‘শহরের লোক আসা নদী বুক বাওয়া
খেয়া থেকে দেখা কাঁটাতার
মাঝিটাকে রুজি দিল ভিটে পড়া খাওয়া
ইছামতী নদী নাকি বর্ডার।’
– অনিন্দ্য সুন্দর চক্রবর্তী
একটি বাড়ি। তার ঠিকানা ভারত, গোয়ালঘর বাংলাদেশে। অথবা একটি নারকোল গাছ। যার শিকড় বাংলাদেশে, কিন্ত ফলটি পড়ে ভারতের মাটিতে। একটি নদীর মাঝ বরাবর বর্ডার। গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’-এর সেই বিখ্যাত দৃশ্য…
ছোট্ট মেয়ে রোজ়িনা। নো-ম্যানস-ল্যান্ডের তিন দিন আটকে, দুই দেশের সরকাররা সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে কী হবে রোজ়িনাদের ভবিষ্যত। জন্ম বাংলাদেশে, কিন্ত এপারে বড় হওয়ায় কথায় পরিষ্কার নদীয়ার টান। রোজ়িনা কোন দেশের? উদ্বাস্তুদের কী দেশ হয়? অডেনের বিখ্যাত কবিতা ‘ ‘রিফিউজি ব্লুজ’-এর লাইন –
Say this city has ten million souls
Some are living in mansions, some are living in holes
Yet there is no place for us, my dear
Yet there is no place for us.
একটা দেশকে মাঝবরাবর ভাগ করে দিলে কী নতুন দেশ হয়? এই উপমহাদেশের ইতিহাসই যেন কিছুটা পরবাস্তব, দেশের সীমান্তে ছায়ারেখা। পৃথিবীর সব বর্ডারই হয়তো তাই। অমিতাভ ঘোষের উপন্যাস ‘শ্যাডো লাইনস’-এ আমরা দেখি দেশভাগ বাঙালির পরিচয়ের উপর এক দীর্ঘ ছায়া। দেশভাগের পর সেই ছায়া লক্ষ মানুষের জীবনে স্থায়ী চিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে। একসময় যে পথ ছিল অবাধ যাতায়াতের, তা রাতারাতি কাঁটাতার, পাসপোর্ট ও সন্দেহের ভাষায় বন্দি হয়ে পড়ে।
মান্টোর বিশান সিং-এর লাশ পড়ে থাকে সীমান্তপাড়ে। পাঞ্জাবের সীমান্তে ফুঁড়ে চলে যায় পাকিস্তানের ট্রেন। ‘কোমল গান্ধার’-এর অনসূয়া আর ভৃগুরা দাঁড়িয়ে থাকে সীমান্তে খন্ডিত ইতিহাসের প্রহরী হয়ে। অসংখ্য অসহায় মানুষের মৃতদেহের উপর দিয়ে যেই দেশভাগে, সেই মৃত মানুষেরা কোন দেশের নাগরিক? স্মৃতিদেরও কী ভিসা লাগে?
সন্ধ্যা নামে ইছামতীর উপর। নদীর জলে দু’দেশের আকাশ একই। কাশফুলের ডগায় বাতাস একইভাবে দুলে ওঠে। দুই পাড়ে একই ধানের শীষ, নদীর জল, শীতের কুয়াশা। মানুষ কথা বলে একই বাংলা ভাষায়। দেশভাগের প্রায় আট দশক পরেও বাংলার বিদীর্ণ সীমান্তের প্রতিটি নদী, স্টেশন, নামের ভেতর লুকিয়ে থাকে বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস। কেউ দেশ ছেড়েছিল, কেউ দেশ হারিয়েছিল, কেউ কোনওদিনই বুঝে উঠতে পারেনি, দেশ বলতে আসলে কোনটিকে বোঝায়।
বাংলা ভাষার জাতীয়তা কী? ভাষার কী জাতীয়তা হয়? উপভাষার ভিত্তিতে কি এত সহজেই বলা যায় একটা বাংলা ভাষা, একটা বাংলাদেশী? যেই ইছামতীর তীরে একসময় চড়ুইভাতি করত অপু-দুর্গা, সেই ইছামতীই এখন কোন দেশের?
রাষ্ট্র তার সীমানা আঁকে, ইতিহাস তার সাল-তারিখ লিখে রাখে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া বাড়ির উঠোন, ওপারের গাছের ছায়া, কিংবা বহুদিন না-দেখা আত্মীয়ের মুখ রয়ে যায় এক অদৃশ্য স্বদেশের অংশ হয়ে। পৃথিবীর সব মানচিত্রের বাইরেও হয়তো একটি দেশ থাকে। সেই দেশের নাম হয়তো বাড়ি।
বাংলার সাহিত্যে-সিনেমায়-মননে সেই একই প্রশ্ন বারবার ফিরিয়ে এসেছে। ঘর কোথায়? দেশ কোথায়? আর যে মানুষগুলির দুই-ই গেছে, তাদের পরিচয় কী?
