অরূপরতন চক্রবর্তী

১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্য সরকারের সমস্ত দপ্তরে বাংলা ভাষায় কাজকর্ম বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বহু মানুষ মনে করছেন, যদি সরকারি অফিসে বাংলা বাধ্যতামূলক হতে পারে, তবে পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি বিদ্যালয়গুলিতেও অন্তত একটি বিষয় হিসেবে বাংলা শেখা কি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়?
ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই স্থানীয় ভাষার গুরুত্ব রয়েছে। মহারাষ্ট্রে মারাঠি, পাঞ্জাবে পাঞ্জাবি, তামিলনাড়ুতে তামিল—এসব ভাষা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, রাজ্যের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজকে জানার প্রধান মাধ্যম। পশ্চিমবঙ্গে থেকেও যদি একজন ছাত্র বাংলা পড়তে বা লিখতে না পারে, তাহলে সে এই রাজ্যের সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টির সঙ্গে গভীর পরিচয় গড়ে তুলতে পারবে না।

অনেকেই মনে করেন, বাংলা বাধ্যতামূলক মানেই অন্য ভাষার বিরোধিতা নয়। বরং ইংরেজি, হিন্দি কিংবা নিজের মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলাও শেখা একজন ছাত্রকে আরও সমৃদ্ধ করে। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী অবাঙালি ছাত্রছাত্রীরাও বাংলা জানলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে, বাজার-হাসপাতাল-সরকারি অফিসে যোগাযোগ করতে সুবিধা হয় এবং ভবিষ্যতে রাজ্যের বিভিন্ন চাকরি বা পেশাগত ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধা পায়।
তবে এই বাধ্যতামূলক শিক্ষা হওয়া উচিত মানবিক ও বাস্তবসম্মত। যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের জন্য সহজ পাঠ্যক্রম, আলাদা মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ভাষা শেখার আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ভাষা কখনও ভয়ের বিষয় হতে পারে না; ভাষা হওয়া উচিত সংযোগের সেতু।
বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়, ইতিহাস ও আবেগের ধারক। এই রাজ্যে দীর্ঘদিন বসবাসকারী প্রতিটি শিশুর অন্তত বাংলা পড়া, লেখা ও সাধারণভাবে কথা বলার দক্ষতা অর্জন করা উচিত। এতে কোনও ভাষার ক্ষতি হয় না; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সামাজিক সংহতি এবং সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হয়। নিজের শিকড়কে সম্মান করেই বিশ্বকে আলিঙ্গন করা যায়—বাংলা শেখার মধ্যেও সেই শিক্ষাই লুকিয়ে আছে।