অরূপরতন চক্রবর্তী

দেশজুড়ে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে ছাত্রদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার ঘটনাকে ঘিরে। রাজধানী দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উদ্যোগে যন্তর মন্তর থেকে সংসদের উদ্দেশে মিছিল করা হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর উপর বলপ্রয়োগের অভিযোগ সামনে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। NEET-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনায় ক্ষুব্ধ পড়ুয়াদের আন্দোলন দমাতে শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ অনেকের কাছেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে মনে হয়েছে।
এই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংহতির বার্তা নিয়ে নেমেছেন ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং সাধারণ মানুষ। বহু শহরে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেকের মতে, শিক্ষার মতো একটি মৌলিক প্রশ্নে তরুণ প্রজন্মের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই ঘটনার জেরে বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে ঘিরেও নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তাঁকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া ও হাসপাতালে ভর্তি করার খবর প্রকাশ্যে আসার পর ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
গত সোমবার কলকাতায়ও উঠেছে দিল্লির ছাত্রদের সমর্থনে আওয়াজ। যাদবপুরের ৮বি বাস্টস্ট্যান্ডে সেদিন বেড়োয় বিশাল মিছিল। দিল্লি লাঠিচার্জের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে শহরের ছাত্রছাত্রীরা। প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে প্রেসিডেন্সির ছাত্ররাও।
প্রতিবাদের ঢেউ পৌঁছে গিয়েছে বিনোদন জগতেও। অপর্ণা সেন, দিলজিৎ দোসাঞ্জ, শাবানা আজমি, বির দাস, নাসিরুদ্দিন শাহ, সোনাক্ষী সিনহা, অভয় দেওল, প্রকাশ রাজ, অদিতি রাও হায়দরি, স্বরা ভাস্কর-সহ বহু শিল্পী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যে একটাই সুর—গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান করতে হবে, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে দমন নয়, শুনতে হবে।