বিশান সিং উন্মাদের চোখ দিয়ে এমন এক প্রশ্ন তুলেছিলেন, যার উত্তর রাষ্ট্র আজও দিতে পারেনি – দেশ বদলালে মানুষ কোথায় যায়? যে মাটিতে সে দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই যদি হঠাৎ অন্য দেশের হয়ে যায়, তবে তার স্বদেশ কোনটি? সেই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি অন্য সুরে ফিরে আসে ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’-এ। সেখানে কাঁটাতার হয়ে ওঠে রক্ত, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা আর মানবতার শেষ পরীক্ষা।
সীমান্তের প্রসঙ্গে যার নাম সবার আগে মাথায় আসে, তিনি ঋত্বিক ঘটক। কোমল গান্ধার-এ ভেঙে যাওয়া থিয়েটারের দল যেন যেন একটা বিদীর্ণ দেশেরই প্রতীক। জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’-য় দেশভাগকে দেখেছেন এক নারীর অভিজ্ঞতায়। রাষ্ট্রের বিভাজন সেখানে ঘর, শরীর, পরিচয় এবং সামাজিক সম্পর্কের বিভাজনে রূপ নেয়। রবিশঙ্কর বলের দোজখনামা-য় ইতিহাস, স্মৃতি ও মৃতদের কথোপকথন মিলেমিশে যায় এক কল্পনার উপমহাদেশে, যেখানে সীমান্তের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভাগাভাগি করা ভাষা এবং হারিয়ে যাওয়া শহরের স্মৃতি। অতীন বন্দোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পড়ে মনে হয়, দেশভাগের অভিঘাত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের ভেতরে বাসা বাঁধে। ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসা মানুষদের ঘর বদলায়, ঠিকানা বদলায়, নাগরিকত্ব বদলায় কিন্তু যে গ্রামটি রয়ে যায় স্মৃতিতে, তাকে কোনও সরকার পুনর্বাসন দিতে পারে না।
সাম্প্রতিক সময়ে ইমতিয়াজ় আলীর ছবি ‘ম্যাঁ ওয়াপাস আয়ুঙ্গা’তে সীমান্তের এই দীর্ঘ ছায়া ফিরে এসেছে নতুন করে। পাঞ্জাবের দেশভাগকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও দেশভাগ বাঙালির কাছে ভীষনভাবে বাস্তব। ছবির একটি দৃশ্যে, ট্রেনের মধ্যে বৃদ্ধ ঈশ্বর সিংয়ের মৃত্যুর মুহূর্তে ভেসে ওঠে একটি বাংলা গান। সেই সুর মিলিয়ে দেয় বাংলা আর পাঞ্জাবের খন্ডিত ইতিহাসকে। দেশভাগের ইতিহাসের দুটি ভৌগোলিক প্রান্ত, পূর্ব আর পশ্চিম। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, কাঁটাতার দু’জায়গায় আলাদা হলেও তার যন্ত্রণা একই ইতিহাসের সন্তান। উপমহাদেশের দুই প্রান্তে সীমান্ত আজও মানুষকে তাড়া করে ফেরে। কখনও স্মৃতির মতো, কখনও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিষাদের মতো, কখনও এক পাখির ডাক হয়ে। তার প্রতিধ্বনি এখনও আমাদের ভাষা, গান, সিনেমা এবং পারিবারিক স্মৃতির মধ্যে বেঁচে আছে।
সীমান্তের গল্প আজও প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে আরও তীক্ষ্ম হয়েছে সীমান্তকে ঘিরে রাজনীতির ভাষা। বিশেষত ভারতের বর্তমান সরকারের আমলে সীমান্ত ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন জনজীবন ও নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে, দুই বাংলার দুই প্রান্তেই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান ভাষা বা ভৌগোলিক পরিচয়ের থেকে ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখার প্রবণতাকে জোরালো করছে। চলছে বাঙালি পরিচয়কে ক্রমশ হিন্দু ও মুসলমানের পৃথক খোপে বন্দি করার এক নিরন্তর চেষ্টা। অথচ পদ্মা, ইছামতী কিংবা ভৈরব জানে না ধর্মের রেখা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন কিংবা জসীমউদ্দীনের ভাষাকেও কোনোদিন পাসপোর্টর দুই পাতার মধ্যে বদ্ধ করা যাবে না। রাজনৈতিক সীমারেখা মানুষের ইতিহাসের কেবল একটি অধ্যায়। এখনও হয়তো আশা করা যায়, একদিন আমরা দুই বাংলার মানুষ, এমনকি সমগ্র উপমহাদেশও – একদিন আমরা নিজেদের ক্ষুদ্র বিভাজন, সন্দেহ ও বিদ্বেষ অতিক্রম করতে পারব। সেদিন হয়তো সীমান্ত থাকবে, রাষ্ট্রও থাকবে। কিন্তু সেই ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে মানবতাই যেন হয়ে ওঠে আমাদের আসল পরিচয়।
জন লেননের ‘ইমাজিন’ এর কথা মনে পড়ে যায়।
Imagine there’s no countries
It isn’t hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion, too
Imagine all the people
Livin’ life in peace
আদতে বাস্তব পৃথিবী রাষ্ট্র ছাড়া চলে না, সীমান্তও রাতারাতি মুছে যায় না। কিন্তু সাহিত্য, সিনেমা আর গান আমাদের অন্তত এই কল্পনার অধিকারটুকু দেয় – একটি পৃথিবী যেখানে মানুষকে প্রথমে মানুষ বলেই ভাবা হতো, নাগরিক নয়। যেখানে রোজ়িনাদের আটকে থাকতে হয় না দুই কাঁটাতারের মাঝের অমীমাংসিত ভূমিতে। কোনোও এক স্বপ্নের দুপুরের অপু-দুর্গার মতনই, ইছামতীর পাড়ে চড়ুইভাতি করে তারা।