সৌমা ঘোষ

যৌনতা নিয়ে বাঙালির হেব্বি ট্যাবু। বিশ্বায়িত বাঙালি অবশ্য সেদিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। নয়ের দশকের আগে যা কিছু ছিল লুকোছাপা, নতুন শতকে সবই খুল্লামখুল্লা! অবশ্যই, সবটাই বাইরে বাইরে। ভেতরে এখনও সেই একই বস্তাপচা যৌনতা নিয়ে ভয়। কিন্তু, যাবতীয় সেন্সর এবং নৈতিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, বিশ্বায়নের পরপরই মধ্যবিত্ত বাঙালির হিপোক্রেসিকে তুলোধনা করেছে দু’টি ছবি।
মূলধারার বাজারে ছবি দু’টির নামগন্ধ পাওয়া যায়নি স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু, বিপ্লবকে কখনও আটকে রাখা যায় না। ঠিকই হাতে হাতে ছড়িয়ে যায় ভালোবাসার ‘নিষিদ্ধ ইস্তেহার’।
এই দু’টি ছবিও ঠিকই দেখে নিয়েছে একাধিক প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা।
মার্ক্স, কোককোলা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বড় হওয়া বিশ্বায়িত প্রজন্মের কাছে নিজেদের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছে এই ছবি।
ছবি দুটি কি, তা আজ সবাই জানে— ‘Y2K’, কিউ’র ‘গান্ডু’।
ভগবান, লোফার, বুদ্ধিজীবী, ডিপ্রেসড আঁতেল, লোকাল রোমিও, সিসিটিভি কাকিমা, যৌনতায় অন্ধ হয়ে যাওয়া একাবোকা যুবক, বহু সম্পর্কে একই সঙ্গে জড়ানো পাড়াতুতো দিদি— এই সবাইকেই খুঁজে পাওয়া যায় ‘Y2k’ তে।
আনন্দবাজারের ‘আ’-তে হাত রাখলেই পাওয়া যায় ভগবান দর্শন। হাজার-হাজার বইয়ের মাঝে লুকিয়ে রাখা আছে সেই ‘আ’। আর তাতেই হাত রাখে এক যৌনকাতর যুবক।
একদিকে প্রতিষ্ঠানের এই ভগবানমার্কা চেহারা, আর অন্যদিকে যথেচ্ছ সেন্সরবিহীন যৌনাচার যুবক-যুবতীদের।
ছবির শুরুতেই লাল-কালো হরফে নিদান দেওয়াই ছিল ‘সেক্স ক্রমে আসিতেছে’।
কমলকুমারীয় ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’, ‘Y2K’ বা বিশ্বায়নের পর হয়ে গেছে ‘সেক্স ক্রমে আসিতেছে’!
কাজেই, একটা আস্ত সমাজ শুধু হ্যামবার্গারে কামড় দিচ্ছে আর লাগাচ্ছে। আর ওপরে ওপরে চলছে রাবীন্দ্রিক পুতুপুতু। যৌন মুহূর্তে মেয়েটি তার প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে কথা বলছে, বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে এসে বান্ধবীর মায়ের সঙ্গে চুমু খাচ্ছে ফচকে যুবক।
আঁতেল যৌনকাতর যুবককে লোফার যুবক গীটার বাজিয়ে র্যাগিং করে, বলে— ‘নন্দনে আনকাট ছবি দেখে বলো ফেলিনি!
