অভিজিৎ বসু

অভিজিৎ বসু সংস্কৃতি এবং খেলা নিয়ে চর্চা করেন নিজের মতো করে। ট্রামলাইনে নানাভাবে তাঁর খেলা দেখার স্মৃতিগুলো ভাগ করলেন তিনি। কথা বললেন অরূপরতন চক্রবর্তীর সঙ্গে।
ট্রামলাইন:২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড কাপ খুব মন দিয়ে দেখছেন?
অভিজিৎ: লিগ স্টেজে এই ওয়ার্ল্ড কাপ আমি এখনো অব্দি খুব মন দিয়ে দেখেছি এমনটা নয় মানে আমি ব্রাজিলের খেলাটা হাফ দেখেছি ফ্রান্সের খেলাটা দেখলাম, আর একটা খেলা দেখলাম আর্জেন্টিনার। ব্রাজিল জাপানের খেলাটা দেখলাম তো আমার খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে যে দা ওয়ে জাপান প্লেড।
ট্রামলাইন: এশিয়ার দেশগুলোর খেলা কেমন লাগছে ?
অভিজিৎ: আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে না হলেও, দশ বছরের মধ্যে জাপান ওয়ার্ল্ড ফুটবলে একটা সুপার পাওয়ার হয়ে যেতে পারে এবারে বাকি এশিয়ান টিমগুলো তো খুব ভালোই পারফর্ম করেছে। ইরান শুরুর দিকে খুব ভালো খেলেছে। তবে আমি সুপার সিক্সটিন থেকে হয়তো রেগুলার খেলা দেখছি।
ট্রামলাইন: স্টারদের খেলা দেখছেন?
অভিজিৎ: এবার ওয়ার্ল্ড কাপের যে ট্রেন্ড, এখনো বুড়োদের উপর নির্ভরশীল। ওয়ার্ল্ড কাপটায়, এখনো সেই মেসি গোল করছে, এখনো সেই রোনাল্ডো গোল করছে, মানে এই যে এই যে ওল্ড ব্রিগেডের উপর নির্ভরশীল হয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ খেলছে দেশগুলো।
এখন অব্দি এমবাপ্পে একটু নতুন, তার বয়স কম। এমবাপ্পে খেলাও আমি দেখলাম, দুর্দান্ত খেলছে এবং ফ্রান্সের যে নিজেদের যে গতি এবং নিজেদের যে খেলার ধরণ, যেগুলো ১৯৮৬ সালে আমার দেখা প্ল্যাতিনির খেলার সঙ্গে মিল আছে। ১৯৮৬ সালে প্ল্যাতিনির ব্রাজিলের সাথে সেই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ আমার এখনো মনে আছে। ওই ম্যাচেই জিকো পেনাল্টি মিস করেছিল। আবার টাইব্রেকারেও পেনাল্টি মিস হয়েছিল। পুরো ৯০ মিনিট খেলেও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি মিস। সক্রেটিসও টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেছিলেন। তারপরই ব্রাজিল ছিটকে গেল। সেই সময় থেকেই আমি ফ্রান্সের ফুটবল অনুসরণ করতে শুরু করি। ফ্রান্সের খেলার একটা নিজস্ব ধারা আছে, একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন, একটা আলাদা স্টাইল। এমবাপ্পের খেলাতেও সেই একই ধারার ছাপ দেখা যায়। জিদানের যে দল বিশ্বকাপ জিতেছিল, তাদের খেলার ধরন আর তারও আগে প্লাতিনি, তিগানা—তারপর জিদান, আর এখন এমবাপ্পে—সবাই যেন একই ফুটবল-দর্শনের উত্তরসূরি। ব্যাপারটা ভীষণই ইন্টারেস্টিং।
আসলে প্রতিটা দেশেরই ফুটবল খেলার একটা নিজস্ব চরিত্র থাকে। ব্রাজিল গত দু-তিনটে বিশ্বকাপে ঠিক সেখানেই ব্যর্থ হয়েছে। তারা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা কোথাও যেন আর খুঁজে পায়নি। হারিয়ে ফেলেছিল। আমার মনে হয়, একটা সময় ব্রাজিল ইউরোপীয় ধাঁচের ফুটবল খেলতে গিয়েছিল। কিন্তু সেই চেষ্টায় তারা সফল হয়নি। কারণ ব্রাজিলের ফুটবল বরাবরই জাদুময়, অনেক বেশি শিল্পসম্মত, অনেক বেশি দর্শনীয়।
আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ‘ওয়ান-টাচ ফুটবল’-এর কথা খুব শুনতাম। একটা ছোট্ট গল্প বলি। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। তখন তো এখনও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙেনি। ব্রাজিল ম্যাচটা জিতেছিল—ঠিক মনে নেই, ৩-১, ৩-২, না ২-১।
সেই সময় আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। তাই বিশ্বকাপের খবর আমরা পড়তাম আনন্দবাজার পত্রিকায়। তখন ব্রাজিলের কোচ ছিলেন টেলে সান্তানা। জিকো, সক্রেটিস, জুনিয়র, ফালকাও—সব বড় বড় তারকা। কিন্তু শুধু বড় নাম নয়, তারা যে ফুটবল খেলছিল, সেটা ছিল একেবারে অসাধারণ, চোখ ধাঁধানো ফুটবল।
যা বলছিলাম, প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল এমন ফুটবল খেলেছিল যে দ্য গার্ডিয়ান-এর শিরোনাম হয়েছিল যা অনু বাদ করলে দাঁড়ায় -রাশিয়ায় গিয়ে ব্যালের ফুটবল খেলে ব্যালের দেশকে হারিয়ে দিল ব্রাজিল । অর্থাৎ, সেই সময় ব্রাজিলের ফুটবলের সুনামটাই ছিল এমন।
তারপর ইতালির বিরুদ্ধে ম্যাচ—সম্ভবত কোয়ার্টার ফাইনাল। ব্রাজিল দু’বার এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইতালির পাওলো রসি হ্যাটট্রিক করে ম্যাচটা ঘুরিয়ে দেন, আর ইতালি জিতে যায়।
ট্রামলাইন: বিশ্বকাপের পুরোনো খেলার স্মৃতি নিয়ে বলুন?
অভিজিৎ: এখন অনেক সুযোগ আছে; সুযোগ পেলে ১৯৮২ সালের সেই বিশ্বকাপটা আবার দেখে নিতে বলবো। সেই সময় টেলে সান্তানার ব্রাজিল ছিল এক অন্যরকম ফুটবলের প্রতীক। ১৯৮২-ই ছিল মারাদোনার প্রথম বিশ্বকাপ। যদিও আমার মনে হয়েছিল সেটা তাঁর প্রথম বড় বিশ্বমঞ্চ। ১৯৭৮-এও অবশ্য তিনি দলে থাকার আলোচনায় ছিলেন। কোচ সিজার লুই মেনোত্তি। সেবার মেনোত্তি ওকে টিমে নেয়নি। তখন ওর প্রায় ১৬ বছর বয়স। আটাত্তর সালে হিরো হয় মারিও কাম্পেস। মারিও কেম্পেস-এরসঙ্গে ছিল ড্যানিয়েল পাসারেল্লা, ক্যাপ্টেন। আটাত্তর সালে ওরা হল্যান্ডকে হারালো ফাইনালে। হল্যান্ড পর পর দুবারের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালিস্ট কিন্তু। চুয়াত্তর সালে হল্যান্ড হেরেছিল জার্মানির কাছে। বেকেনবাউয়ারের জার্মানি। জোহান ক্রায়েফ অসাধারণ ফুটবল খেলেছিলেন। টোটাল ফুটবল। কিন্তু বেকেনবাউয়ার প্রায় প্রায় একা হল্যান্ড এবং ক্রায়েফকে হারিয়ে দেন। আটাত্তরে গিয়ে আর্জেন্টিনা জিতছে এবং মানে অনেকটা ঐ নিজের মাঠে প্রায় নানান রকম ছলচাতুরি করে আর্জেন্টিনা ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছিল। তো এটা ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম ওয়ার্ল্ড কাপ জেতা। সেই ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনালেও কিন্তু খুব ভালো খেলেছিল হল্যান্ড। খুব ভালো।
ট্রামলাইন: বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ কোনবার দেখা শুরু হলো?
