লিখছেন প্রত্যূষা পান

প্রখ্যাত ভাস্কর মীরা মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও শিল্পভাবনাকে কেন্দ্র করে আগামী ৫ জুলাই বিকেল ৫টায় আয়োজিত হতে চলেছে ‘মীরা মুখোপাধ্যায় স্মারক চারুকলা প্রদর্শনী ২০২৬’। পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘ, কলকাতা জেলা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন রত্নাবলী চট্টোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তপতী গুহঠাকুরতা। এছাড়াও শিল্পকলা ও সাহিত্য জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।
অন্যতম আয়োজক পরাগ রায়ের বক্তব্য, মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পভাবনা, জীবনদর্শন এবং উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য এই প্রচেষ্টা। প্রদর্শনীতে একদিকে যেমন মীরা মুখোপাধ্যায়ের কাজ নিয়ে আলোচনা হবে, তেমনি সমকালীন শিল্পীরাও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেদের সৃষ্টিকর্ম প্রদর্শন করবেন।
ভারতীয় আধুনিক ভাস্কর্যের ইতিহাসে মীরা মুখোপাধ্যায় (১৯২৩-১৯৯৮) প্রথম সারির শিল্পীদের একজন। এমন এক সময়ে তিনি ভাস্কর্যচর্চা শুরু করেছিলেন, যখন ভারতে নারী ভাস্করের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল। ভাস্কর্যের মতো শারীরিক পরিশ্রমসাপেক্ষ মাধ্যমে একজন নারীর কাজ করা সেই সময়ের সামাজিক পরিসরে ব্যতিক্রমী বলেই বিবেচিত হতো। আয়োজকদের মতে, এই সামাজিক ধারণাকে ভেঙে নিজের শিল্পসাধনার মধ্য দিয়ে মীরা মুখোপাধ্যায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
পরাগবাবু জানালেন, মীরা মুখোপাধ্যায়ের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম ও লোকঐতিহ্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। আধুনিক শিল্পশিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়েও তিনি ভারতের দেশজ ধাতুশিল্প, বিশেষ করে ডোকরা শিল্পের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। ঐতিহ্যবাহী ‘লস্ট-ওয়াক্স’ বা মোমের ছাঁচে ধাতু ঢালাই পদ্ধতিকে আধুনিক ভাস্কর্যের ভাষার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষা নির্মাণ করেন। তাঁর ভাস্কর্যে যেমন গ্রামীণ জীবন, শ্রমজীবী মানুষ এবং লোকসংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তেমনি শিল্পের মাধ্যম নির্বাচনেও প্রতিফলিত হয়েছে দেশজ প্রযুক্তির পুনর্মূল্যায়ন।
পরাগবাবুর মতে, মীরা মুখোপাধ্যায়ের জীবনযাপনও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বাইরে নিজের শর্তে শিল্পচর্চার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে শিল্পকেই তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন এবং আজীবন সেই সাধনাতেই নিজেকে নিবেদিত রাখেন। এই স্বাধীন শিল্পীসত্তাই তাঁকে তাঁর সময়ের থেকে বহু এগিয়ে রেখেছিল বলে পরাগবাবু মনে করেন।
প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত থাকছে একাধিক আলোচনা ও উপস্থাপনা। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পভাবনা, সমাজচিন্তা এবং ভারতীয় আধুনিক ভাস্কর্যে তাঁর অবদান নিয়ে বক্তব্য রাখবেন বিভিন্ন গবেষক ও শিল্পবিশারদ। বিশেষভাবে বক্তব্য রাখবেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক অদীপ দত্ত, যিনি দীর্ঘদিন মীরা মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্যে কাজ করেছেন এবং তাঁর শিল্পচর্চা নিয়ে গবেষণাও করেছেন।
এছাড়া প্রদর্শনী চলাকালীন পাঁচজন নবীন শিল্পীর কাজ নিয়ে একটি বিশেষ স্লাইড-প্রেজেন্টেশনেরও আয়োজন করা হয়েছে। সদ্য শিল্পশিক্ষা সম্পন্ন করা এই শিল্পীদের নির্বাচন করা হয়েছে তাঁদের স্বতন্ত্র শিল্পভাবনা ও কাজের ভিত্তিতে। পরাগবাবুর মতে, নতুন প্রজন্মের শিল্পচিন্তাকে সামনে আনা এবং তাদের কাজের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করানোও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পদৃষ্টির প্রতি এটিকেও এক ধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরাগবাবু জানিয়েছেন, সীমিত অর্থ ও জনসাধারণের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। অ্যাকাডেমি চত্বরকে শিল্প ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আবহে সাজিয়ে তোলারও পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে আমন্ত্রিত শিল্পীদের বাইরে জমা পড়া কাজের মধ্য থেকেও নির্বাচিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকবেন বাংলার কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পী এবং নির্বাচিত শিল্পীদের জন্য পুরস্কারেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়োজকদের আশা, এই প্রদর্শনী মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পচর্চাকে নতুন করে আলোচনায় আনবে, এবং একই সঙ্গে সমকালীন শিল্পচর্চা ও আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের কাজের প্রতি দর্শকদের আগ্রহও বৃদ্ধি করবে।