জয়দীপ মুখোপাধ্যায়

আমার ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা ১৯৭৮ সাল থেকে। রাত জেগে সেই উন্মাদনা, সেবার আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হল। আর আমি আটকে গেলাম ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল পাসারেলা-র খেলা দেখে। তখন আমাদের স্মৃতিতে সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যরা। এ বারে ড্যানিয়েল পাসারেলা-র খেলা দেখে মনে হল এত দিনে বোধহয় এই পুকুর থেকে উঠে প্রথম সাগরের অনুভূতি পেলাম। স্কোরবুকে লেখা থাকবে মারিও কেম্পেস, যিনি ট্রফি এনে দিলেন আর্জেন্টিনাকে। পিছন থেকে খেলাটা খেলেছিলেন কিন্তু মিডফিল্ডার লুকে। গৌতম সরকারের খেলা দেখে আমরা যারা বড় হয়েছি, লুকেকে দেখে মনে হল হারিয়ে গেলাম। ফুটবলের অন্য রকম সংজ্ঞা পেলাম।
তখনকার উন্মাদনা, সে তো ভাবাই যায় না। আমাদের পাড়াতে, মনোহরপুকুর সেকেন্ড লেনে, একজন ভদ্রলোক ছিলেন, বাচ্চুদা । লেক মার্কেটে তাঁর ফটোগ্রাফির দোকান ছিল। স্টিল এজ। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বছরে একবার কলকাতার বাইরে শ্বশুরবাড়ি ফুলেশ্বরে যেতেন শুধু। অথচ বিশ্বকাপ দেখতে চার বার অন্তত বিদেশ গেছেন ওয়ার্ল্ড কাপে। সশরীরে গিয়ে ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৬ এবং ১৯৯০-এর প্রত্যেকটা সেমি-ফাইনাল ম্যাচ এবং ১৯৮৬-র ফাইনাল ম্যাচটাও দেখেছিলেন। যদিও বৌদি আক্ষেপ করে বলতেন যে, গোটা পৃথিবী আমার কাছে অজানাই থেকে গেল। যেটুকু জেনেছি ওঁর মুখে বেড়ানোর গল্প শুনে শুনেই। তো, এই রকম উন্মাদনাই তখন ছিল!
পরের দিন অঙ্ক পরীক্ষা, পরীক্ষা কী, সেখানে লিখতে গিয়ে তো জিকো, সক্রেটিস মনে পড়ছে, সেটা ১৯৮২ সাল। একদিনে দুটো পেনাল্টি মিস। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সারারাত আমরাও কেঁদেছিলাম, রকে বসে। খেলা শেষ হল রাত চারটে-র সময়। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না, মনে হচ্ছে গঙ্গায় গিয়ে ঝাঁপ দিই। মানে, কোথাও একটা বাঙালি ফুটবলের সঙ্গে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল যেন এক হয়ে গেছে। এই উন্মাদনা আজীবন মনে থেকে যাবে!

১৯৮৬ সাল, অন্য আবেগ। তখন কলকাতায় ব্রাজিল-ভক্ত অনেক বেশি। ১৯৮২, ১৯৮৬-তে ব্রাজিলের যেসব খেলা আমরা দেখেছি, জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও, এডগার-এদের ভোলা যায় না । পরবতীকালে ডুঙ্গা, রবার্তো কার্লোস, কাফু। কিন্তু ১৯৮৬ আলাদাই উন্মাদনার বছর। একটাই পা চলে, এমন একজন ভদ্রলোককে গোটা বিশ্ব আটকাতে হিমশিম। হ্যান্ড অফ গডও আছে, আবার ফুট অফ গডও তো আছে! তাঁকে তো অস্বীকার করা যায় না।
এই সব হতে হতে, আজকে চলে এসছে আরেকটা বিশ্বকাপ। মুশকিলটা হয় কি, ইউরোপে যখন বিশ্বকাপ হয় তখন দেখাটা সুবিধাজনক হয়। আর কম বয়সে যে ধকলটা নেওয়া যেত, এখন এই মধ্য পঞ্চাশে এসে, আমেরিকার বিশ্বকাপে, সেই ধকল তো নেওয়া যায় না। পরের দিন অফিসের চাপ থাকে। অঙ্ক পরীক্ষয় যে কোনও নম্বর পেলে চলে যাবে। কিন্তু চাকরি চলে গেলে তো আর চাকরি পাওয়া যাবে না এই বয়সে!
ফলে এখনও ওই রাত জেগে খেলা দেখাটা আর হয়ে ওঠে না।
কিন্তু এই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা যতদিন বাঙালির থাকবে, ততদিন থাকবে বিশ্বকাপ। তবে একটাই আফসোস, এই যে কেপ ভার্দে, এক লক্ষ ৬৫ হাজারের দেশ। তারা কোয়ালিফাই করছে, আর আমাদের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি কিন্তু কোথায় আমরা?
যত টুকু স্মৃতিতে আছে বিশ্বকাপের খেলার যোগ্যতা ভারত পেত, তখন অপশন ছিল যে হয় বিশ্বকাপ, নয়তো কমনওয়েলথ। তখনকার দিনের প্রধানমন্ত্রী ভেবেছিলেন কমনওয়েলথ-এ পার্টিসিপেট করাটাই শ্রেয় হবে। ভারত কমনওয়েলথে যোগ দিয়েছিল। আজকে যখন এই কেপ ভার্দে বা কুরাসাও, যেখানে মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ জনগণের বাস, তারা হিমশিম খাওয়াচ্ছে বড় বড় মহীরুহদের! আর আমরা ১৪০ কোটির দেশ হয়ে বুকে স্বপ্ন নিয়ে রাত জেগে দেখি, অন্যের জন্য গলা ফাটাই। নিজেদের দেশের জন্য তো কিছু করতে পারি না। খারাপ লাগে। আমাদের তাবড় রাজনীতিবিদরা এইসব ব্যাপারে যদি একটু মন দেন, সাধারণ মানুষের কথা ভেবে, তাদের ফুটবল প্রীতির কথা ভেবে, সেটুকুই কামনা।