
এলজিবিটিকিউ। আত্মপরিচয়ের এক দীর্ঘ সংগ্রামের। এলজিবিটিকিউ আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রায়শই দৃশ্যমান সাফল্যগুলির কথা বলি, যেমন সমকামিতার আইনত স্বীকৃতি, প্রাইড মিছিলের বিস্তার, কিংবা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কুইয়ার প্রতিনিধিত্বের বৃদ্ধি। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়: এই আন্দোলনের প্রতিফল কি কুইয়ার সম্প্রদায়ের সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে? নাকি বৃহত্তর সমাজে যে শ্রেণীবৈষম্য ও জাতপাতের বিভাজন দৃশ্যমান, সেগুলিও এই পরিসরের মধ্যে বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে?
ভারতীয় সমাজে জাতপাত ও শ্রেণি কোনও বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়। এগুলি মানুষের শিক্ষা, ভাষা, সামাজিক পুঁজি, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতাকে নির্ধারণ করে। ফলে এলজিবিটিকিউ পরিচয়ও কখনও শূন্যস্থানে গঠিত হয় না। একজন উচ্চবর্ণ, ইংরেজি-শিক্ষিত, শহুরে সমকামী পুরুষের অভিজ্ঞতা এবং একজন দলিত, শ্রমজীবী, রূপান্তর বা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা।
কুইয়ার আন্দোলনের কর্মীদের সাথে কথা বললে বোঝা যায়, নানা বৈষম্য রয়েছে তাদের আন্দোলনে। এই বৈষম্যের অন্যতম প্রকাশ দেখা যায় আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বে। মূলধারার মিডিয়া বা কর্পোরেট-সমর্থিত ‘প্রাইড’ উদযাপনে সাধারণত যে মুখগুলি সামনে আসে, তারা প্রায়শই উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং তুলনায় সামাজিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ। তাদের ভাষা, জীবনযাপন এবং রাজনৈতিক দাবি অনেক সময় প্রান্তিক কুইয়ার মানুষের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পায় স্বীকৃতি এবং দৃশ্যমানতা, কিন্তু বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান বা সামাজিক নিরাপত্তার মতো শ্রেণিগত প্রশ্নগুলি প্রান্তে সরে যায়।
বিশেষত রূপান্তর ও তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট। ভারতীয় তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার। পরিবার থেকে বহিষ্কার, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্যের ফলে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি বা যৌনশ্রমের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। অথচ মূলধারার এলজিবিটিকিউ আলোচনায় তাদের কণ্ঠস্বর প্রায়শই অনুপস্থিত। তাদের জীবনসংগ্রামকে যে একই সঙ্গে শ্রেণী সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, সেটি আড়ালে থেকে যায়।
জাতপাতের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দলিত ও আদিবাসী কুইয়ার মানুষদের অনেকের মতেই যে মূলধারার এলজিবিটিকিউ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে উচ্চবর্ণের অভিজ্ঞতাকে সার্ব্বজনীন অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে জাতভিত্তিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা প্রায়শই অদৃশ্য হয়ে যায়। এই প্রসঙ্গে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বিখ্যাত প্রশ্ন ‘ক্যান দ্য সাবাল্টার্ন স্পিক?’ (প্রান্তিক মানুষ কি কথা বলতে পারে?) বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কারণ এখানে প্রশ্ন কেবল কথা বলার নয়; প্রশ্ন হল কার কথা শোনা হয়, কার অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়, এবং কে আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠে।
কর্পোরেট প্রাইড সংস্কৃতির উত্থানও এই শ্রেণিগত বিভাজন বিশেষভাবে দৃশ্যমান। বড় বড় সংস্থা যখন রামধনু পতাকা ব্যবহার করে নিজেদের অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ‘ইনক্লুসিভ’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে, তখন অনেক সময় কুইয়ার অধিকারের প্রশ্ন বাজারের ভাষায় অনূদিত হয়। কিন্তু কর্পোরেট অফিসের অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির সুবিধা সাধারণত সেইসব মানুষই পান, যাদের কাছে প্রথম থেকেই উচ্চশিক্ষা ও আনুষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ ছিল। প্রান্তিক রূপান্তর, দলিত বা শ্রমজীবী কুইয়ার মানুষের কাছে এই অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি অনেক সময় অধরাই থেকে যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: সমকামী, রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মুক্তি কি শুধুই পরিচয়ের স্বীকৃতির মাধ্যমে সম্ভব, নাকি এর সঙ্গে শ্রেণী ও জাতভিত্তিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকেও যুক্ত করতে হবে? সমাজভিত্তিক এবং আন্তঃসংযোগমূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সাধারণত দ্বিতীয় পথের কথা বলে। তাদের মতে, যৌনতা বা লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে নিপীড়নকে শ্রেণী ও জাতপাতের প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। কারণ একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের বঞ্চনার শিকার হতে পারেন।
