
‘পরকীয়া’ শব্দটা উচ্চারণ করলেই রাধা-কৃষ্ণ থেকে বাংলা ব্যান্ড ‘চন্দ্রবিন্দু’ সবটাই মুখরিত হয়।
সিরিয়াল খুললেই এখন প্রত্যেকেরই দু-তিনজন করে স্বামী-স্ত্রী। সিরিয়ালগুলো দেখলে মনে হয়, জীবনের একমাত্র সমস্যা প্রেম এবং বিয়ে। সেই প্রেম বা বিয়ে কোনোটাই যেন আর স্বাভাবিক হতে পারে না। অথচ, দু’দশক পিছিয়ে গেলে সিনেমা এবং গানে আমরা তো কত রূপকথার মতো সম্পর্ককেই উদযাপন করেছি। আজ তবে এ সেন আকাল কেন? সেই সন্ধানে ট্রাম লাইনের তরফে আমরা কথা বললাম নানা বয়সী সহনাগরিকদের সঙ্গে।
সাউথ সিটির ফুড কোর্টে আলাপ হলো বছর ৩০ এর অনিন্দিতার সঙ্গে। পেশায় এক বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত অনিন্দিতা একটি অনলাইন বুটিক ও চালান। বলছিলেন, “সারাদিনের ব্যস্ততায় প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলাই একরকম ‘এফোর্টে’র ব্যাপার। আজকের যুগে তাই, একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা একটা চাকরি টিকিয়ে রাখার থেকেও কঠিন। পেশার চাপে এমনিতেই নাজেহাল থাকি। অফিসেই কাটে দিনের বেশিরভাগ সময়। তাই, সহকর্মীরা যত সহজে আমার সুখ-দুঃখ বোঝে। অনেক সময় ‘প্রিয় মানুষ’ তা বোঝে না। কাজেই সম্পর্ক তো ঘেঁটে যাবেই!”
গড়িয়াহাটের মোড়ে আলাপ হলো বছর ৪৫ এর অরিত্র সেনগুপ্তের সঙ্গে। বেশ কয়েক বছর হলো সম্পর্কে অফিসিয়ালি সেপারেটেড তিনি। পেশায় গণমাধ্যম কর্মী অরিত্র জানালেন, নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে দেখেননি প্রায় তিন বছর। তীব্র নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব থেকে তাই কথা বলেন ফেসবুকে আলাপ হওয়া নানান বান্ধবীদের সঙ্গে। স্পষ্টই জানালেন, “একা একা তো সবসময় বাঁচা যায় না। একঘেয়ে লাগে। বিশেষ করে, পুজো বা বড়দিন এলে যখন সবাইকে রাস্তায় হাত ধরে ঘুরতে দেখি, তখন মনে হয় আমারো বন্ধু দরকার।”
সল্টলেকের সিটি সেন্টার চত্বরে কথা হলো ২৫ বছর বয়সী সুলগ্নার সঙ্গে। তাঁর বক্তব্য, “ওইসব অ্যাডজাস্টমেন্টের দিন চলে গেছে। মানিয়ে নিতে না পারলে একদম কাটাও। নিজের স্পেসে বাঁচো, দিনের শেষে নিজের মেন্টাল হেল্থটাই আসল। ওই বার বার ফোন… ফোন না ধরলে ঝামেলা… আন্ডারস্ট্যান্ডিং বলে কিছুই নেই। ফুলটাইম অফিস না ফুলটাইম সম্পর্ক, কোনটা সামলাবো! তার থেকে নিজে একা থাকো, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরো আর এঞ্জয় করো।”
আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের সূচনা থেকেই রয়েছে পরকীয়ার ধারণা। রাধা-কৃষ্ণকে ঘিরে পরকীয়ার গল্পগাছা যুগ যুগ ধরে মাতিয়ে রেখেছে মানুষকে। উত্তর-আধুনিককালের কবি-লেখকরা সম্পর্কের জটিলতাকে দেখিয়ে মনস্তত্ত্বের কাটা-ছেঁড়াও করেছেন।
বর্তমানে, সাহিত্য, সিনেমা, ওয়েব সিরিজ়, এমনকি সিরিয়ালেও ফিরে ফিরে এসেছে পরকীয়া।