অভিজিৎ: ১৯৭৮-এ ইন ফ্যাক্ট আমার ওটা হচ্ছে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলের প্রথম দেখা কোন ম্যাচ। কিন্তু তখন ডাইরেক্ট দেখানো হতো না। প্রায় পনেরো দিন বাদে একটা রেকর্ড করা ভার্সন দূরদর্শন দেখিয়েছিল। আমার বাড়িতে টিভি ছিল না। আমি আমার কাকার এক বন্ধুর বাড়িতে টিভিতে দেখেছিলাম। সেটা আমাদের বাড়ি থেকে বহুদূরে। আমরা সন্ধেবেলা হেঁটে হেঁটে গিয়ে তাদের বাড়িতে বসে খেলা দেখেছিলাম। ওই প্রথম ওয়ার্ল্ড কাপ দেখে মনে হয়েছিল যে এটা কি দেখছি, মানে এতদিন ফুটবল সম্পর্কিত ধারণা বা যা কিছু দেখেছি তার আমূল বদলে যাচ্ছে। এত স্পিড কোত্থেকে আসছে। লোকগুলো এত দৌড়য়ই বা কি করে। এবং তার সাথে স্কিল। কিন্তু ৮২ তে গিয়ে কিছু ম্যাচ ডিলেড টেলিকাস্ট হতো রেগুলারলি। তখন দেখলাম যে ব্রাজিল যে ফুটবলটা খেলছে, সেটা একটা স্বর্গীয় ব্যাপার। এই ব্যাপারে একটা জিনিস বলি, ওয়ার্ল্ড ফুটবল বাঙালির কাছে প্রেজেন্ট কিন্তু প্রথমেই দূরদর্শনের মাধ্যমে হয়নি। প্রথম যিনি করেন তার নাম অমল দত্ত। তিনি কাঁধে ফিল্মের ক্যান নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। এবং ঐ পাড়ায় পাড়ায় পর্দা টাঙিয়ে বড় সাদা পর্দা টাঙিয়ে ওখানে সিক্সটিন মিমি ফিল্মে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল দেখাতেন। এই ভাবে আমি দুবার পেলের খেলা দেখেছি। জাগালোর খেলা দেখেছি। ভাবা, ডিডি এদের খেলা দেখেছি। বেকেনবাউয়ারের খেলা দেখেছি। আসলে, অমল দত্ত ছিলেন, যাকে বলে ফুটবলের একজন মিশনারি। ওঁর কাজ ছিল ফুটবলটা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তো সে যাই হোক, ১৯৮২ সালের ব্রাজিল যে ফুটবল খেলেছে সে ফুটবলটা আমার মনে হয় আজ অব্দি কোন দল খেলতে পারেনি। সেই একই একই ঘরানার, একই স্টাইলের একটা খেলা ওরা ৮৬-তেও খেলেছে। কিন্তু ৮৬-তে প্রত্যেকেরই বয়স কিঞ্চিত বেড়ে গেছিল। যেমন ধরুন সক্রেটিজ, জিকো, ফালকাও অনেকেই অনেকটা স্লথ হয়ে গেছিল। স্লথ মানে ওদের তুলনায় স্লথ।
ট্রামলাইন: ১৯৮৬ মানেতো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ …
অভিজিৎ: ১৯৮৬-এর ওয়ার্ল্ড কাপ তো একজন মানুষের ওয়ার্ল্ড কাপ। তার নাম দিয়েগো মারাদোনা। যা খুশি তাই করলো। ৮২ সালে কিন্তু মারাদোনা একটা ম্যাচ খেলে। যতদূর মনে পড়ছে সেটা ব্রাজিলের বিরুদ্ধে। এবং ব্রাজিলের একজন মিডফিল্ডার বাতিস্তাকে ওর মার্কার করে রেখে দিয়েছিল। ও নড়তে পারছিল না। মারাদোনা পেটে একটা লাথি মারে বাতিস্তাকে। তখন ওকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বার করে দিল। তারপর বোধহয় আর্জেন্টিনা ওয়েন্ট আউট অফ দা টুর্নামেন্ট। কিন্তু ৮৬ হচ্ছে মারাদোনার।
