শহরেরও স্মৃতি থাকে। থাকে তার নিজস্ব শব্দের ছন্দ। কলকাতার ক্ষেত্রে সেই শব্দের মধ্যে অন্যতম হল ট্রামের ঘণ্টা। ধীরগতির অনাড়ম্বর এক উপস্থিতি। একসময় যে ট্রাম ছিল আধুনিকতার প্রতীক, আজ তাকে অনেকেই অতীতের স্মারক বলে মনে করেন। অথচ আজ এক সময় যখন কলকাতা সহ বিশ্বের বহু শহর বায়ুদূষণ মাত্রাধিক, তখন পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণের কথা উঠলে কলকাতার ট্রামই হতে পারে ভবিষ্যতের অন্যতম সমাধান।
ট্রাম বিদ্যুৎচালিত। ফলে চলাচলের সময় এটি সরাসরি কোনও কার্বন ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড বা অন্যান্য ক্ষতিকর দূষক ছড়ায় না। ডিজেল বা পেট্রোলচালিত বাস, ট্যাক্সি কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় ট্রামের পরিবেশগত প্রভাব অনেক কম। একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক যাত্রী বহন করতে সক্ষম ট্রাম প্রতি যাত্রী-পিছু কম শক্তি ব্যবহার করে। ট্রামের জন্য আলাদা করিডর বা নির্দিষ্ট ট্র্যাক থাকলে যানজটও কমতে পারে, ফলে অন্যান্য যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খরচ ও দূষণও হ্রাস পায়। ইউরোপের বহু শহর, যেমন ভিয়েনা, প্রাগ বা আমস্টারডাম, পরিবেশ-সচেতন নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আধুনিক ট্রামব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
কলকাতার ট্রাম সমগ্র এশিয়ার প্রাচীনতম বৈদ্যুতিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে শহরের রাস্তায় চলতে শুরু করা ট্রাম বহু প্রজন্মের কলকাতাবাসীর জীবনযাত্রার সাক্ষী। কিন্ত ট্রামের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। একের পর এক রুট বন্ধ হয়েছে, পরিকাঠামো অবহেলিত হয়েছে, এবং শহরের দ্রুতগতির উন্নয়নের যুক্তিতে ট্রামকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক বলে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে পৃথিবী আজ পরিবেশ রক্ষার জন্য বিকল্প পরিবহণের খোঁজ করছে, সেই পৃথিবীতে কি কলকাতার ট্রাম সত্যিই অপ্রাসঙ্গিক?
ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েসনের যুগ্ম সম্পাদক সাগ্নিক গুপ্ত জানালেন, কলকাতায় ট্রামকে সংরক্ষণের বিষয়েও নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে শহরবাসীর মধ্যে। শহরের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ হিসেবে ট্রামকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে। কিন্ত এই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নাগরিক সমাজের সমর্থনের ওপর। ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে ট্রাম, বাস এবং মেট্রোর মতো বৈদ্যুতিক বা গণপরিবহণমুখী ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য শহর গড়ার পথ।
সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ট্রামকে আরও দ্রুত এবং কার্যকরী করে তোলা সম্ভব। শহরের ব্যস্ত এলাকাগুলিকে সংযুক্ত করে নতুন রুট পরিকল্পনা এবং অন্যান্য গণপরিবহণের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ট্রাম আবারও নগর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। পরিবেশবান্ধব মানবিক নগরীর স্বপ্নে তাই ট্রামের পুনর্জাগরণ আজ নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।