লাল ইটের সুউচ্চ মিনারটি দূর থেকেই চোখে পড়ে। বড়বাজারের কোলাহল, ভিড় আর হর্নের শব্দের মাঝেও যেন সে এক অন্য সময়ের দূত। ভিতরে ঢুকলে আরও স্পষ্ট হয় সেই অনুভূতি। উঁচু ছাদ, রঙিন কাচের জানলা, পিতলের ঝাড়বাতি আর সারি সারি কাঠের বেঞ্চ, সব মিলিয়ে যেন কলকাতার বুকে হঠাৎ খুলে যায় পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের ইহুদি ঐতিহ্যের এক জানালা। ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ। একসময় যার প্রার্থনাকক্ষে ভরে উঠত বাগদাদি ইহুদিদের কণ্ঠস্বর, আজ সেখানে নেমে আসে গভীর নীরবতা।
এই নীরবতাই যেন কলকাতার ইহুদিদের ইতিহাসের রূপক। এজরা পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, শতাব্দীপ্রাচীন সিনাগগ, নিউ মার্কেটের নাহুমসের বেকারি কিংবা ইহুদি গার্লস’ স্কুল, সবই কলকাতার কসমোপলিটান চরিত্র গড়ে ওঠার ইতিহাসে ইহুদিদের অবদানের সাক্ষী।

ইহুদিদের কলকাতায় আসার ইতিহাস মূলত অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে। কলকাতার অধিকাংশ ইহুদি ছিলেন বাগদাদি ইহুদি – ইরাক, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ী পরিবার। তাঁদের অনেকেই বাগদাদে অটোমান শাসনের অত্যাচার এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি খুঁজতে ব্রিটিশ ভারতের বাণিজ্যকেন্দ্র কলকাতায় চলে আসেন।
ইহুদিদের গল্প বলতে গেলে প্রথমেই্র বলতে হয় এজরা পরিবারের কথা। ডেভিড জোসেফ এজরা এবং তাঁর উত্তরসূরিরা ছিলেন কলকাতার নগর-পরিকল্পনারও অন্যতম নির্মাতা। শহরের বহু পরিচিত বাড়ি, বাজার এবং বাণিজ্যিক ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের নাম। আজও নিউ মার্কেট সংলগ্ন এজরা স্ট্রিট, এজরা ম্যানশন কিংবা নানা ঐতিহাসিক ভবন সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে।

কলকাতায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে তিনটি ঐতিহাসিক সিনাগগ বেথেল সিনাগগ, ম্যাগেন ডেভিড সিনগগ এবং নেবেহ শালম সিনাগগ।




লাল ইটের সুউচ্চ মিনার নিয়ে ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগ আজও কলকাতার আকাশরেখায় আলাদা করে চোখে পড়ে। ভিতরে ঢুকলে দেখা যায় ইউরোপীয় স্থাপত্য, রঙিন কাচের জানলা, বিশাল ঝাড়বাতি আর কাঠের বেঞ্চের এক অনন্য পরিবেশ। আশ্চর্যের বিষয়, শহরে ইহুদি জনসংখ্যা প্রায় বিলুপ্ত হলেও এই প্রার্থনালয়গুলি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে এবং কলকাতার ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত।
শিক্ষাক্ষেত্রেও ইহুদিদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘জুইশ গার্লস স্কুল’ বহু দশক ধরে কলকাতার অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার সময় মূল উদ্দেশ্য ছিল ইহুদি কন্যাদের শিক্ষা, কিন্তু পরে এটি বহু সম্প্রদায়ের ছাত্রীর জন্য উন্মুক্ত হয়ে ওঠে।

শহরের রসনার ইতিহাসেও রয়েছে ইহুদি ছাপ। একসময় নিউ মার্কেটের আশপাশে ইহুদি বেকারি ও ডেলিক্যাটেসেন ছিল জনপ্রিয়। শাবাত বা ইহুদি উৎসবের সময় বিশেষ রুটি, কেক এবং নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হতো। সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে পরিচিত উত্তরাধিকার আজও বয়ে নিয়ে চলেছে ‘ ‘নাহুম এন্ড সন্স’। ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বেকারিটি তার প্লাম কেক, ব্রাউনি, ম্যাকারুন এবং ঐতিহ্যবাহী বেকড খাবারের জন্য এখনও সমান জনপ্রিয়। বড়দিন এলেই নাহুমসের সামনে লম্বা লাইন যেন কলকাতার নিজস্ব এক উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে। শাবাত বা অন্যান্য ইহুদি উৎসব উপলক্ষেও একসময় বিশেষ রুটি, কেক এবং নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হতো। আজ সেই সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ আর শহরে নেই, কিন্তু নাহুমসের কাউন্টার থেকে ভেসে আসা মাখন আর কিশমিশের গন্ধ যেন কলকাতার ইহুদি অতীতের এক জীবন্ত স্মৃতি।


১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এবং স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলিতে কর্মসংস্থান ও পারিবারিক কারণে অধিকাংশ ইহুদি পরিবার ইসরায়েল, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় চলে যান। ধীরে ধীরে যে সম্প্রদায় একসময় হাজারের ঘর ছুঁয়েছিল, তা আজ নেমে এসেছে কয়েক ডজন মানুষের মধ্যে। এখনও বড়বাজারের কিছু রাস্তার নাম, পুরনো প্রাসাদ, সমাধিক্ষেত্র, সিনাগগের নীরবতায় কিংবা কোনও বৃদ্ধ কলকাতাবাসীর স্মৃতিতে বেঁচে আছেন তাঁরা।
আজ যখন পরিচয়ের রাজনীতি বিশ্বজুড়ে প্রাচীর তৈরি করছে, তখন কলকাতার ইহুদি ইতিহাস আমাদের অন্য এক শিক্ষা দেয়। ইহুদিরা এই শহরকে সমৃদ্ধ করেছে, নতুন রং দিয়েছে এবংশহরের আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। তাঁদের উত্তরাধিকার এখনও এই শহরের ইট, পাথর আর স্মৃতির মধ্যে নীরবে বেঁচে আছে।