্রিট, ডালহৌসি বা চৌরঙ্গির ব্যস্ততার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো আর সহজে চোখে পড়ে না তাঁদের উপস্থিতি। কিন্তু শহরের পুরনো স্থাপত্য, একটি অগ্নিমন্দিরের চিরজাগ্রত শিখা, কিংবা বহুদিনের পুরনো কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্মৃতিতে এখনও বেঁচে রয়েছে সেই সম্প্রদায়, যারা একদিন দূর পারস্য থেকে এসে এই শহরকেও নিজেদের ঘর বানিয়েছিল।
কলকাতায় পার্সিদের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকের কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে। তবে তারও আগে ফিরে যেতে হয় পশ্চিম ভারতের উপকূলে।
পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইসলামের বিস্তারের পর জরথুস্ত্র ধর্মাবলম্বীদের একাংশ কয়েক শতাব্দী ধরে ধীরে ধীরে ভারতীয় উপমহাদেশে আশ্রয় নেন। তাঁদের আগমনের কাহিনি ‘কিস্সা-ই-সঞ্জান’ নামে একটি ঐতিহাসিক-সাহিত্যিক গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। যদিও এর সব বিবরণকে ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত বলা যায় না, তবু গবেষকদের মতে অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে পার্সিদের একটি বড় অংশ গুজরাট উপকূলে বসতি গড়ে তোলে। সেখান থেকেই পরবর্তী কয়েকশো বছরে তারা ভারতের অন্যতম সফল বণিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলাতে শুরু করে। একসময় সুরাট ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। পরবর্তীতে সেই গুরুত্ব চলে আসে হুগলি নদীর তীরে গড়ে ওঠা কলকাতায়। পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা প্রশাসনিক রাজধানী এবং পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় বন্দর এবং বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। নতুন এই সম্ভাবনার শহর স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিম ভারতের দক্ষ ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করে, যাদের মধ্যে ছিলেন পার্সিরা।
কলকাতায় প্রথম পার্সি হিসেবে যাঁকে মানা হয়, তিনি দাদাভাই বেহরামজি বানাজি। ১৭৬৭ সালে সুরাট থেকে তিনি কলকাতায় আসেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কলকাতাকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে নতুন বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে তোলা। সেই সময়ে কলকাতা থেকে জাহাজ যেত চীন, বার্মা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে। বানাজি বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতের বাণিজ্যের কেন্দ্র হতে চলেছে এই শহর।

বানাজির সাফল্য অন্য পার্সি পরিবারগুলিকেও কলকাতামুখী করে। পরবর্তী কয়েক দশকে সুরাট, নওসারি এবং বোম্বে প্রেসিডেন্সি অঞ্চল থেকে আরও বহু পার্সি ব্যবসায়ী এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। কেউ জাহাজ পরিবহন, কেউ আফিম ও তুলো রপ্তানি, কেউ বীমা, কেউ আবার ব্যাংকিং ও আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত হন। ব্রিটিশ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে তাঁদের সততা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দ্রুতই বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
সংখ্যার বিচারে তাঁদের উপস্থিতি অবশ্য খুবই সীমিত ছিল। ১৮৩৭ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় আড়াই লক্ষ জনসংখ্যার কলকাতায় পার্সির সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০। ব্যবসার পাশাপাশি দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণ, বিশ্রামাগার, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং জনহিতকর কাজে তাঁদের দানের খ্যাতিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর পার্সিরা নিজেদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন। ১৮৩৯ সালে রুস্তমজি কাওয়াসজি বানাজি এজরা স্ট্রিটে শহরের প্রথম অগ্নিমন্দির বা আগিয়ারি নির্মাণ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই আশপাশের এলাকায় পার্সি পরিবারগুলির বসতি গড়ে ওঠে। সেই সূত্রেই একটি রাস্তার নাম হয়ে যায় ‘পার্সি চার্চ স্ট্রিট’ – যা আজও কলকাতার মানচিত্রে সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। পরে ১৯১২ সালে মেটকাফ স্ট্রিটে বর্তমান অগ্নিমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এখনও কলকাতার পার্সি সমাজের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র।



