লিখেছেন: সৌম্যা ঘোষ

ব্যবসার ইতিহাসে বাঙালিরা বরাবরই সম্ভাবনাময়। তবে, আজও বাঙালিদের ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক চাপানোতরে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাগুলিও আশ্বাস দিতে আজ ব্যর্থ।
কিন্তু, বাঙালিরা হার মানেনি। কারোর মুখাপেক্ষী হয়ে নয়, নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই লড়াই করে তৈরি করে নিচ্ছে। এসেছে সমাজমাধ্যম— ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপ… সময়ের প্রয়োজনে ব্যবসার ধরণ শুধু বদলেছে। অনলাইন বুটিকও এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে বাঙালিদের ব্যবসার জগতে।
বাঙালি উদ্যোগপতি বিশ্বজিৎ দাস জানালেন, একজন উদ্যোগপতি হিসেবে স্বপ্ন দেখাটা জরুরি। বাঙালি স্বপ্ন দেখতো বলেই উনিশ শতক ঘটেছিল। বাঙালি হিসাবে আমরা রবীন্দ্রনাথের জন্য গর্ব করি। কিন্তু, তাঁর বাবা বা দাদু যে সবল উদ্যোগপতি ছিলেন, তা মনে রাখি না। বাঙালি সাধারণত চাকরি করতে ভালোবাসে। কিন্তু, আমার কখনোই সেদিকে খুব টান ছিল না। তাই অল্প বয়স থেকেই নিজের সংস্থা গড়তে চেয়েছি। সেভাবেই আজ বহু বছর হলো অনেক সহকর্মীদের নিয়ে নিজের বন্দর সম্পর্কিত ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে চলেছি। সম্প্রতি বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রতি সম্মান রেখে আমরা ট্রামলাইন পোর্টাল ও পডকাস্ট চ্যানেলটিকেও সহযোগীতা করছি।
বাঙালির ব্যবসা সম্পর্কে তিনি আরও বললেন, চিরকাল বাঙালিদের মধ্যে সম্ভাবনা থাকলেও, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাঙালির ব্যবসার প্রতি অনিহা থেকেই যায়। তার অন্যতম কারণ, পারিবারিক ব্যবসা থাকার সুবাদে অবাঙ্গালিদের কাছে লোন পাওয়া যতটা সহজ, বাঙালিদের কাছে ততটা নয়।
বোরোলিন
শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বাঙালির কাছে বোরোলিনই একমাত্র ভরসা। অনেক নামি-দামি বিদেশি কোম্পানিও কিন্তু বোরোলিনের জায়গা দখল করতে পারেনি। প্রত্যেক বাঙালি-ঘরে নিঃসন্দেহে মিলবে ওই সবুজ রঙের একটা টিউব।
এমনকি, কোনোরকম শ্রেণীর তোয়াক্কা না করে, গোটা বিশ্বের কম-বেশি প্রত্যেকেই বোরোলিনের প্রতি আস্থাবান।
সংগ্রামী ও শিল্পপতি গৌরমোহন দত্ত তাঁর ‘স্বদেশী’ ভাবনা থেকেই তৈরি করেছিলেন অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ‘বোরোলিন’। হাতির ছবিওয়ালা সবুজ রঙের এই টিউব খুব সহজেই সাধারণ মানুষের মন কেড়ে নেয়।
বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও বোরোলিন বাংলা ও ভারতীয় সংস্কৃতির নিজস্ব জায়গা করে নেয়। প্রথমদিকে সংবাদপত্র, দেওয়াল লিখন ও রেডিওয় প্রচার; পরে, টেলিভিশনে ঋতুপর্ণ ঘোষের সেই বিখ্যাত ট্যাগ মার্ক ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’। বর্তমানে বিদ্যা বালনের মতো জনপ্রিয় অভিনেত্রী এই বোরোলিনের বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব নিয়েছেন।দুর্গাপুজো, শীতকাল বা পরিবারের যত্ন… বাঙালির নস্টালজিয়া ও পারিবারিক আবেগ এই ‘বোরোলিন’।

