লিখছেন দেবর্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়

এপ্রিলের এক গরমের দুপুরে অঞ্জনদা শুনিয়েছিলেন ‘চালচিত্র এখনে’র চিত্রনাট্য। সে দিন খুব বেশি লোক ছিলেন না। এটুকু জানতাম গুরু মৃণাল সেনকে নিয়েই ছবিটি বানাচ্ছেন অঞ্জনদা। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে পড়া হয়েছিল চিত্রনাট্য। তখন শেষ বিকেল। কিছুক্ষণ অঞ্জন আর মৃণালের জগতে হারিয়ে গিয়ে মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে জরুরি শব্দ সম্ভবত ‘সততা’…
ছবিটির বছর দেড়েক আগে থেকেই ‘মৃণাল শতবর্ষে নানা কাজে জড়িয়ে ছিলাম অঞ্জন দত্তর সঙ্গে। অজস্র ইন্টারভিউ তো নিয়েইছি। আলিয়ঁস ফ্রাঁসেতে তিন দিনের মৃণাল সেনের একটা চলচ্চিত্র প্রদর্শনেরও আয়োজন করেছিলাম তাঁর পরামর্শে।
এ ছবির শুটিং চলাকালীন দেখতাম, নিজের স্মৃতির ভিতর কীভাবে রোজ শুটিং ইউনিট নিয়ে ঢুকে পড়ছেন অঞ্জন। কীভাবে পরিশ্রম আর মেধা একাকার করে স্মৃতিমালা খুঁড়ে তুলে আনছেন মৃণাল সেন আর সেই সময়ের কলকাতা।
জাতীয় পুরস্কারের খবরে মনে পড়ছিল মৃণালবাবুকে নিয়ে বলা অঞ্জনদা’র অজস্র কথা। অঞ্জনদা বলতেন, স্ট্রাগলের দিনগুলোয় অজান্তেই একশো টাকা গুঁজে দিতেন মৃণালবাবু পকেটে। প্রথম ছবির শুটিংয়ের ফাঁকে তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন ইডিপাস রেক্সের বই।
এপ্রিলেই ছবিটির একটি ওয়ার্কশপে আমরা জড়ো হয়েছিলাম অঞ্জন দা’র বাড়িতে। একসঙ্গে ওয়াংকার ওয়াই দেখা, সত্তর দশকের জঁ জেনের নাটক মঞ্চস্থ করা, আমাদের ডাবিং, শেখরদা’র নানা গল্পগাছা, শাওন, সুপ্রভাতদা, সোমনাথ, অর্ণব— সবাই মিলে আনন্দে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো।
সত্তর-আশির দশকের কলকাতা, রক্ত-মাংসের মৃণাল সেন, মৃণালের বেলতলার অদ্ভুত বাড়ি, পাগলাটে শুটিং ইউনিট, অনুপ কুমার, বাদল সরকার, উৎপল দত্ত, কে কে মহাজন— সবাইকে রেখে ম্যাজিকের মতো সময়টাকে খামচে তুলে এনেছিলেন অঞ্জন।
এ ছবির শেষে আছে একটা গিটার ভাঙার মুহূর্ত। আমি আমার আধভাঙা গিটারটাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। শুটিং-এ সেটা ভাঙার পর কষ্ট হয়েছিল। জাতীয় পুরস্কারের খবরে যখন অনেকেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল, মনে পড়ল কিছু কিছু কষ্ট ফিরে আসে এরকম মন ভালো করা নিয়েও।
‘চালচিত্র এখন’ আমার জীবনে একটা স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থেকে গেল। সারাজীবন বয়ে বেরাবো যে স্মৃতি…অজান্তেই…