বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ছবির চরিত্ররা প্রায়শই হাঁটে কোনও অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। কেউ খুঁজে ফেরে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, কেউ অতীতের স্মৃতি, কেউ বা এমন এক জীবনের সন্ধান করে যা হয়তো কখনও ছিলই না। এই অন্বেষণই তাঁর সিনেমার মূল সুর। রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে ব্যক্তিগত স্মৃতি, গ্রামীণ বাংলার ধুলোবালি থেকে শহুরে একাকীত্ব, সবকিছুকেই তিনি রূপ দিয়েছেন এক স্বতন্ত্র কাব্যিক চলচ্চিত্রভাষায়। তাঁর ছবিগুলি দেখলে মনে হয়, ইতিহাসের চেয়ে মানুষের স্বপ্নই যেন শেষ পর্যন্ত বেশি স্থায়ী।
সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে একবিংশ শতাব্দীর নাগরিক বিচ্ছিন্নতার দীর্ঘ পথজুড়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর চলচ্চিত্রজগৎ বিস্তৃত। তাঁর সৃষ্টির পরিসর ক্রমাগত বদলেছে, প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও অটুট থেকেছে মানুষের প্রতি তাঁর গভীর কৌতূহল এবং কবির দৃষ্টি। তাঁর চলচ্চিত্রভুবনকে অনুসরণ করলে পশ্চিমবঙ্গের কয়েক দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রেখাচিত্র ধরা পড়ে।

অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সত্তরের দশকের অস্থির রাজনৈতিক সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসেন। তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রাকে মোটামুটি তিনটি স্বতন্ত্র পর্বে ভাগ করা যায়। তাঁর প্রথম দিকের ছবিগুলি – দূরত্ব, নিম অন্নপূর্ণা, গৃহযুদ্ধ এবং হিন্দি ছবি আঁধি গলি’ ছিল স্পষ্টতই রাজনৈতিক। নকশাল আন্দোলনের ব্যর্থতা, মধ্যবিত্তের হতাশা, বেকারত্ব, ভেঙে পড়া আদর্শবাদ এবং শহুরে অস্তিত্বসংকট এই ছবিগুলির কেন্দ্রে ছিল। এখানে বুদ্ধদেব ছিলেন অনেকটাই আশাবাদী, তাঁর ক্যামেরায় ছিল কলকাতা ও তার আশপাশের সমাজ-বাস্তবতার পর্যবেক্ষণ। ‘দূরত্ব’, ‘নিম অন্নপূর্ণা’ বা ‘গৃহযুদ্ধ’র মতো ছবিতে সমকালীন নগরজীবনের সংকট, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং মধ্যবিত্ত অস্তিত্বের ভাঙন অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ধরা পড়েছে।

দ্বিতীয় পর্বে, অর্থাৎ আশির দশকের শেষভাগে এসে সেই দৃষ্টি আরও অন্তরঙ্গ, আরও লোকায়ত হয়ে ওঠে। ফেরা কিংবা বাঘ বাহাদুর-এর মতো ছবিতে তিনি ফিরে তাকান প্রান্তিক মানুষের জীবন, লোককথা এবং বিলীয়মান সংস্কৃতির দিকে। ‘বাঘ বাহাদুর’-এ লোকশিল্পীর বিলুপ্তির আশঙ্কা, ‘তাহাদের কথা’-য় স্বাধীনতা সংগ্রামী শিবনাথের বিচ্ছিন্নতা, ‘উত্তরা’য় পুরুলিয়ার পটভূমিতে কুস্তিগিরদের বন্ধুত্ব, কিংবা ‘চরাচর’-এ পাখি ধরার মানুষের জীবন, সবই রাজনৈতিক ভাষ্য না হয়েও বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের গল্পের মধ্যে রাজনীতির বিবর্তনকে তুলে ধরে। এই সময় থেকেই তাঁর সিনেমায় গ্রামীণ বাংলার উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পুরুলিয়ার অনাবিল প্রকৃতি, ধুলোমাখা রাস্তা, লোকসংস্কৃতিল, বাউল, যাত্রা, সার্কাস কিংবা প্রান্তিক মানুষের জীবন তাঁর ছবির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। কিন্ত তাঁর গ্রাম স্বপ্নময় হয়েও বাস্তব, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি আছে হিংসা, নিঃসঙ্গতা এবং ইতিহাসের ক্ষত। এখানে বাস্তব আর কল্পনা একে অপরের গায়ে মিশে যায়। বাঘের মুখোশ পরা মানুষটির সেই স্মরণীয় অবয়ব যেন কেবল একটি চরিত্র নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় এক জগতের শেষ প্রতিধ্বনি, যেখানে লোকস্মৃতি, স্বপ্ন এবং অস্তিত্বের বেদনা একই ফ্রেমে এসে দাঁড়ায়।

