সৌম্যা ঘোষ

সকাল।
বর্ষার জলে থইথই গোটা রাস্তা। দেখলাম, একটি মেয়ে কোনো রকমে ছাতাটা সামলে বাসে উঠল। আর একজন কর্পোরেট, তার ওপর গর্ভবতী। ছোট সংস্থা হওয়ায় যাতায়াতের তেমন সুবিধা নেই তাঁর অফিসে।
হঠাৎ কানে এল,
‘ভাড়া লাগছে না দিদি, আধার কার্ডটা দেখালেই হবে।’
সরকারি বাসে যে খুব উঠি, ব্যাপারটা একদমই উল্টো; আর খুব একটা সরকারি বাস যে চোখে পড়ে, তাও নয়।
উল্টোডাঙা মোড়ে গিয়ে বাসটা দাঁড়িয়ে… প্যাসেঞ্জার তুলতে হবে। ওই গর্ভবতী মহিলা বারবার ঘড়ি দেখছেন। ঘড়িতে তখন ৯:৪৫। অফিসে রেজিস্টার করতে হবে ১০ টাতেই। কিছু করার নেই! আজও স্যালারি থেকে টাকা কাটবে।
‘রাতে দেরি হলে চিন্তা কোরও না। আমি ক্যাব করে নেবো।’
কথাবার্তায় আরও বোঝা গেল তিনি একজন ‘সিঙ্গেল মাদার’!

বাসটা দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই! প্রায় আট-দশ মিনিট! ইতিমধ্যে যাত্রীদের শোরগোল পড়ে গেছে। কেউ-কেউ রেগে নেমেও যাচ্ছেন। মহিলাটির কিছুই করার নেই, অপেক্ষা ছাড়া…
বাসটা রেলব্রিজের তলা দিয়ে যাচ্ছে। দেখলাম, অজস্র পোস্টার। ‘আয়া সেন্টার’, ‘কাজের সন্ধান চাই’… ভিড়। সারি সারি ছাতায় ঢাকা মাথা। রেলব্রিজ থেকে ‘টপ-টপ’ করে জল পড়ছে আর রাস্তায় কাদাজলের স্রোত!
কিছু পোস্টারের দিকে সহজেই চোখ চলে গেল। ‘বডি ম্যাসাজ’— পোস্টারে বেশিরভাগ মেয়েদের ছবি। বক্ষযুগল সাদা কাপড়ে মোড়া, উপরের অংশ নগ্ন…

একটু আগেই এক মহিলার ভাড়া নিলেন না কন্ডাক্টর। সম্মান দিলেন মহিলাদের। আর নেমেই এইসব! আসলে, আজও সমাজের কাছে মেয়েরা জামা-কাপড়-জিনিসের মতোই ভোগ্যপণ্য। তাই ইচ্ছেমতো, তাঁকে পুজো করা যায় এবং ধর্ষণও করা যায়।
ক’দিন আগেই ইউটিউবে বিদেশের একটি প্রদর্শনী দেখেছিলাম। একজন নগ্ন মহিলা, সবাইকে আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন… প্রথমদিকে সবাই কি মিষ্টি, ক্রমশ, মানুষগুলোর ভেতর থেকে পশুরা বেরিয়ে আসছে… ছুরি, ব্লেড… কিছুই বাদ গেল না একটা শান্ত মেয়েকে রক্তাক্ত করতে…
যাই হোক,
এতক্ষণে বাসটা এগোচ্ছে…
একটা মেয়ের দিকে শ্যেন-দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটা মধ্যবয়স্ক লোক…
দিন ক্রমে সন্ধ্যা হয়। রোজের মতই।
ফেরার সময়। রাত ৮:৩০। বেশ অনেকটা পথ… চোখটা প্রায় বুজে এসছে। পাশের সিটের একজনের ফোন বেজে উঠল। এও আরেক একলা মেয়ে। ফোনের ওপারের আওয়াজটা বেশ জোরেই আসছে। কথায় গ্রাম্য টান…
—‘ফিরছিস?’
—হ্যাঁ মা। তোমার ওষুধ আজ পাইনি গো। কলকাতায় আজ খুব বিস্টি। এই বাসটা চলে গেলে টেন পেতুম না…
রাতে, একলা মেয়ের দেরিতে বাড়ি ফেরা নিয়ে এই একই চিন্তা ছিল সত্তর দশকেও।
মৃণাল সেনের ‘একদিন প্রতিদিন’, একটা রাতের ঘটনা। মেয়েটি উপার্জনক্ষম হলেও ‘রাত’ এর জন্য কেউ কিন্তু কথা বলতে ছাড়েনি।


শুধু তাই কেন, ‘মহানগর’! ১৯৫০-এর দশকের কলকাতা। রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ মাধবী মুখোপাধ্যায়। সংসারের আর্থিক অবস্থার জন্যই সকলের অমতে চাকরি করতে আরম্ভ করে…
কিংবা, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘মহানগর’ গল্পের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মেয়েটার কথা! নগদ পয়সার পাকযন্ত্রে মেয়েদের পরিণতি কি নিছক মেয়েমানুষে!
সুভাষের ‘বধূ’কে ঘিরে নগরজীবনের অনিশ্চয়তায় বোঝা যায় প্রতিশ্রুতি ভাঙা আজ কত সহজ…!
কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয়, আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও মেয়েদের নিয়ে এই চিন্তাটা একই জায়গায়! সময়ের শুধু একটু হেরফের…
আমার কানে হেডফোন, ‘এ বি সি ব্লকের গোলক ধাঁধায় তোমায় পাচ্ছি না/সারি সারি সব বাড়ি যেন সারবাধা সব সৈন্য/সব এক রঙ সব এক ধাঁচ তুমি কোথায় থাকো অনন্য?’
মৌসুমী ভৌমিকের গানেও এক একলা মেয়ে তার প্রেমিককে খুঁজে চলেছে শহরের গোলক ধাঁধায়, কিছুতে সন্ধান পাচ্ছে না…
বাসটা খুব জোরে একটা ব্রেক কষল!
বাসে-বাসে রেষারেষি!
ঘুমের ঘোরটা খুব বিচ্ছিরিভাবে কেটে গেল।
মাথায় ঘুরছে সকালের কথাটা…
‘রাতে দেরি হলে চিন্তা কোরো না। আমি ক্যাব করে নেবো’…
No Comment! Be the first one.