পরকীয়া সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানীদের কী মত? আমরা কথা বলেছিলাম তাঁদের সঙ্গে।
মনোরোগ চিকিৎসক এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জে. আর. রাম ট্রামলাইনকে জানিয়েছেন, “আমার মনে হয় না যে পরকীয়ার সঙ্গে কোনো নৈতিকতার সম্পর্ক রয়েছে। কেন পরকীয়া প্রেম হয়, এক বাক্যে তার কোনো সরল ব্যখ্যা হয় না।”
তাঁর অভিজ্ঞতায়, বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কারণে এক্সট্রা ম্যারেটিয়াল রিলেশনশিপে জড়িয়ে পড়ে।
পুরুষরা অনেক সময়ই মনে করে, তারা এই ধরণের সম্পর্ক করতেই পারে। এটা অনেকটা তাদের কাছে ‘অ্যাচিভমেন্টে’র মতো। এক্ষেত্রে, তাদের ‘সেল্ফ এসটিম’ বুস্ট হয়। তাঁর মতে, ‘‘ইট ইজ় আ সাইন অফ ম্যাসকিউলিনিটি। দ্যাট আই অ্যাম এবেল টু ডু ইট।”
সমাজ একজন পুরুষমানুষের এক্সট্রা ম্যারেটিয়ালকে যেভাবে দেখে, একজন মহিলার ক্ষেত্রে সেই দেখার চোখ কিন্তু সম্পূর্ণ বদলে যায়।
কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই বৈবাহিক সম্পর্কে বা প্রেমের সম্পর্কে জং ধরে যায়, ফিকে হয়ে যায়।
তখন অন্য আর একজনের প্রতি তারা আকৃষ্ট হয়। কারণ, মানুষের মনেরও পরিবর্তন হয়। পঁচিশ বছর বয়সে যাকে ভালো লাগবে, চল্লিশ বছর বয়সে গিয়ে তখন অন্য কাউকে ভালো লাগতেই পারে। সেক্ষেত্রে আগের সম্পর্ক ততটা আর ভালো লাগে না, জীবন্ত মনে হয় না। তাই, এক্সট্রা ম্যারেটিয়াল রিলেশনশিপের দ্বারস্থ হয়।
তিনি আরও জানান, অনেক মহিলারা বৈবাহিক সম্পর্কে খুব একটা একাত্মবোধ অনুভব করে না, তখন তাদের ‘আইসোলেটেড’ মনে হয়। প্রয়োজন হয় একজন কাছের মানুষের। আর, তখনই তারা এই ধরণের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।

আসলে, পরকীয়ার কারণ সবসময় যৌন আকর্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এর নেপথ্যে কাজ করে মানসিক অপূর্ণতা, আবেগগত দূরত্ব, সম্পর্কের একঘেয়েমি বা স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরকীয়া কেবল বৈবাহিক সম্পর্কের অসন্তোষের ফল নয়; সুখী সম্পর্কেও কেউ কেউ ব্যক্তিগত কৌতূহল, আবেগগত উত্তেজনার খোঁজে এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের যোগাযোগের অভাব, সঙ্গীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত মনোযোগ না পাওয়া অথবা ব্যক্তিগত অসন্তোষ মানুষকে সম্পর্কের বাইরে নতুন সংযোগের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে নতুনের প্রতি আকর্ষণ, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বা অন্যের আয়নায় নিজকে দেখার ইচ্ছা থেকেও মানুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নতুন প্রেম বা নিষিদ্ধ সম্পর্ক মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘নোভেলিটি সিকিং বিহেভিয়ার’।
আবার, ‘অ্যাংকশাস অ্যাটাচমেন্ট’ এ থাকা মানুষ প্রায়ই অতিরিক্ত ভালোবাসা ও আশ্বাস খোঁজে। সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতা থেকে তারা অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন।
‘অ্যাভয়ডেন্ট অ্যাটাচমেন্ট’ এ থাকা মানুষ ঘনিষ্ঠতাকে ভয় পান। ফলে স্থায়ী সম্পর্কে থেকেও বাইরে আবেগগত সংযোগ খুঁজতে পারেন।
আবার, ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’ ও ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ থেকেও অনেকে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়।
“আমি এখনও আকর্ষণীয় কি না” বা “আমার জীবনে এখনও নতুন কিছু বাকি আছে কি না”— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
অনেক মানুষ নিজের মূল্যবোধ বা আত্মসম্মান সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকে।
তাই, যখন অন্য কেউ তাদের প্রশংসা করে, গুরুত্ব দেয় বা আকর্ষণ প্রকাশ করে, তখন সেই স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি তাদের পরকীয়ার দিকে টেনে নিতে পারে।

“সে ছিল তখন উনিশ
আমি তখন ছত্রিশ,
প্রেমে পড়তে লাগেনা বয়স
মনে থাকেনা উনিশ-বিশ।”
প্রকৃত ভালোবাসা কোনো হিসেব মেনে হয় না… হয় না কোনো রং।
ভালোবাসা বলতে একটু আশ্রয়, অসহায়তায় একফোঁটা শান্তি। নচিকেতার ‘পেসমেকার’ গানটা অসম বয়সী প্রেমেরই তেমন গল্প— বাস্তব, মন ছুঁয়ে যাওয়া…
সমাজ ঘেঁটে গেছে। তাই, সম্পর্ক ও যে ঘাঁটবে, তা স্বাভাবিক। দু-দশক আগে যেভাবে মানুষ সম্পর্কে বিশ্বাস রাখতেন আজ আর সেভাবে রাখে না। হয়তো অন্যভাবে রাখে। সেই ‘অন্যভাবে’র নাম হয়তো আজকের ‘পরকীয়া’। মানুষ হাতের কাছে যাকে পাচ্ছে, তাকেই হয়তো মনের কথা বলছে। আইন বা সমাজের পরোয়া না করেই। তাই মধ্যযুগ হোক বা ডিজিটাল যুগ, পরকীয়া চলছে, চলবে…
তথ্য সহায়তা: মনোবিদ শ্রেয়া চট্টোপাধ্যায়