
অফিস যাওয়ার পথে লক্ষ করলাম। বাইপাসের ধারে নীল-সাদা ব্যারিকেডের ওপর হলুদ প্রলেপ পড়েছে। সাম্প্রতিক সরকার বদলের ফলপ্রসূ। ২০১১-র পর শহরের রাস্তায় আর্জেন্টিনার পতাকা প্রথমে দৃষ্টিকটু লাগলেও, সময়ের সাথে চোখ সয়ে যায়। আবারও যাবে। ক্ষমতার রঙের সাথে শহরেরও রঙ বদলায়, বদলে যায় দৃশ্যসংস্কৃতি। লেট-ক্যাপিটালাসি নির্লিপ্ততার যুগে অভ্যাসের পাশে জায়গা করে নেয় আপোস। বাম আমলে শহরটা কেমন দেখতে ছিল ঠিক করে মনেও পড়ে না এখন।


ইতালীয় স্থপতি আল্ডো রোসি বলেছিলেন, শহর এক ধরনের ‘কালেকটিভ মেমারি’ বা সমষ্টিগত স্মৃতির স্থাপত্য। কখনও রাস্তার বিন্যাসে, কখনও আলোর ব্যবহারে, আবার কখনও রঙে সেই স্মৃতি প্রকাশ পায়। উনিশ শতকে রাজকীয় অতিথিকে স্বাগত জানাতে যে গোলাপি রঙে সেজেছিল রাজস্থানের জয়পুর। ১৮৭৬ সালে প্রিন্স অব ওয়েলসের সফর উপলক্ষে মহারাজা সওয়াই রাম সিং শহরটিকে গোলাপি রঙে সাজানোর নির্দেশ দেন। পরে সেই রংই শহরের পরিচয় হয়ে ওঠে। জয়পুর থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে যোধপুরের রঙ নীল। বলা হয় থাকে মরুভূমির গরমে বাড়ি ঠান্ডা রাখার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। মরক্কোর চেফশাওয়েন শহরেও গলিঘুপচি, সিঁড়ি, দেওয়াল, সবই নীলের বিভিন্ন ছায়ায় রাঙানো। ইতালির বুরানো দ্বীপের বাড়িগুলির রামধনুর মতো উজ্জ্বল রঙ। সমুদ্র থেকে ফিরে আসা জেলেরা যাতে দূর থেকেই নিজেদের বাড়ি চিনতে পারেন, সেই ঐতিহ্য থেকেই নাকি এই রঙের ব্যবহার।




কলকাতার রঙ কী? অনেককেই এই প্রশ্ন করলাম। কেউ বলল হলুদ ট্যাক্সি, কেউ পুরনো বাড়ির হলদেটে দেওয়াল, কারও কাছে ভর সন্ধ্যায় গঙ্গার উপর হাওড়া ব্রিজের অবয়ব। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই, গত দেড় দশকের কলকাতার সরকারী নীল-সাদা রঙই শহরের রঙ হয়ে উঠেছিল। বছর তেইশের শ্রেয়ার মতে, জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই রাস্তায়-ডিভাইডারে-ব্যারিকেডে নীল-সাদা রঙ দেখে আসার পরে নতুন রঙের সাথে মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধা হবেই। দেড় দশক এক দীর্ঘ সময়। লেকটাউনের ঘড়ি, দ্বিতীয় হুগলি সেতু বা পূর্ব কলকাতার হাই-রাইজ়, বিগত কয়েক বছরে হয়ে ওঠেছে কলকাতার পরিচিতি। এক সময় ময়দানের পরিচিত ৪২ নং বিল্ডিংও নতুন ছিল শহরবাসীর কাছে। হাওড়া ব্রিজ বা ভিক্টোরিয়াও একসময় নতুন ছিল নিশ্চয়ই। এভাবেই নতুন প্রলেপ সময়ের সাথে হয়ে ওঠে শহরের বাস্তব পরিচয়। বাঙালি উদার জাতি, সব সংস্কৃতিকেই আপন করে নিতে জানে। সেই নতুন চেহারার কলকাতা কিরকম দেখতে হবে কে জানে? তখনও কি কলকাতা আমাদের পরিচিত তিলোত্তমা থাকবে?