আরেকটা টিম কিন্তু ৮৬ সালে দুর্দান্ত খেলছিল। সেটা হচ্ছে ডেনমার্ক। আপনার মনে আছে কি না জানি না। উই আর রেড, উই আর হোয়াইট, উই আর ডেনিশ ডায়নামাইট। লাউড্রপ কি দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছিল এত ভালো ফুটবল খেলল অল থ্রু। তারপর একটা কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে চুপ করে গেল। কার এগেন্স্টে করলো আজ আর আমার মনে নেই। কিন্তু তারপর তো ম্যারাদোনার হ্যান্ডস অফ গড গোলের পাশাপাশি পাঁচ জনকে কাটিয়ে গোল। ফুটবল মাঠে যা যা সম্ভব ১৯৮৬তে ওয়ার্ল্ড কাপে ম্যারাডোনা তাই তাই করেছে। তারপর একটা জার্মানির উত্থান হলো তারপর ইতালি আবার একটা ওয়ার্ল্ড কাপ জিতলো। ব্রাজিল জিতছে আবার ১৯৯৪ সালে রোমারিও বেবেতোদের টিমটা আমার খুব একটা পছন্দের ছিল না। মানে খুব অ্যাভারেজ ফুটবল খেলে ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে এবং খুব বড় প্লেয়ারও কেউ ছিল এমনটা নয়। ১৯৯৮-এ জিদানের ফ্রান্স জিতছে। ২০০২-এ ব্রাজিল যখন আবার জিতছে তখন ব্রাজিলে রোনাল্ডো এসে গেছে রোনান্ডিনহো এসে গেছে রিভাল্ডো এসে গেছে আপনার রাইট ব্যাক রবার্তো কার্লোস এসে গেছে, কাফু এসে গেছে। এই টিমটা এই হচ্ছে ব্রাজিলের,যেটাকে বলে শেষ পিক, এটাই হচ্ছে শেষ পিক। তারপর ব্রাজিল ফুটবল খেলেছে কিন্তু, সেরকম ইন্টারেস্টিং কিছু খেলেছে এরকমটা নয়। কিন্তু এবার আমি দেখলাম এই ভিনিসিয়াস ছেলেটার এর মধ্যে সম্ভাবনা আছে। কিন্তু একটা ছেলে দিয়ে কিন্তু হবে না। ক্যাসিয়াস বলে প্লেয়ারটা ভালো। যে গোল করলো সেদিনকে। ও অনেকটা আমাদের ওই এর আগে একটা প্লেয়ার, লিওনার্দো বা ডুঙ্গার স্টাইলে খেলছে
ট্রামলাইন: কে জিতবে বলে মনে হচ্ছে?
অভিজিৎ: আমার কিন্তু মনে হচ্ছে ফ্রান্সই জিতবে। ফ্রান্সেরই জেতা উচিত। যদিও আর্জেন্টিনার একটা খারাপ জিনিস আছে, সেটা হচ্ছে আর্জেন্টিনা ইজ হাইলি ফেভারড বাই ফিফা ফর এনি রিসন। বাংলায় একটা রসিকতা আছে, কমিটির টিম। জার্মানি আউট হয়ে গেল। ইতালি ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ খেলছে না। এটা ভাবা যায়, ইতালি কিন্তু একটা ঘরানা। ইতালি মানে আমাদের দোনাদনি, বারেসি। ফ্রাঙ্কো বারেসির মত এত ভালো মিডফিল্ডার দুনিয়া দেখিনি। আমি এসি মিলানের ওর খেলার রেকর্ডিং দেখেছি। বারেসি একটা ডিভাইন ব্যাপার, একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার। ইতালি ইনফ্যাক্ট একটা সময় পর পর অনেক অনেক ভালো মিডফিল্ডার তৈরি করেছে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার অনেক তৈরি করেছে। যেটা বলছিলাম, একটা দেশের এত ভালো ফুটবল ঘরানা, তারা বিশ্বকাপ ফুটবলে কোয়ালিফাই করতে পারে না এটা খুব দুঃখজনক আবার একটা দু লাখ না আড়াই লাখ লক্ষের দেশও ফুটবল খেলে দিচ্ছে এটাও ইন্টারেস্টিং না আড়াই লাখ না তিন লাখ লোকের একটা দেশ পাঁচ লাখ লোকের একটা দেশ তারা ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ খেলছে এটাও একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। এশিয়ার ফুটবল উন্নতি হচ্ছে এটা ভালো দিক। কিন্তু এবার রোনাল্ডো আর মেসির যে বুড়ো নির্ভর ওয়ার্ল্ড কাপ, নতুন নতুন স্টার, নতুন হিরো, যারা এক একটা খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে, একটা খেলা জিতিয়ে দিতে পারে, সেটা এখনো অব্দি কিন্তু আমি দেখিনি। এমবাপ্পেও কিন্তু তার তৃতীয় ওয়ার্ল্ড কাপ খেলেছে, এই ওয়ার্ল্ড কাপে ওর পিকে পৌঁছে গেছে। এখনই আসল খেলাগুলো এই এই এইবার শুরু হবে এইবার শুরু হবে। এই বিশ্বকাপে যদিও জার্মানি বেরিয়ে গিয়ে অনেকটা ওজন হারিয়ে ফেলল। কিন্তু এইবার আসল খেলা শুরু হলো। এটার জন্যই তো আমরা অপেক্ষা করে থাকি। কিন্তু আমেরিকায় এই মাঝরাত্রিতে জেগে থেকে খেলা দেখা আমাদের বাঙালিদের পক্ষে, ভারতীয়দের পক্ষে বেশ কষ্টকর। আমার বিশ্বাস আমরা সবাই নিশ্চিত ভাবে দেখব।
ট্রামলাইন: আপনি অমল দত্তর কথা উল্লেখ করেছেন, সেই নিয়ে যদি আর কিছু বলেন …
অভিজিৎ: হি ওয়াজ এ মিশনারি অফ মর্ডান ফুটবল। ভারতীয় ফুটবলের তিনি প্রথম প্রফেশনাল কোচ। তিনি হোল টাইমার। পিকে ব্যানার্জির মত চাকরি করে এসে দুপুরবেলা পান চিবোতে চিবোতে ময়দানে কোচিং করেননি। অরুণ ঘোষ বিএনআরে চাকরি করতেন। চুনি গোস্বামী স্টেট ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। অমল দত্ত কিন্তু ফুল টাইমার। এক অর্থে ফুটবলের প্রতি নিবেদিত প্রাণ যদি বলা হয় অমল দত্তের কথা বলতে হবে। অমল দত্তের কথা ভুলে গেছি আমরা। অমল দত্ত শুধু খেলা শেখাননি। অমল দত্ত প্লেয়ার তৈরি করেছেন। বড় টিমকে জিতিয়েছেন। ছোট টিমকে বড় টিমের এগেন্স্টে চাগিয়ে দিয়ে জিতিয়েছেন। এবং সাধারণ মানুষকে যে ফুটবল সম্পর্কে ধারণা, ফুটবল বোধ, সেটার জন্য একটা এটেম্পট নিয়েছেন যাতে মানুষের ফুটবল সম্পর্কে একটা ধারণা হয়। আমার মনে হয় ওয়ার্ল্ড কাপের সময় অমল দত্তকে নিয়ে কিছু কথা আমরা যদি একটু বলি, সেটা খুব কাজের কাজ হয়। এই লোকটা ডিজার্ভ করে অনেক কিছু।
আরেকটা ঘটনা না বললেই নয়। ১৯৮৪ সালে নেহেরু কাপ ফুটবলে কলকাতা শহরে এসেছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৮৬ সালে ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনার সেই ফাস্ট ইলেভেনের প্রায় ১০ জন প্লেয়ারকে নিয়ে কলকাতা শহরে খেলতে এসেছিল দলটা। তার মধ্যে অন্যতম ছিল মিডফিল্ডে বুরুচাগা এবং গোলকিপার নেরি পম্পিদু। গারেকা বলে একজন এসেছিল যাকে সেই সময় বলা হতো মারাদোনার পর দা বেস্ট এভার ফুটবলার বর্ন ইন আর্জেন্টিনা। গারেকা প্রচুর গোল করে। আমি ভারত এবং আর্জেন্টিনার সেই ম্যাচ ইডেন গার্ডেনসে দেখি। আমি বুরুচাগার কর্নার কিক দেখেছি। প্রায় ৭৮ মিনিট ভারত আর্জেন্টিনাকে আটকে রেখেছিল ভারত, খেলা গোল শূন্য ছিল। ৭৮ মিনিটের মাথায় বুরুচাগার কর্নার থেকে অথবা বুরুচাগার একটা ফ্রি কিক থেকে ব্যানানা কিক করে গোল হয়। ভারতের গোলকিপার ছিলেন অতনু। কিন্তু বুরুচাগার ব্যানানা সোয়ার্ভিং কিকের কাছে তিনি পরাস্ত হন। এটা আমরা একটা ওয়ার্ল্ড ক্লাস ফুটবল দেখেছি কলকাতার মাঠে বসেই। এবং সেই দলের কোচ ছিল বিলারডো, যিনি ১৯৮৬ সালেও আর্জেন্টিনার ওয়ার্ল্ড কাপ উইনিং দলের কোচ ছিলেন।