‘শালিমার কোকোনাট অয়েল’
যে-কোনো বাঙালির ঘরে একটু খুঁজলে ঠিকই পাওয়া যাবে নারকেল তেলের একটা সবুজ রঙের টিনের কৌটো— ‘শালিমার কোকোনাট অয়েল’। ‘বিশ্বাসযোগ্য ঘরোয়া তেল’ শালিমারের দুটি বিষয় ছিল বিজ্ঞাপনের প্রধান মাধ্যম— ‘চুলের পুষ্টি’ এবং ‘বিশুদ্ধ নারকেল তেল’।
এই তেলের সঙ্গেও জড়িত এক বাঙালির নাম— প্রকৃতিনাথ ভট্টাচার্য। ৪২-এর পরে তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন পঞ্চানন মণ্ডল। ৪৫-এ কলকাতা ও হাওড়া— গঙ্গার দুই পারে ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েই তাঁরা শালিমারের কারখানা ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। প্রথমদিকে শালিমার মূলত নারকেল তেল, ভোজ্য তেল এবং গৃহস্থালির ব্যবহারের কিছু পণ্য তৈরি করত। পরবর্তীকালে মশলা, সর্ষের তেল, জ্যাসমিন হেয়ার অয়েলসহ বিভিন্ন FMCG পণ্যের বাজারেও প্রবেশ করে। তবে শালিমারের পরিচয়ের কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ছিল তাদের নারকেল তেলই।
বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও শালিমার তার নিজস্ব এক সংস্কৃতির ধারা তৈরি করে। সত্তর-আশির দশকে বাংলা ম্যাগাজিন ও সিনেমা হলের স্লাইডে শালিমারের বিজ্ঞাপন দারুণ জায়গা করেছিল! শহরের দোকানের টিন বোর্ড, ক্যালেন্ডার এবং আয়নার গায়ে শালিমারের লোগো দেখা যেত, যা ব্র্যান্ডকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলে।
এমনকি, বাঙালির দুর্গাপুজোয় শালিমারের সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপন ‘আনন্দ- উৎসবে বাংলার ঘরে-ঘরে, শালিমার’— যেন দুর্গাপুজোরই নিজস্ব থিম সং! প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য থেকে শুরু করে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়, লোপামুদ্রা, রূপম ইসলাম, চন্দ্রবিন্দু… কে না গলা মিলিয়েছেন সেই গানের সুরে!

সেন মহাশয়
বাঙালির রসবোধ বরাবরই উচ্চমার্গের! সে কথায় হোক কিংবা মিষ্টিতে!
মিষ্টির প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকেই ১৮৯৭ সালে অশুতোষ সেন উত্তর কলকাতার ফড়িয়াপুকুরে ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে জনপ্রিয় হলে ‘সেন মহাশয়’ নামেই মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
‘আবার খাবো’, ‘রতাবি সন্দেশ’, ‘মনোহরা’, ‘মালাই চপ’, ‘পিঙ্ক পেরা’ বা ‘মনমাতানো’— এই নামগুলো শুধু মিষ্টি নয়, হয়ে ওঠে সেন মহাশয়ের নিজস্ব ব্র্যান্ড।
বিশেষ উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন মিষ্টি তৈরি করাও ছিল তাদের প্রচারের অংশ। স্বাধীনতা দিবসে ‘জয় হিন্দ সন্দেশ’ বাজারে আনা হয়, যা দেশাত্মবোধের সঙ্গে ব্র্যান্ডকে যুক্ত করেছিল।
প্রথমদিকে দোকানটি মূলত উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবার এবং সাহিত্যজগতের আড্ডাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকরাও সেখানে যেতেন। এই সাংস্কৃতিক যোগাযোগই দোকানের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করে।
এমনকি, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সেন মহাশয়’ সম্পর্কে বলেছিলেন— বাংলাদেশে এখনো সেন রাজত্বের শেষ হয়নি দেখছি। সেন রাজারা চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু আর এক সেন রাজত্ব শাসন করে চলেছেন এখনও।

বুড়ি মা’র চকোলেট বোম
কালী পুজো আর বুড়ি মা’র চকোলেট বোম— বাঙালিদের আবেগ! বুড়ি মা’র আসল নাম অন্নপূর্ণা দাস। দেশভাগের সময় তাঁর সন্তানদের নিয়ে এপার বাংলায় চলে এসেছিলেন। রাস্তায় বসে সবজি বিক্রি করা, বিড়ি বাঁধার কাজ থেকে বিড়ির ব্যবসাও তিনি করেছিলেন। এমনকি, আলতা, সিঁদুর, রং, বাজির মতো বিভিন্ন ব্যবসাও শুরু করেছিলেন তিনি। বাজি তৈরি শিখেছিলেন বাঁকড়ার এক ব্যবসায়ী আকবর আলীর থেকে। পরে, নিজেই উদ্যোগ নিয়ে কারিগরদের এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। সবাই তাঁকে, ‘বুড়ি মা’ বলে সম্বোধন করতেন। তাই নিজের নামেই তৈরি করেছিলেন নিজের ব্র্যান্ড ‘বুড়ীমার চকলেট বোম’।