কথা বললাম ট্রামলাইনের বন্ধু শিল্পী হিরণ মিত্রর সাথে। তিনি জানালেন, দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতি সংস্কৃতির ওপর ছায়া ফেলার চেষ্টা করছে। রঙের নিজস্ব বিজ্ঞান ও নন্দনতত্ত্ব রয়েছে। শহরের পর শহর, রাস্তা থেকে সরকারি ভবন, সব জায়গায় একই রঙের আধিপত্য মানুষের অবচেতনে একটি রাজনৈতিক উপস্থিতি স্থায়ী করে তোলার প্রচেষ্টা। দিনের বেলায় নীল-সাদা রঙ, আর রাতে সেই রঙের আলোকসজ্জা, সব মিলিয়ে যেন একটি নিরন্তর বার্তা যে ক্ষমতা সর্বত্র উপস্থিত। হিরণবাবুর আশঙ্কা, এক রাজনৈতিক শক্তির তৈরি করা প্রতীকী পরিসরকে ভাঙতে গিয়ে পরবর্তী শক্তিও একই পথে হাঁটবে। ফলে রঙের ব্যবহার ক্রমশ নান্দনিকতা বা কার্যকারিতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত হয়। আর এখানেই সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েন শিল্পীরা। কারণ যখন নীল মানেই একটি দল, সবুজ মানেই আরেকটি দল, গেরুয়া মানেই অন্য একটি রাজনৈতিক শিবির, তখন শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়। কোনও পোস্টার, প্রচ্ছদ, মঞ্চসজ্জা বা চিত্রকর্মে একটি নির্দিষ্ট রঙ ব্যবহার করলেই তাকে রাজনৈতিক সমর্থনের চিহ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। হিরণবাবুর আক্ষেপ, রাজনীতি আজ রঙের মতো সার্বজনীন শিল্পভাষাও দলীয় মালিকানার অধীনে চলে যাচ্ছে।
তবে শিল্পী সনাতন দিন্দা জানালেন, তিনি এই বদলকে ইতিহাসের স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবেই দেখছেন। সময়ের সঙ্গে শাসক বদলায়, বদলায় ক্ষমতার ভাষা, বদলায় শহরের চেহারা। এই পরিবর্তন সমাজ ও সময়ের চলমান রূপান্তরেরই অংশ। সনাতনবাবুর কথায়, শিল্পীরা বরাবরই এই বদলের মধ্য থেকেই সৃষ্টির উপাদান খুঁজে পান। একটি শহরের রং, স্থাপত্য, রাস্তার চেহারা কিংবা জনজীবনের অভ্যাস, সবই শিল্পীর কাছে সৃষ্টির রসদ। ফলে শহরের দৃশ্যরূপে পরিবর্তন এলে তা শিল্পচর্চার জন্যও নতুন ভাবনার দরজা খুলে দেয়। তিনি আরও জানালেন, কোনও শহরের দৃশ্যরুপ শুধু রঙের উপরেই নির্ভর করে না। শহরের পরিচয় গড়ে ওঠে তার পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক শৃঙ্খলা, স্থাপত্য এবং মানুষের দৈনন্দিন আচরণের মধ্য দিয়ে। তাঁর মতে, সরকারের সাথে শহরবাসীকেও সমান দায়িত্ব নিতে হবে। রাস্তা নোংরা না করা, জনপরিসরকে সম্মান করা, ঐতিহ্য ও পরিবেশের প্রতি সচেতন থাকা, এসবের মাধ্যমেই শহর সুন্দর হয়ে ওঠে। নাগরিক ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগেই একটি শহরের সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব।
শিল্পী এবং স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ সৌম্যদীপ রায়ের মতে, শহরের দৃশ্যরূপ কখনোই সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত নয়। প্রতিটি যুগই তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিহ্ন শহরের শরীরে এঁকে দেয়। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে শহরের রঙ বদলের ইতিহাস নতুন নয়। ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী প্রায়শই নিজেদের প্রতীকী রঙ, ভাষা কিংবা নকশাকে শহরের দৃশ্যমান পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সৌম্যদীপ জানালেন, সংস্কারের নামে ঐতিহাসিক স্থাপত্যে এমন পরিবর্তন আনা হয় যা মূল নকশা ও চরিত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। পুরনো কারুকাজের জায়গায় আধুনিক উপাদান, ঐতিহাসিক রঙের পরিবর্তে উজ্জ্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ রঙের প্রলেপ, কিংবা পর্যটনবান্ধব করার জন্য কৃত্রিম সাজসজ্জা – ইতিহাসকে সংরক্ষণ করার বদলে তাকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার এই প্রবণতা প্রায়শই ঐতিহ্যেকে আড়াল করে দেয়।

অনেক পুরনো সিনেমা হল, ঐতিহাসিক বাজার, উন্মুক্ত চত্বর কিংবা বহুপ্রজন্মের পরিচিত স্টেটসম্যান বিল্ডিং ভেঙে যখন তার জায়গায় বহুতল আবাসন বা বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে, তখন হারিয়ে যায় সেই স্থানকে ঘিরে মানুষের স্মৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কের জাল। ফরাসি ইতিহাসবিদ পিয়ের নোরার ভাষায়, এইসব স্থানই হলো ‘লিও দ্য মেময়ার’, অর্থাৎ স্মৃতির আশ্রয়। সৌম্যদীপের কাছে, শহরের প্রকৃত পরিচয় এই সম্মিলিত স্মৃতির আশ্রয়েই বাস করে। তাই ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব।
শহর বদলায়, নতুন স্তর যোগ করে, স্মৃতির স্তম্ভ নিয়ে এগিয়ে যায়। হলুদের প্রলেপের নিচে এখনও রয়ে গেছে পুরনো নীলের দাগ। কয়েক বছর পরে এই নতুন রঙও আমাদের চোখে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। নতুন প্রজন্ম হয়তো মনে রাখবেই না যে শহর একদিন অন্য রঙ ছিল।
শহরের পরিচয় তার স্থাপত্যে, জনপরিসরে, স্মৃতিতে, মানুষের প্রতিদিনের চলাফেরায়। একটি শহরের তৈরি হয় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। শাসক আসে, শাসক যায়, ব্যারিকেডের রঙ বদলায়, আলোর বিন্যাস বদলায়।
কলকাতা শহর যেন একটি দীর্ঘ বই, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম নিজেদের রঙের আঁচড় রেখে যায়। আর সেই আঁচড়গুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শহরের প্রকৃত পরিচয়, যা কোনো রঙেই ধরা পড়ে না। শহর বেঁচে থাকে শহরের দৈনন্দিন গল্পে আর শহরবাসীর বাস্তবতায়।