উনিশ শতকের শেষের দিকে সন্ধ্যা নামলেই স্টার থিয়েটার, মিনার্ভা, ক্লাসিক বা কোহিনূরের সামনে দর্শকদের ভিড় জমত। গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অমৃতলাল বসু, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফির মতো নাট্যব্যক্তিত্বদের হাত ধরে বাংলা থিয়েটার তখন নিজের স্বর্ণযুগের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সেই সময়েই কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরে আর-একটি ধারা প্রবেশ করে পার্সি থিয়েটার।
মূলত বোম্বে-কেন্দ্রিক এই পার্সি নাট্যধারা ভারতীয় পুরাণ, ইতিহাস, উর্দু-হিন্দুস্তানি সংলাপ, সঙ্গীত, জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চসজ্জা এবং পাশ্চাত্য নাট্যপ্রযুক্তির এক অভিনব মিশ্রণ তৈরি করেছিল। সেই নাট্যসংস্কৃতি কলকাতাতেও পৌঁছয়। শহরের বিভিন্ন মঞ্চে পার্সি নাট্যদলের অভিনয় বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং বাংলা থিয়েটারের মঞ্চসজ্জা, আলোক পরিকল্পনা ও অভিনয়ভঙ্গিতেও তার প্রভাব পড়ে।


এই সময়েই কলকাতায় আসেন জামশেদজি ফ্রামজি মাদান, যিনি পরবর্তীকালে জে. এফ. মাদান নামে পরিচিত হন। পার্সি পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় এই শহরেই। প্রথমে নাট্যব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে বিনোদনের জগতে এক ছবি খুব শীগ্রই প্রাধান্য পাবে। বিশ শতকের গোড়ায় যখন অধিকাংশ মানুষ সিনেমাকে কেবল মেলার আকর্ষণ বলেই মনে করতেন, তখন মাদান বুঝেছিলেন এর ভবিষ্যৎ। কলকাতার ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে বায়োস্কোপ দেখানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর পথচলা। পরে একের পর এক স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তোলেন তিনি। সেই সময় সিনেমা দেখতে যাওয়াও কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘মাদান থিয়েটার্স’ বিদেশি ছবির পাশাপাশি, বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণেও বিনিয়োগ করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস, পৌরাণিক কাহিনি কিংবা জনপ্রিয় নাটককে সিনেমায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ সেই সময়ের দর্শকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের বহু পরিচালক, অভিনেতা, চিত্রগ্রাহক এবং প্রযুক্তিবিদ মাদান থিয়েটার্সের মাধ্যমে কাজের সুযোগ পান। নির্বাক ছবির যুগে কলকাতা যে ভারতের অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্রকেন্দ্রে পরিণত হয়, তার নেপথ্যে এই সংস্থার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে নিউ থিয়েটার্স যে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়, সেই ভিত নির্মাণের অন্যতম কারিগর ছিলেন জে. এফ. মাদান।
আজ কলকাতার বহু পুরনো সিনেমা হল হারিয়ে গেছে, অনেকগুলির নামও নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। কিন্তু এক সময় এই শহরকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের রাজধানীগুলির অন্যতম করে তোলার পেছনে যে একজন পার্সি উদ্যোক্তার দূরদৃষ্টি কাজ করেছিল, সেই ইতিহাস আজও শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।



কলকাতার পার্সিদের ইতিহাস অভিবাসনের গল্প, নতুন দেশে শিকড় গাড়ার গল্প, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার গল্প। শহরের ইতিহাসের পাতায়, পুরনো স্থাপত্যে, প্রতিষ্ঠানের স্মৃতিতে এবং কলকাতার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিতরে তাঁদের অবদান এখনও অমলিন। কলকাতা নানা মানুষের মিলিত উত্তরাধিকার। আর সেই উত্তরাধিকারের এক নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবেন পার্সিরা।

তথ্য সূত্র:
Pioneering Parsis of Calcutta – Prochy N. Mehta.
Silent Cinema in India – B. D. Garga.