‘মন পবনের নাও’ একটি অতি-আশ্চর্য তথ্যচিত্র। ছবি হিসেবে যেমন, তেমনি নির্মাণগত দিক থেকেও। প্রায় এক ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এই ছবিটি গত রবিবার, ৩১ মে, ‘বারো পার্বণ’-এর উদ্যোগে বুক কেবিনের কক্ষে প্রদর্শিত হয়, যা জনাচল্লিশেক দর্শককে অবিরল মোহিত করে রেখেছিল।
এ ছবির দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র মিমলু সেন ও পবন দাস বাউল। সাতসমুদ্র পেরিয়ে সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে তাঁরা ফ্রান্সের মতো প্রথম বিশ্বের একটি দেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, মূলত সেই কাহিনিই এই ছবির উপজীব্য।
গোটা ছবিটাই ফ্রান্সে শুট করা হয়েছে— প্যারিসে মিমলু ও পবনের বাসায় এবং আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ছবিতে একটি বিশেষ নীলাভ টোন ব্যবহার করা হয়েছে, যা ছবিটির অন্যতম সম্পদ।
মিমলু সেনের আদি নিবাস শিলংয়ে। সেখান থেকে কলকাতা, পরে দিল্লি ছুঁয়ে প্যারিস পৌঁছনোর গল্পটা যেন এক রূপকথা! যদিও সেই যাত্রাপথের মধ্যেই ছিল নকশাল রাজনীতির ঝোড়ো হাওয়া, যার প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে তাঁকে জেলবন্দি হতে হয়েছিল। খোলা মনের মিমলুর পক্ষে তার ঠিক পরেই সহবন্দি কালীঘাটের যৌনকর্মীদের নিয়ে চিত্রনাট্য ‘ব্ল্যাক মারিয়া’ লেখা-টা যেন খুব স্বাভাবিকই ছিল!

রঙিন ও বিচিত্র মিমলুর পাশে পবনের জীবন কিন্তু অনেকটাই সরল, ঠিক যেমন তাঁর মন। পবনও আর-এক উজানপথ বেয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা হয়ে একদা প্যারিস পৌঁছেছিলেন একজন পারফর্মার হিসেবে। তারপর দুজনের দেখা, প্রেম, ভালোবাসা এবং একসঙ্গে পথচলা। এই প্রেম ও লড়াইয়ের কাহিনিকেই অকৃপণ যত্নে লেন্সবন্দি করেছেন ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়।
প্রায় একক উদ্যোগেই এই ছবিটি নির্মাণ করেছেন ল্যাডলী। পোস্ট-প্রোডাকশনে ছিলেন স্বাতী চক্রবর্তী এবং সম্পাদনায় ইন্দ্রজিৎ দাশ।
এই লেখা শেষ করব ছবিটির দুটি অসাধারণ দৃশ্যের উল্লেখ করে।
প্রথম দৃশ্যটি একটি পরিত্যক্ত গির্জার অন্দরে। সেখানে মিমলু, পবন এবং জনাকয়েক মিউসিশিয়ান বেশ কিছু মানুষের সামনে পরিবেশন করছেন তাঁদের সংগীত। ল্যাডলী তাঁর ক্যামেরায়, প্রায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আলোয়, ধরে রাখছেন সেই সমগ্র দৃশ্যপট। যেন কোনো আদিম আলোকরশ্মি এসে গির্জাঘরের রঙবাহারি কাচ ভেদ করে পবনের মুখের উপর এঁকে দিচ্ছে ইউক্লিডের রঙিন জ্যামিতিক নকশা!

দ্বিতীয় দৃশ্যে মিমলু সেনের হাত ধরে, পরিচালকের ক্যামেরায় দর্শক এবং আমরা সবাই পৌঁছে যাই ত্রুবাদুরদের আদিম আস্তানায়— দক্ষিণ ফ্রান্স ও স্পেনের সীমান্তবর্তী সেই স্মারকভূমিতে— যেখানে ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির স্তরগুলো সব যেন একাকার হয়ে যায়!
শাবাশ, ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়! সমবেত আমরা যারা এই ছবিটি দেখলাম, তারা একে বহুদিন মনে রাখব। আর যাঁরা এখনও দেখেননি তাঁদের বলব, একটু উদ্যোগী হয়ে ছবিটি দেখার আয়োজন করুন। কথা দিচ্ছি, নিরাশ হবেন না। বরং এক বিরল জীবনযাত্রা, একটি অন্যবিধ প্রেমকথা এবং এক অসাধারণ চলচ্চিত্র-নির্মাণের অভিজ্ঞতা সঙ্গী হয়ে থাকবে।
ছবি সৌজন্যে: ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়।