কী শেখায় তোমার ওসিমা, জাপানি মাসিমা…’
পোস্টমর্ডানিজি়মের এই ভাষা তখন বাংলা সিনেমায় খুবই আনকোরা ছিল, সন্দেহ নেই…
চিরকাল শুধু ন্যাকাবোকা প্রেমকাহিনিতে যুবকরা প্রেম প্রস্তাব পাঠায় যুবতীদের। আর যুবতীরা তা প্রত্যাখ্যান করলে যুবকরা দেবদাস হয়ে যায়।
যুগযুগ ধরে চলে আসা এই প্রেমের গল্পে অনেক আগেই রাপচার ঘটিয়েছে সন্দীপন, সুবিমলরা। বিশ্ব-সিনেমাতেও অনেক আগেই এইসব ট্যাবু ভেঙে দিয়েছেন বার্গম্যান, পাসোলিনিরা। বেশ কিছু বছর পরে হলেও বাংলা সিনেমায় তার কিছুটা সাহস ধরা ছিল ‘Y2K’ তে।
‘গোদার হতে পারি না/নেই যে আনা কারিনা’ চন্দ্রবিন্দুর এ হেন গানের পাশেই এ ছবিতেও রয়েছে দুষ্টু মিষ্টি প্রেমও।
এস.টি.ডি বুথে প্রথম মহিলা প্রেমের প্রস্তাব ফেরালে, পরের মহিলাকে প্রস্তাব দিতে বিচলিত হয় না সেই একই যুবক। কিংবা, ছবির শেষে বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে তাকে পটাতে পটাতে কাজলের সঙ্গে তুলনা করে অন্ধ হয়ে যায় ওই যুবক। এভাবেই বিশ্বায়িত বাঙালির বাথরুমের দরজা হাট করে খুলে দেন চন্দ্রিল।
আমরা আর একটু উত্তর আধুনিক হয়ে উঠি!
‘গান্ডু’
‘ডাউনলোড ফ্রি-তে কুচকিতে ঘাম’…
টাক মাথা এক টিনেজার, কানে দুল, রোগা পাতলা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা এক রিকশাওলা আর লাস্যময়ী এক তরুণী— এই তিন জনকে নিয়েই হাওড়ার এক ছাপোষা পাড়ার গল্প এই ছবি।
ফ্রি-তে ডাউনলোড করেই গেরিলা কায়দায় যথারীতি ছড়িয়ে গিয়েছিল এ ছবিও।
টিনেজার র্যাপার হতে চায়, তার মা পাশের ঘরে যৌনতায় মত্ত এক স্থানীয় প্রমোটারের সঙ্গে।
বারাবারই স্বপ্নে কালীকে দেখে ভয়ার্ত র্যাপার ওই ‘গান্ডু’…
গান্ডু আর রিকশার বন্ধুত্ব জমে ওঠে। গান্ডুর একাকীত্বে মিশে যায় একলা বিছানার হস্তমৈথুন, রিকশার সাথে দেদার গাঁজা খাওয়া, হরেক খিস্তি-গালাগালি এবং সমাজের অন্ধকারে ক্রমশ তলিয়ে যাওয়া।
কিন্তু, লটারির টিকিট কেনা গান্ডুর রোজকার অভ্যেস।
সে স্বপ্নে দেখে একদিন কোটিপতি হবে, পাড়ার লাস্যময়ী ওই তরুণীকে ভোগ করবে, আন্তর্জাতিক মানের র্যাপ গেয়ে দুনিয়া কাঁপাবে।
সাম্প্রতিক কোরিয়ান ও জাপানি চলচ্চিত্রে, যেখানে উত্তাল যৌনতা এবং হিংস্রতা, সেই আদলেই বানানো এই ছবি।
তাকাশি মিকে, গ্যাসপার নোয়া, কিম-কি-দুক, তারান্তিনোর মতো পরিচালকরা সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে ভেঙে দিয়েছে সব দেওয়াল। সেভাবেই ‘গান্ডু’তেও স্বপ্নে দেখা বিভৎস নগ্ন কালী থেকে কখনও নিজের মা, কখনও কালী, কখনও নগ্ন কালী… সকলের সাথেই সঙ্গমের স্বপ্ন দেখতে থাকে টিনএজার গান্ডু। এবং ছবির শেষে স্বপ্নে আন্তর্জাতিক র্যাপারও হয়ে যায় সে।
বাস্তব আর কল্পনা, শ্লীল-অশ্লীল, নৈতিকতার ধারণা—
বিশ্বায়িত প্রজন্মের এই সবকিছু ঘেঁটেঘুঁটে যাওয়াকেই ভয় ও সেন্সরহীনভাবে দেখিয়ে দিয়েছিল এই ছবি।
সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়েছিল সিনেমার এই ভাষা।
ফলে, সমাজের জ্যাঠামশায়রা ও কালচারকাকুরা ঢিল ছুঁড়তে রেয়াত করেনি।
কিন্তু, হাত থেকে হাতে গেরিলা পদ্ধতিতে তো ‘নিষিদ্ধ ইস্তেহার’ ছড়াবেই। আগেই বলা আছে!
কাজেই, আস্ত একাধিক প্রজন্ম খুঁজে পেয়ে গিয়েছিল নিজের সময়ের ভাষা।