সৌম্যা ঘোষ



বাঙালি বরাবরই নতুন কিছু করতে চেয়েছে। তা সিনেমা-সাহিত্যই হোক বা গান বা নাচ!
বাঙালির নাচ বলতেই মনে পড়ে কিংবদন্তি উদয়শঙ্করের কথা। বিশ্বের দরবারে বাঙালির নাচও যে আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে, তা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। ধ্রুপদী নাচের পাশে তাঁর সৃজনশীল নৃত্যধারা দেখিয়েছিল, শরীর দিয়েও সুরকে রূপ দেওয়া যায় অন্যভাবে।
কিন্তু, কোথায় হারিয়ে গেলেন উদয়শঙ্কর আর তাঁর উদ্ভাবিত নতুন ধারার নাচ!
আজ বাঙালির নাচ নেই। যদিও সান্ধ্য রিয়েলিটি শো বা ফেসবুকিও রিলস্-এ রোজই নাচছে বাঙালি।
শুধু তাই নয়, বাঙালির আবহমান ভাসান বা আধুনিক ডিসকোথেক’এও নাচছে তারা। কিন্তু, যথেচ্ছ কোমর দোলানো আর ফূর্তি করাকেই তো নাচ বলে না! কারণ, বাঙালির একটা উদয়শঙ্কর ছিল!
এ বিষয়ে ট্রামলাইন কথা বলেছিল নৃত্যশিল্পী অদিতি সিনহা মিত্রের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘকাল নাচ শিখেছেন তাঁর গুরু অমলা শঙ্করের কাছে।
জানালেন, ভারতে আধুনিক নৃত্যকলা সেভাবে ছিল না।
উদয়শঙ্করকে ভাবিয়ে ছিল এই শূন্যতা। সেটা ১৯২০-৩০ এর দশক। উদয়শঙ্কর জন্ম দিল তাঁর স্বতন্ত্র ঘরানার নাচ।
প্রথম জীবনে চিত্রশিল্পী হিসেবে বিদেশযাত্রার সুযোগ আসে তাঁর কাছে। ব্যায়বহুল বিদেশযাত্রার খরচ ওঠাতেই ক্লাব বা পানশালাতেও নাচতে হত তাঁকে। প্রথমদিকে তিনি ‘উদয়শঙ্কর স্টাইল’ বলতেন না, বলতেন ‘হাই আর্ট’। সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণীর কাছে এই শৈলী উপস্থাপন করতেন। তাই, তাঁর বিশেষ আঙ্গিককে ‘হাই আর্টে’র মর্যাদা দিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে বিদেশেও জনপ্রিয় হতে থাকে তাঁর ডান্সট্রুপ। ছোট ভাই রবিশঙ্করও জুড়ে ছিলেন সেই দলে। এভাবেই ক্রমে জনপ্রিয় হয় উদয়শঙ্কর ঘরানার নিজস্ব স্টাইল।

ভারতে নাচকে বিশেষ সম্মানের সঙ্গে দেখা হত না। যদিও রাজ দরবার বা মন্দিরে নানা নাচের প্রচলন ছিল।
উদয়শঙ্করের হাত ধরেই ভারতীয় নাচের ইতিহাস ও সমকাল পেল সম্মান ও সমাদর।
যদিও অদিতি আরও জানালেন, ‘উদয়শঙ্কর স্টাইল’ বলতে আজ যা চলছে তাতে অনেক ভেজাল আছে।
কোনও শব্দ বা কথা না, বরং আদ্যন্ত সুরকে মাধ্যম করেই গড়ে ওঠে উদয়শঙ্কর নৃত্য ঘরানা।
এবং তাতে অজান্তেই মিশে যায় ভারতনাট্যম, কথাকলি, মণিপুরীর ধারা। এটাই এর স্বাতন্ত্র্য।
শুধু নাচই না, উদয়শঙ্কর নির্মাণ করেছিলেন ‘কল্পনা’র মতো অভিনব চলচ্চিত্রও। রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’তে যেমন যন্ত্র এবং মানুষের সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করছেন, ‘কল্পনা’র এক অংশেও এসেছে একই চিন্তা।


অবশ্য, শান্তিনিকেতনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের সঙ্গে মণিপুরী ঘরানার নাচের প্রচলন করেছিলেন। আর, এভাবেই নাচের ‘ক্লাসিকিয়ানা’ ভেঙেছিলেন তিনি।
আরও পরবর্তীতে, আমাদের নাচকে আরও আধুনিক করে তোলেন মঞ্জুশ্রী চাকি এবং রঞ্জাবতী সরকার।
রঞ্জাবতী সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ভারতীয় নাচকে নিয়ে গেলেন অন্যতর মর্যাদায়।
মায়ের ‘নবনৃত্য’ ধারাকে লালন করেই তিনি তাঁর ‘ড্যান্সারস্ গিল্ড’ দল তৈরি করেন।
রঞ্জাবতীর বিশেষত্ব এই বাঙালি তথা ভারতীয় ‘ইন্টেলিজেন্সিয়া’তে তাঁর নাচকে চর্চার বিষয় করে তোলা।
সে কাজ সহজ ছিল না। কিন্তু, সুন্দরী রঞ্জাবতীর ছিল এক সুন্দর আধুনিক মনও। সেই মনই বদলে দিয়েছিল আধুনিক নাচের ছন্দ।

বাঙালির নাচ কি আবার পুরোনো মর্যাদায় ফিরবে?
রিলস্ আর টিকটকের বাজারে এ উত্তর অনিশ্চিত।
তবে, হাজার বছরের বাঙালি জাতি’র সৃজনশীলতা সাময়িকভাবে থমকালেও কখনও পুরোপুরি থেমে যায়নি।
তাই, আজকের র্যাপ বা কে.পপে নাচা বাঙালি যে আবার তার নাচের শিকড়ের খোঁজ নেবে না,
তা কে বলতে পারে…!
হয়তো, আগামী প্রজন্ম আবারও পাবে একটা উদয়শঙ্কর বা রঞ্জাবতীদের…
আশায় তো বুক বাঁধবেই চাষা…