অভিনেত্রী শাবানা আজমি—যিনি প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে আসা হাতেগোনা কয়েকজন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম—বলেছেন যে, শিক্ষার্থীদের ওপর যে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের যে লক্ষ্য তারা ঘোষণা করেছিলেন, তার সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি জানান, আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ হলেও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ছিলেন এবং পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের মুখেও নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিলেন।
https://www.instagram.com/reels/DbADGVMiEsy
বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর সমর্থন জানিয়েছেন। শাহ বলেন, “এই মুহূর্তে আমার মন ভারাক্রান্ত এবং আমি তীব্র ক্ষোভে ফুঁসছি—যেভাবে আমাদের সন্তানদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। মুখোশধারী ও লাঠিধারী সেই গুণ্ডাদের দেখে আমার আমেরিকান ‘আইস’ (ICE) এজেন্টদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে নিজেদের সন্তানদের কথা ভাবুন এবং মনে রাখবেন, একদিন আপনাদেরও মৃত্যু হবে।” আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “অনেকেই আপনাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। অনেকেই আপনাদের পাশে আছেন। আপনারা লড়াই চালিয়ে যান; দেশের তরুণদের ওপর আমার সবসময়ই আস্থা ছিল এবং এখন সেই আস্থা আরও দৃঢ় হয়েছে। আপনারা আপনাদের লড়াই চালিয়ে যান, আমরা আপনাদের পাশে আছি।”
https://www.instagram.com/reels/DbFZuD_wvxO
একটি বেসরকারি চ্যানেলে শাবানা আজমি বলেন, “টিয়ার গ্যাস ছোড়ার সময় আমি ঠিক ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলাম। আমি সেখানে ছিলাম এবং দেখেছি কীভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর—এমনকি তরুণী ও ছাত্রীদের ওপরও—লাঠিচার্জ করা হয়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন যে, ঘটনার দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং দাবি করা হয়েছিল যে কেউ একজন জুতো ছুড়েছিল যার জেরে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়; কিন্তু তিনি নিজে এমন কিছু দেখেননি। তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীরা তাদের আঘাতের চিহ্ন দেখানোর সময় তাকে একই কথা বলছিল।
চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপ ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে লিখেছেন, ইউনিফর্ম পরার জন্য নিজের আত্মা, মানবিকতা—সবকিছুর সাথেই নাকি আপস করতে হয়! এটা জানা ছিল না। এই দেশে কি এমন কোনো পুলিশকর্মী আছেন যিনি বুক ঠুকে বলতে পারবেন, ‘আমি এই নির্দেশ মানব না, কারণ এটি ভুল’?
অতুল কুলকার্নি একটি কবিতার মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করে প্রশাসনের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: “হে সাংসদগণ, আপনারা কি গতকাল রাতে বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পেরেছিলেন? আর লাঠিধারী পুলিশ কনস্টেবল, আপনি কি বাড়ি ফিরে কেঁদেছিলেন?”
সোনু সুদ, রিতেশ দেশমুখ এবং জেনেলিয়া দেশমুখ ‘এক্স’ (X)-এ বার্তা দিয়ে সহানুভূতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। এই দম্পতি একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “আমরা আমাদের দেশের তরুণদের পাশে আছি। তাদের কথা শোনা প্রয়োজন—জোরালো ও স্পষ্ট স্বরে এবং নির্ভয়ে।”
https://x.com/Riteishd/status/2079249359523500424
অভিনেত্রী ও আইপিএল দলের মালিক প্রীতি জিন্টা ‘এক্স’-এ পোস্ট করেন, “আমি আশা করি আমাদের সরকার সোনম ওয়াংচুক এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা শুরু করবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কারের এই লড়াইয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থী এবং সোনমের প্রতি আমার আন্তরিক ও অবিচল সমর্থন রইল।”
রাজনৈতিক বিষয়ে প্রায়শই সরব থাকা কৌতুকশিল্পী বীর দাস ইনস্টাগ্রামে লেখেন, “এমন সব নিউজ চ্যানেলকে কাজে লাগানো হচ্ছে—যারা কোনো তরুণকেই দেখে না, যারা কোনো তোয়াক্কা করে না বা যার দ্বারা তারা প্রভাবিতও হয় না—উদ্দেশ্য হলো বয়স্ক দর্শকদের তরুণদের সেই প্রতিবাদ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া, যাতে তাদের (বয়স্কদের) অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না।”
তিনি ভারতের সকল শিল্পীকে কেবল নীরব দর্শক হয়ে না থাকার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, “আমি আশা করি আপনারা তরুণদের হয়ে কথা না বলে পরে তাদের কাছেই টিকিট বিক্রির চেষ্টার মধ্যে যে চরম ভণ্ডামি রয়েছে, তা বুঝতে পারছেন। ভারতীয় জনতা যেসব বিষয় নিয়ে ভাবছে বা উদ্বিগ্ন, সে বিষয়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকা এবং একইসঙ্গে সেই ভারতীয় জনতার কাছ থেকে নিজের জন্য জোরালো সমর্থন ও আগ্রহ আশা করা—এ এক অদ্ভুত বিলাসিতা।”

দিলজিৎ দোসাঞ্জ মন্তব্য করেছেন, ছাত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অরিজিৎ সিংও সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদ্দেশে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ইতিহাস সবকিছুরই হিসাব রাখে। এই মন্তব্যগুলি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের আবেগের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
আজকের ভারতীয় সমাজের বড় একটি অংশ মনে করছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণদের প্রতি প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল সংলাপ ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। তার পরিবর্তে যদি বলপ্রয়োগই প্রধান উত্তর হয়ে ওঠে, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ সংকেত নয়।
ভারতের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে চেপে রাখা যায় না। ছাত্রদের আন্দোলন কেবল একটি দাবির লড়াই নয়; তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশা, আস্থা এবং ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন। যে সমাজ নিজের ছাত্রদের কথা শোনে না, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে।
এই ঘটনার সত্যতা ও দায়িত্ব নির্ধারণের কাজ আইন ও তদন্তের মাধ্যমে হওয়া উচিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেশের বহু মানুষের মনে যে ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, তা কেবল শক্তি প্রয়োগ করে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের শক্তি নয়, জনগণের আস্থা-ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভিত্তি।