অরূপরতন চক্রবর্তী

লোকসঙ্গীতের দুনিয়ায় এমন কিছু শিল্পী থাকেন, যাঁদের চলে যাওয়া মানে শুধু একজন গায়কের মৃত্যু নয়, একটা সম্পূর্ণ শিল্পধারার শূন্য হয়ে যাওয়া। পান্ডবানি শিল্পী তীজান বাঈ ঠিক তেমনই একজন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় লোকসংগীত হারালো নিজের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ।
বাঙালি হিসেবে তীজান বাঈকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা অনেকেরই কলকাতার কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। নব্বইয়ের দশক থেকে একাধিকবার কলকাতায় এসে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন তিনি। রবীন্দ্রসদন হোক বা শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব—একতারা হাতে তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠে মহাভারতের কাহিনী যেন শুধু শোনা যেত না, চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠত। ভীম, দ্রৌপদী বা অর্জুন—সব চরিত্র যেন একাই অভিনয় করে ফেলতেন তিনি।
আসলে তীজান বাঈ গান গাইতেন না, গল্প বলতেন। আর সেই গল্পের মধ্যে ছিল নাটক, আবেগ, প্রতিবাদ, হাসি, কান্না—সবকিছু। ছত্তিশগড়ের গ্রাম থেকে উঠে এসে যে শিল্পী পান্ডবানিকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাঁর জীবনটাই ছিল এক মহাকাব্য। সমাজের বাধা ভেঙে পুরুষদের আধিপত্য থাকা ‘কাপালিক’ শৈলীতে দাঁড়িয়ে পান্ডবানি পরিবেশন করে তিনি ইতিহাস তৈরি করেছিলেন।

বাংলার সঙ্গীত নিয়েও তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাব ও কথার গভীরতা তাঁকে মুগ্ধ করে। তাঁর মতে, বাংলা গানের শক্তি তার আবেগে, আর সেই আবেগ ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সেই কারণেই কলকাতার দর্শকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আলাদা—তিনি বলতেন, এই শহরের মানুষ মন দিয়ে গান শোনেন।
আজ তীজান বাঈ নেই। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে শোনা ‘মহাভারত’ রয়ে যাবে ভারতীয় লোক ঐতিহ্যের এক অনন্য সম্পদ হয়ে। শিল্পীরা চলে যান, কিন্তু তাঁদের শিল্প সময়কে হারিয়ে বেঁচে থাকে। তীজান বাইও তেমনই—ভারতের লোকসঙ্গীতের আকাশে এক অমলিন নক্ষত্র।