‘বাপুজী কেক’
হলুদ, লাল বা কমলা রঙের তৈলাক্ত প্রকৃতির মোমের কাগজের ওপর বড় অক্ষরে লেখা ‘বাপুজী কেক’ বাংলার বেকারী! মাত্র আটটাকায় কেক! নামী-দামী কোনো বিদেশী ব্র্যান্ড নয়। কিন্তু, ভ্যানিলার হালকা গন্ধ, মোরব্বা, টুটি-ফ্রুটি, কিশমিশ আর চিনে বাদামের বাঙালিয়ানাায়, চেনা সুগন্ধের আমাদের চিরপরিচিত বাপুজী কেক। বেশ আর্দ্র তবে শক্ত নয়।
স্কুল স্পোর্টস হোক বা প্রচন্ড খিদে— পথচলতি রাস্তায় অনায়াসেই পাওয়া সম্ভব এই কেককে।
১৯৭৩ সালে শিল্পপতি অলোকেশ জানা পল্লবপুকুর এলাকায় ‘নিউ হাওড়া বেকারি (বাপুজি) প্রাইভেট লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে মাত্র ৬০ পয়সা মূল্যের একটি চৌকো ভ্যানিলা ফ্রুট কেক তৈরি করেছিলেন তিনি। প্রথমে ছাত্রছাত্রীদের কথা মাথায় রেখে এটি তৈরি করলেও, পরে হাওড়া, কলকাতা এবং হুগলি থেকে সারা বাংলায় এই ব্যবসা এখন রমরমিয়ে চলছে।
‘‘চা আর কেক’’— ধীরে-ধীরে সত্তর-আশির দশকের মধ্যবিত্তদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এই ব্র্যান্ডটি।

‘খুকুমণি আলতা’
বিবাহের পরে মেয়েরা অন্যের বাড়ি চলে যায়। তার আদরের খুকুর থেকে বাবা-মা’র মধ্যে তৈরি হয় লক্ষ যোজন দুরত্ব। তাই, প্রতিবার আলতা-সিঁদুর পরার সময় শ্বশুরবাড়িও যেন সেই আপন-মুহুর্ত তৈরি করে, সেই ধারণা থেকেই ‘খুকুমণি’। আলতা-সিঁদুড়ে তাদের ব্যবসা এখন বাঙালির আবেগ। ‘খুকুমণি’ এই আবেগঘন শব্দ দিয়েই তারা ব্র্যান্ডের প্রচার করে চলেছে।
১৯৭১ সালে, শ্রী শ্রীকান্ত রায়চৌধুরী, শ্রী গোপীকান্ত রায়চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি সন্ধ্যা রায়চৌধুরী এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তবে, নিছক ব্যবসার তাগিদে নয়, নারী স্বাধীনতাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

হুগলি জেলার জনাইয়ের বাসিন্দা এবং সিমলার প্রখ্যাত মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী গিরিশ চন্দ্র দে-র জামাতা নকুর চন্দ্র নন্দীর ‘গিরিশ চন্দ্র দে এবং নকুর চন্দ্র নন্দী’র বিখ্যাত সব মিষ্টি, নবীনচন্দ্রের রসগোল্লা, সতীশ ময়রা, চিত্তরঞ্জনের ‘মধুপর্ক’— বাঙালির রসবোধে এখনও মিষ্টি জুগিয়ে চলেছে!
বিকেলের জলখাবারে ‘মুখোরোচকে’র চানাচুর হোক কিংবা ‘জলযোগে’র স্ন্যাক্স আজও বাঙালির আশ্বাস। এমনকি, জলযোগ নিয়ে সরাসরি প্রশংসাও করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। অজন্তা-তিতাস কিংবা আজকের শ্রীলেদার্স— বাঙালির ব্যবসা কোথায় না পৌঁছেছে! সুন্দর হাতের লেখার জন্য ‘সুলেখা’র কালি, বেণীমাধব শীলের ফুল পঞ্জিকা…
এমনকি বিদেশি খাবারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘মিও-আমরে’— সর্বত্রই বাঙালির আনাগোনা।
সময়ের সঙ্গে বাজার বদলেছে, এসেছে বহুজাতিক প্রতিযোগিতা ও ডিজিটাল বিপণন। তবু, পুরানো বাঙালি-ব্র্যান্ডগুলির প্রতি মানুষের আবেগ আজও অটুট। কারণ, শুধুই পণ্য বিক্রি নয়, কর্পোরেটের বাজারি মানসিকতার বাইরে ‘বাঙালি-ব্যবসা’ নিঃসন্দেহে এক সমাজ,সংস্কৃতি, উৎসব, মধ্যবিত্ত জীবন ও নস্টালজিয়ার সম্পূর্ণ দলিল।