সৌম্যা ঘোষ

নবারুণ ভট্টাচার্যর সঙ্গে সমনাম হয়ে গেছে, তাঁর সম্পাদিত ‘ভাষাবন্ধন’ পত্রিকা। প্রতি বছর একটি স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে আসছে ভাষাবন্ধন। স্বয়ং নবারুণই শুরু করেছিলেন এই বক্তৃতা। এবারের বিষয়: রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’।
অনুষ্ঠানের এ বারের বক্তা কবি ও অধ্যাপক অভীক মজুমদার। তাঁর বিষয় ‘বিশ্বের বাঁশিতে নাচের যে ছন্দ— ইঙ্গিতময় রক্তকরবী’। অনুষ্ঠিত হবে শনিবার, ১ আগস্ট, সন্ধে সাড়ে ছ’টা। স্থান, যদুনাথ সরকার মিউজিয়াম অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার, বরুণ দে সভাকক্ষ।
‘ভাষাবন্ধনে’র অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক রাজীব চৌধুরীর জানালেন, ‘এ পর্যন্ত দশটি স্মারক বক্তৃতা আমরা আয়োজন করেছি। শুধু, অতিমারী অধ্যুষিত লকডাউন পর্বে একবার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি এটি। এবং আর একবার অনলাইন বক্তৃতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।’
এ ছাড়া, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হিরণ মিত্র, সোহিনী সেনগুপ্ত, মৈত্রীশ ঘটক, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, অম্লান দাশগুপ্ত, মালিনী ভট্টাচার্য, বৈজয়ন্ত চক্রবর্তী, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়দের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরাও তাঁদের বক্তৃতা রেখেছেন এ সভায়।
রবীন্দ্রনাথ বহুবার সম্পাদনা করেছেন ‘রক্তকরবী’র পান্ডুলিপি। ততদিনে তিনি নোবেলজয়ী।
কবি ও অধ্যাপক অভীক মজুমদারের মতে, সাধারণত রবীন্দ্রনাথের মত উচ্চতায় পৌঁছে গেলে, মানুষ আর কোনও প্রশ্ন নিয়ে বাঁচে না।
মনে করে, তিনি সবর্জয়ী।
কিন্তু, রবীন্দ্রনাথ এখানেই একজন আশ্চর্য লেখক, যিনি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করতে চেয়েছেন, নিজের লেখাগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে চেয়েছেন, নতুন ভাবে বুঝতে চেয়েছেন। এই যে বারবার নিজেকে ভেঙে গড়ার চেষ্টা— এটিই হয়তো এই ১১টি সংস্করণের ভেতর তৈরি হয়ে উঠছে।
‘রক্তকরবী’ এই নাটকটি নিয়ে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি অনেক কথা বলেছেন, আজও বলে চলেছেন এবং ভবিষ্যতেও বলবেন। তবে, এই বক্তৃতায় তাঁর নিজস্ব কিছু অবলোকন শ্রোতার সামনে পরিবেশন করতে চেয়েছেন অভীকবাবু।
কিছুদিন আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘রক্তকরবী’র শতবর্ষ উপলক্ষে তিনি একটি লেখা লেখেন। লেখাটির সূত্রেই তাঁর আরও কিছু প্রশ্ন মাথায় এসেছিল। জানালেন, যে কোনও পাঠ্যেই, বিশেষত এই ধরনের বহুস্তরীয় রচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক থেকে আলো ফেলা যেতে পারে। এ ভাবেই কোনও বিশেষ সমাধান বা তত্ত্ব হাজির করা বা কোনও বিশেষ ব্যাখ্যার দিকে ঐক্যমত তৈরির চেষ্টা থেকে নয়, বরং তিনি কিছু প্রশ্ন তুলতেই চেয়েছেন। বললেন, ‘রক্তকরবী সম্পর্কে আমার যে পাঠ— সেই অনুভূতি, কিছু কথা, অনিশ্চয় এবং ইঙ্গিত… এগুলোকে বোঝবার চেষ্টা করব এদিন।’
যন্ত্র ও মানুষের আবহমান দ্বন্দ্ব নিয়েই ‘রক্তকরবী’।
রবীন্দ্রনাথের নাটকের যক্ষপুরী যন্ত্র এবং মানুষে সম্পর্কের দ্বন্দ্বের আধার। সভ্যতার চিরকালীন সমস্যাই ‘প্রতিষ্ঠান’। এবং তা পেরিয়ে প্রজাদের রাজার কাছে পৌঁছনো প্রায় দুর্বিষহ ব্যাপার। কারণ, রাজার বাস ঘেরা-জালের ভেতর। বাইরে প্রহরী। মৃত-শাসন বয়ে বেড়ায় একটা গোটা প্রতিষ্ঠান। আসলে ‘যক্ষপুরী’ কোনও বিশেষ সময়ের নয়। প্রতিটি সময়ের, প্রতিটি সভ্যতারই একটা করে ‘যক্ষপুরী’ থেকে যায়। তাই শম্ভু মিত্র থেকে আজকের নাট্যকাররা ফিরে ফিরে গেছেন বারবার এ নাটকের কাছে…
যক্ষপুরীতে প্রাণের স্পন্দন নিষেধ। প্রাণের স্পর্শ এনেছিল একমাত্র, নন্দিনী। তার ছিল ছোট্ট কিশোর। রোজ সকালে নন্দিনী কিশোরের হাত থেকেই রক্তকরবী ফুল নেবে। কিশোর বলে, ওদের মারের ওপর দিয়েই রোজ তোমাকে ফুল এনে দেব…
শাসকদলের শোষণের ব্যথায় সেই ফুল কিশোরের আরও নিজের হয়ে ফোটে। তখন ওরা হয় তার দুঃখের ধন। তাই রক্তকরবী গাছটি কিশোরের ‘একটিমাত্র গোপন কথার মতো’। রক্তকরবী ফুলটি তারই ‘নিজের ফুল’। যে ফুল কাজ ফাঁকি দেওয়া আরও এক অচেনা কোনও সকালে নন্দিনীর জন্য সংগ্রহ করে আনবে নবীন কিশোর; আর নিজের ‘ভয় ভাঙা’ জীবননায়ে চেপে মারের সাগর পাড়ি দিতে দিতে, নন্দিনীর কাছে বারবার ফিরে আসবে বিশু তার সমস্ত গোপন ব্যথার ঐশ্বর্যময় পুঁজি নিয়ে… মহাকালের স্রোতে ভেসে… বারবার…