তৃতীয় পর্বে নব্বইয়ের দশকের শেষ এবং নতুন শতাব্দীতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ছবিতে আরও এক পরিবর্তন দেখা যায়। রাজনৈতিক ইতিহাস বা গ্রামীণ সমাজের প্রশ্নগুলির পাশাপাশি তিনি ক্রমশ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্মৃতি, মানসিক বিচ্ছিন্নতা এবং নাগরিক অস্তিত্বের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। ‘লাল দরজা’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, ‘স্বপ্নের দিন’, ‘কালপুরুষ’, এবং ‘জানালা’য় সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। ‘স্বপ্নের দিন’-এ আমরা দেখি এক সরকারি কর্মচারীকে যে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে তথ্যচিত্র দেখায়, কিন্তু তার জীবন আসলে তাড়িত হয় এক অসম্ভব স্বপ্নে। ছবিটি যেমন যাত্রার গল্প, তেমনই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার গল্প। ‘কালপুরুষ’-এ পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, স্মৃতি, অনুশোচনা এবং সময়ের প্রবাহকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবি অনেকটাই নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্লোক অনুসন্ধান করে। এখানে রাজনৈতিক ইতিহাসের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত ইতিহাস।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি বিকল্প ইতিহাস যেন তাঁর ছবিগুলির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। সত্তরের বিপ্লবী হতাশা থেকে শুরু করে গ্রামীণ সমাজের রূপান্তর, বিশ্বায়নের অভিঘাত এবং নাগরিক একাকীত্ব, সবই ফিরে ফিরে আসে তাঁর ছবিতে। সত্তরের উত্তাল দশক যেই শ্রেণীসংগ্রামের যেই আশ্বাস দিয়েছিল প্রান্তিক মানুষকে, পরে আশির দশকের বিশ্বায়ন এবং সরকারের গাফিলতি সেই প্রান্তিক মানুষকে বঞ্চিত করে। সেই বঞ্চনার প্রতিফলন আশির দশকের সিনেমা, নাটক এবং সাহিত্যে প্রকট হয়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ছবির মধ্যেও সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষের আদর্শ, হারিয়ে যাওয়া গ্রাম, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং স্বপ্ন, বারবার ফিরে আসে। সেই ফিরে আসার মধ্যে থাকে এক গভীর অনুসন্ধান।
চলচ্চিত্রকার এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর একসময়ের সহকর্মী সোহিনী দাসগুপ্ত ট্রামলাইন কে জানালেন, এই বিবর্তনের মধ্যেও তাঁর ছবি থেকে রাজনৈতিক সচেতনতা কখনই হারিয়ে যায়নি। এমনকি তাঁর সবচেয়ে ‘সাররিয়েল’ বা জাদুকরী ছবি ‘উড়োজাহাজ’ও আসলে ভীষণভাবে একটি রাজনৈতিক ছবি, যেখানে অবাস্তব বা স্বপ্নের আবহেও যুদ্ধ, ভায়োলেন্স আর বাস্তব জীবনের সংকটের কথা উঠে আসে। সোহিনী আরও জানালেন, বুদ্ধবাবুর কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল যে তিনি নিজের পুরোনো কাজকে সবসময় অতিক্রম করার চেষ্টা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৃত শিল্পীকে সবসময় তাঁর কাজের ৩০-৪০ বছর পরের প্রাসঙ্গিকতার কথা মাথায় রেখে কাজ করা উচিত।

চলচ্চিত্রকার প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য জানালেন, তাঁর কাছে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো তাঁর সময়ের নিয়ন্ত্রণ। বুদ্ধদেববাবু যেভাবে ফ্রেমের ভেতর সময়কে ধরে রাখতেন এবং যেভাবে ছবির সময়কে প্রয়োজনমতো সংকুচিত বা প্রসারণ করতেন, সেটাই ছিল তাঁর শৈলীর সাক্ষর। একটি শট উনি কোথা থেকে শুরু করছেন এবং কোথায় গিয়ে শেষ করছেন, তার পেছনে কাজ করত এক অদ্ভুত কাব্যিক ছন্দ। মৃণাল সেনের ‘জেনেসিস’ ছবির উদাহরণ প্রদীপ্তবাবুর কথায়, “যে দেখাটা আমি দেখি বা উনি যেটা দেখেছেন, তার মধ্যে পার্থক্য আছে। কারণ ওই চরিত্রগুলো বা পরিবেশটা আমার খুব চেনা, আমি ওখান থেকেই উঠে এসেছি। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে পরিচালকের নিজস্ব কল্পনার একটা দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।” তবে তিনি আরও জানালেন, তরুণ বয়সে ভিন্ন মতাদর্শকে সহজেই সমালোচনা করা যায়, কিন্তু বয়স ও অভিজ্ঞতার সাথে মানুষ বুঝতে শেখে যে, জগতে সবচেয়ে জরুরি হলো এই দৃষ্টিকোণের পার্থক্যকে সম্মান জানানো। প্রদীপ্তবাবুর কাছে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নগরজীবন থেকে দূরে চলে যাওয়া। তাঁর ক্যামেরা বারবার ছুটে গেছে পুরুলিয়া বা প্রত্যন্ত মফস্বলের রুক্ষ, উদাসীন প্রকৃতির বুকে। বুদ্ধদেববাবু এই চেনা লোকজীবন আর চরিত্রগুলোকে অন্যরকমভাবে ফ্রেমে ধরেছেন, রাজনৈতিক প্রান্তিকতার পরিচিতি পেরিয়ে তাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতাকে নিজস্ব ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ছবির চরিত্রদের মতোই বুদ্ধদেব নিজেও যেন সারাজীবন এক অন্তহীন যাত্রার পথিক ছিলেন। রাজনীতির উত্তাল সময় থেকে ব্যক্তিগত স্মৃতির নির্জন ভূগোল, গ্রামের ধুলোবালি থেকে শহরের একাকী জানালা, এই সব নিয়েই তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর নিজস্ব এক চলচ্চিত্রভাষা। তাঁর সিনেমা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু পর্দা অন্ধকার হয়ে আসার পরও কোথাও যেন রয়ে যায় একটি ট্রেনের দূরাগত শব্দ, একটি উড়ে যাওয়া পাখির ছায়া, অথবা কোনও অজানা পথে হেঁটে চলা এক স্বপ্নদর্শী মানুষের অবয়ব।
