
পাক্কা বাইশ বছর পর ইস্ট বেঙ্গল দেশের সেরা ফুটবল ক্লাব হয়েছে সদ্য সদ্য। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সব সেলেব্রেশন গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। কারণটা আর কিছুই না, বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই কলকাতার এক অদ্ভুত রোগ দেখা দেয়। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম নেই, তবে পাড়ার ভাষায় একে বলে “ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা জ্বর”।
চার বছর ধরে যে কাকু মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল নিয়েই ঝগড়া করেন, বিশ্বকাপ শুরু হতেই তিনি হঠাৎ করে রিও ডি জেনেইরোর নাগরিক হয়ে যান। আর পাশের বাড়ির জেঠু, যিনি জীবনে কখনও বুয়েনস আইরেসের নামও ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারেননি, তিনি নিজেকে আর্জেন্টিনার সাংস্কৃতিক দূত বলে মনে করতে শুরু করেন।
বিশ্বকাপের সময় কলকাতার চেহারা দেখার মতো। কোথাও বিশাল মেসির কাটআউট, কোথাও নেইমারের ছবি, কোথাও আবার পুরো পাড়া নীল-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ পতাকায় ঢেকে গেছে। অনেক জায়গায় এমন অবস্থা হয়েছিল যে বিদেশি কেউ যদি হঠাৎ নেমে পড়েন, তিনি ভাবতেই পারেন, কলকাতা হয়তো দক্ষিণ আমেরিকার কোনো শহর।

আমাদের পাড়ার মন্টু কাকু ছিলেন ব্রাজিলের সমর্থক। বিশ্বকাপের আগে তিনি নিজের বাড়ির ছাদে বিশাল ব্রাজিলের পতাকা লাগালেন। তার জবাবে পাশের বাড়ির শ্যামলবাবু আর্জেন্টিনার পতাকা এমন উঁচু বাঁশে বাঁধলেন যে সেটি প্রায় মোবাইল টাওয়ারের সমান হয়ে গেল। দুজনেই প্রতিদিন দূরবীন দিয়ে দেখে নিতেন কার পতাকা বেশি উড়ছে।
আগের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যখন সৌদি আরবের কাছে হেরে গেল, তখন ব্রাজিল সমর্থকদের মুখে এমন হাসি ফুটেছিল যেন তারা নিজেরাই কাপ জিতে ফেলেছে। কিন্তু কয়েকদিন পর আর্জেন্টিনা আবার জিততে শুরু করতেই সেই হাসি ধীরে ধীরে উধাও।
সেবার বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে কলকাতা যেন ঘুমাতেই ভুলে গিয়েছিল। চায়ের দোকানে, ক্লাবে, পাড়ার মোড়ে—সব জায়গায় একটাই আলোচনা, “আজ মেসি কাপ নেবে তো?” ম্যাচ শেষ হতেই আর্জেন্টিনা জেতায় বহু জায়গায় আতশবাজি, মিছিল আর উৎসব শুরু হয়ে গেল। এমন উদ্যাপন হয়েছিল যেন আর্জেন্টিনা নয়, কলকাতাই বিশ্বকাপ জিতেছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই সমর্থনের সঙ্গে কারও জন্মস্থান, ভাষা বা নাগরিকত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। একজন ভাত-ডাল খাওয়া বাঙালি হঠাৎ করে ব্রাজিলের পাঁচবারের বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস মুখস্থ বলে দিচ্ছেন। অন্যদিকে আরেকজন আর্জেন্টিনার প্রতিটি খেলোয়াড়ের পারিবারিক বৃত্তান্ত পর্যন্ত জানেন।
বিশ্বকাপ শেষ হলে অবশ্য সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যায়। পতাকাগুলো ভাঁজ করে তুলে রাখা হয়, কাটআউট সরিয়ে ফেলা হয়, আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিতর্কের জায়গা নেয় মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ঝগড়া।
তবু চার বছর পর বিশ্বকাপ এলেই আবার সেই একই দৃশ্য। কলকাতা তখন আর শুধু কলকাতা থাকে না—সে হয়ে ওঠে অর্ধেক ব্রাজিল, অর্ধেক আর্জেন্টিনা, আর পুরোপুরি ফুটবল-পাগল।