সংকীর্ণ দোকানের এক কোণে বসে দুই বৃদ্ধ পূর্ববঙ্গীয় উপভাষায় গল্প করছেন দেশভাগের স্মৃতি আর তাঁদের ফেলে আশা বাংলাদেশের। এক তরুণী হঠাৎ সেখানে এসে সুরেলা গলায় জানায় ‘গুডমর্নিং!’ বৃদ্ধরাও সুরেলা উত্তর দেয় তাঁকে। মেয়েটি কিনতে চায় লোম তোলার ক্রিম। মোমের মত মসৃণ ত্বক চাই তার। সঙ্গে চিপস আর কোল্ডড্রিংকস। অদ্ভুতভাবে পরবাস্তব মনে হলেও এটি কলকাতারই বাস্তবচিত্র। একটি দৃশ্যের মধ্যেই ব্যক্ত শহরের বিবর্তন। শহরের ভাঙাচোরা স্মৃতি, উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা, মধ্যবিত্তের হতাশা এবং নগরায়নের নির্মম বাস্তবকে একের পর এক দৃশ্যের মাধ্যমে জুড়ে দেয় মৈনাক বিশ্বাস ও অর্জুন গৌরীসরিয়ার ছবি স্থানীয় সংবাদ।

ছবির কেন্দ্রে রয়েছে অতীনের প্রেম খোঁজার গল্প। কিন্তু সেই প্রেমের অনুসন্ধান কখন যে নিজের অস্তিত্ব, নিজের বাড়ি, নিজের শহরকে খুঁজে পাওয়ার অনুসন্ধানে পরিণত হয়। অতীনের হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা অনন্যা যেন আসলে সেই হারিয়ে যাওয়া কলকাতারই প্রতীক। দুই চোরের চুল চুরির অদ্ভুত পরিকল্পনা, বেকার যুবকদের অন্তহীন আড্ডা, আর উদ্বাস্তু বৃদ্ধদের জীবনদর্শন। এই পরাবাস্তব অথচ গভীরভাবে বাস্তব নির্মাণের মধ্যেই যেন ভেসে ওঠে শহরের বিবর্তন।

ছবির শুরুতে আমরা দেখি খুব পরিচিত এক কলকাতা। বেকার যুবক, উদ্বাস্তু কলোনি, প্রোমোটারের আগ্রাসনে হারিয়ে যেতে থাকা পুরনো বাড়ি, অনিশ্চিত সম্পর্ক। কিন্তু ছবি যত এগোয়, সেই বাস্তবে স্বপ্নের রং লাগে, বাস্তব আর কল্পনার সীমানা মুছে যেতে থাকে। উদ্বাস্তু মানুষের বসতি থেকে শুরু করে রিয়েল এস্টেটের দখল, পুরনো পাড়ার বিলুপ্তি থেকে কংক্রিটের নতুন শহর – প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ভাঙা জানালা, প্রতিটি ফাঁকা মাঠ যেন নিজের অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে।
মনে পড়ে যায় থিও অ্যাঞ্জেলোপোলাসের ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’-এর কথা, যেখানে শহর নিজেকে ব্যক্ত করে বিচ্ছিন্ন মানুষের অভিজ্ঞতায়। স্থানীয় সংবাদ-এও হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে খুঁজতে আসলে খোঁজা হয় একটি হারিয়ে যেতে থাকা শহরকে, যেই যাত্রা আসলেই নিজের অস্তিত্বের সন্ধান। বাস্তব ও স্বপ্নের এই মিশ্রণ আবার মনে করিয়ে দেয় আপিচাতপং উইরাসেথাকুলের চলচ্চিত্রভাষাকে। তাঁর ছবিতে এরকমই অলৌকিকতা নিঃশব্দে বাস্তবের সঙ্গে মিশে যায়। ছবির শেষ অংশে কলকাতা এক উষ্ণতাবিহীন ভূদৃশ্যে রূপ নেয়। মনে পড়ে যায় বেলা তারের ‘রেকমনিস্টার হারমনিস’-এর শেষের ডিস্টোপিয়ার কথা। স্থানীয় সংবাদেও সেই ভবিষ্যত আমাদের বর্তমানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, যেখানে উন্নয়নের গতির সাথে মুছে যায় স্মৃতি।

পরিচালক মৈনাক বিশ্বাস ট্রামলাইনকে জানিয়েছেন, ‘স্থানীয় সংবাদ’-এর কলকাতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বহু শহর ও সময় সহাবস্থান থেকেই তৈরি হয় ছবির টানাপোড়েন। মৈনাকবাবু মনে করেন, আমাদের সমাজের এক বড় অংশ বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার বদলে এক ধরনের মানসিক পলায়নের মধ্যেই বেঁচে থাকে। তাই ছবির শেষভাগে যখন অতীন ও তার বয়োজ্যেষ্ঠ সঙ্গীর রাতভর যাত্রা ক্রমশ বাস্তবের সীমা অতিক্রম করে, তখন মনে হয় তারা হয়তো এক অসহনীয় বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মৈনাক বিশ্বাসের মতে, বিশ্বায়নের অভিঘাত ছবিতে সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও দ্রুত, নির্মম এবং প্রায়শই হিংস্র নগর পরিবর্তনের ফলে অনেক মানুষের মধ্যেই নির্লিপ্ততার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ‘স্থানীয় সংবাদ’ সেই মানসিক অবস্থাকেই পরাবাস্তবতার ভাষায় ধরতে চেষ্টা করেছে।
আজকের দিনে ‘স্থানীয় সংবাদ’ বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। শহর যখন ক্রমাগত নিজের স্মৃতি হারায়, যখন উন্নয়নের নামে উচ্ছেদকে স্বাভাবিক বলে মানিয়ে নেওয়া হয়, তখন শহরকে খুঁজে নিতে হয় মানুষের গল্প, তাদের স্মৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন দিয়ে।