সমাজকর্মী দেশপ্রিয় মহাপাত্রর মতে, আন্দোলন যতই অধিকারের ভাষায় কথা বলুক না কেন, তার কেন্দ্র এখনও মূলত শিক্ষিত এবং তুলনামূলকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত কুইয়ার মানুষদের ঘিরেই আবর্তিত হয়। ফলে নালিকুলের একজন দলিত রূপান্তর নারী যিনি কাঠের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, কিংবা সিঙ্গুরের সেই রূপান্তরকামী পুরুষ যিনি কখনও কলকাতা প্রাইডের নামও শোনেননি এবং পরিবারের হাতে সংশোধনমূলক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, বা বহরমপুরের সেই রূপান্তর পুরুষ যে গড়িয়াহাটে পণ্য বিক্রি করে নিজের লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন – তাঁদের অভিজ্ঞতা মূলধারার আলোচনায় খুব কমই জায়গা পায়। কলকাতা শহরেও অনেক মধ্যবিত্ত পাড়ায় রূপান্তর বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রায়ই বাড়ি ভাড়া পেতে সমস্যা হয়, এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রায়শই পুলিশি হেনস্থার শিকার হন। ফলে একজন উচ্চ-মধ্যবিত্ত শহুরে সমকামী পুরুষ এবং একজন দলিত রূপান্তর নারীর ‘কুইয়ার’ পরিচয় একই ছাতার তলায় এলেও, তাঁদের জীবনযুদ্ধ এক নয় – এদের গল্পে প্রাধান্য পায় শ্রেণিগত বঞ্চনা, জাতপাতের বৈষম্য এবং গ্রামীণ প্রান্তিকতার বাস্তবতা।
দেশপ্রিয় মনে করেন, কেবল দৃশ্যমানতা বা আইনি স্বীকৃতি অর্জন করলেই মুক্তি সম্পূর্ণ হয় না। আন্দোলনকে এমন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে, যা প্রান্তিক মানুষদের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রে রাখবে এবং দলিত, আদিবাসী এবং শ্রমজীবী কণ্ঠস্বরকে সমান জায়গা দেবে। এই কারণেই কুইয়ার রাজনীতিকে কেবল পরিচয়ের রাজনীতি হিসেবে দেখলে চলবে না – শ্রেণী সংগ্রাম, জাতিপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই এবং সামাজিক ন্যায়ের বৃহত্তর প্রশ্নগুলির সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। নাহলে আন্দোলনের ভেতরেই এমন এক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হবে যেখানে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর আবারও প্রান্তেই থেকে যায়।
নাৎসি জার্মানির প্রেক্ষিতে মার্টিন নিমোলারের লেখা বিখ্যাত রাজনৈতিক কবিতা ‘প্রথম তারা এসেছিল’-তে দেখা যায়, একের পর এক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের ওপর অত্যাচার নেমে এলেও কবিতার বক্তা প্রতিবাদ করেননি। শেষ পর্যন্ত যখন নাৎসিরা তাঁর দোরগোড়ায় আসে, তখন প্রতিবাদ করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না। এই কবিতার সূত্র ধরেই দেশপ্রিয় জানালেন যে দলিত, আদিবাসী, শ্রমজীবী, সমকামী, রূপান্তরকামী, তৃতীয় লিঙ্গ বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের ওপর হওয়া আক্রমণকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই লড়াইগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
কুইয়ার মুক্তির প্রশ্ন এখন সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রেণী সংগ্রাম এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। যতদিন পর্যন্ত বৃহত্তর সমাজে জাতপাত ও শ্রেণীবৈষম্যের কাঠামো অটুট থাকবে, ততদিন এলজিবিটিকিউ পরিসরও তার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারবে না। কুইয়ার রাজনীতিকে কেবল পরিচয়ের স্বীকৃতির রাজনীতি নয়, তাকে সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক সমতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠতে হবে। আরও সংঘবদ্ধ, আরও সংহত এবং আরও আন্তঃসংযোগমূলক একটি আন্দোলনই পারে প্রান্তিকের ভেতরে প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠস্বরকে সামনে নিয়ে আসতে। একটি সত্যিকারের মুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে তখনই, যখন কুইয়ার অধিকার, শ্রেণী সংগ্রাম এবং মানবিক মর্যাদার লড়াই একে অপরের হাত ধরে এগোবে। সেই পথ কঠিন, কিন্তু সেই পথেই ভবিষ্যতের আশা। এমন এক ভবিষ্যতেই রামধনুর সত্তা সার্থক হয়ে উঠেবে বলে মনে করেন দেশপ্রিয়।

ছবি সৌজন্য: কিঞ্জলি দাস