৩য় ও শেষ পর্ব
(কথা বলে লিখেছেন সৌম্যা ঘোষ)

অজয়দা মানে প্রখ্যাত লেখক ও প্রচ্ছদ শিল্পী অজয় গুপ্ত। আমরা একসঙ্গে সোভিয়েত দেশ পত্রিকায় চাকরি করতাম। তো, অজয়দা নবারুণদার থেকে আরও দশ-এগারো বছরের বড়। মানে, আমি প্রায় কুড়ি-একুশ বছরের ছোট।
কিন্তু, অজয়দা’ও আমার সঙ্গে বন্ধুর মতোই মিশতেন। এটা কিন্তু নবারুণদা’র জন্যই সম্ভব হয়েছে। এই গালাগালি দিয়ে, গল্প-মজা করে নবারুণ দা-ই আমাদের সম্পর্কটাকে সহজ-সরল করে দিয়েছিল…
আমাদের সঙ্গে কাজ করতেন কবি সিদ্ধেশ্বর সেন। মোটে পয়সা খরচ করতে চাইতেন না তিনি। তো, সিদ্ধেশ্বর সেনের সঙ্গে বিজন ভট্টাচার্য, মহাশ্বেতা দেবীর আলাপ ছিল। তাই,
নবারুণদা-র অফিস জয়েন করার প্রসঙ্গে অনেক দিন আগে থেকেই সিদ্ধেশ্বর সেন ওঁকে বলেছিলেন— ‘তুমি জয়েন করো, তোমাকে একদিন খাওয়াবো’।
জয়েন করার পর মাসখানেক হয়ে গিয়েছে… কিন্তু কিছুতে সেই খাওয়ানোর কথা বলেন না! হঠাৎ একদিন বললেন খাওয়াবেন…তারপর দেখলাম,
অফিসের বাইরে একটা মুড়িওলা বসতো। রোজ সেখান থেকে পাঁচ টাকার মুড়ি কিনতেন সিদ্ধেশ্বরদা। আর, সেদিন নবারুণদা-কে খাওয়াবেন বলে, সাত টাকার মুড়ি কিনেছিলেন!…এই হল তবে খাওয়ানো! মজা করেই কিছুটা চটে গিয়েছিল নবারুণদা…
সিদ্ধেশ্বর সেন প্রতিদিন অফিসে দেরি করে আসতেন। আমাদের বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন প্রবীণ প্রদ্যুৎ গুহ।
এমনই একদিন দেরি করে এসেছেন। নবারুণদা বলল— ‘আজকে দেরি হল কেন?’
প্রদ্যুৎবাবুও ধরেছেন। উপায় নেই দেখে সিদ্ধেশ্বর বললেন— আসলে ৮:৩০-র অনেক আগেই এসে গেছিলাম, কিন্তু, রাস্তাটা পার হতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল, এই আরকি! আমরা এরপর হাসব না কাঁদব-ঠিক বুঝতে পারছিলাম না…
নবারুণ’দা-র থেকে কম বয়সী ছেলেরাও ছিল অফিসে। কিন্তু, নবারুণদা-র মতো এত প্রাণবন্ত ছিল না কেউই! তাই সবাই ওঁকে ভালোবাসতো।
নবারুণদাও আমাকে বলত, ‘তুই সবসময় আমার সঙ্গে থাকবি, যে কোনও জায়গা থেকে আঘাত আসতে পারে, তোকে প্রোটেক্ট করতে হবে।’
আমি বলতাম, ‘কে কে করতে পারে? আঘাত?’ তাতে নবারুণদার মজা মেশানো মন্তব্য,
‘এই তো অজয়ের মতো একটা লুম্পেন ডাকাত আমাদের অফিসে কাজ করে!’ আমরা হো-হো করে হেসে উঠতাম…
নবারুণদা’র হারবার্ট নিয়ে ছবি হল। পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়। সবাই জানে, নবারুণদা আনন্দবাজারে কোনওদিনও লিখত না। কিন্তু ফিল্মের প্রমোশনের জন্য যেতে হয়েছিল। আমাকে হঠাৎ ফোন। বলল,
‘বিপদে পড়েছি! একবার এবিপি আনন্দে যেতে হবে বুঝলি।’
বললাম, ‘যাবে। তো কি হয়েছে! তোমার গল্প নিয়ে তুমি বলবে…’
দ্বিধা থাকলেও নবারুণদা গেছিল। পরে ঘটনাটা বলল এভাবে,
…ওদের পাঠানো গাড়িতে উঠেছে। ‘গাড়িটায় আমাকে তোলার পর কাকে তুলেছে বল তো?’
আমি অবাক হয়েই বললাম, কাকে?
বলল, ‘কোয়েল মল্লিক। গাড়িতে উঠতেই আমি বলেছি, তুমি এত রোগা কেন?
মনে হচ্ছে, যেন কিছু খাও না!’
আমি বললাম, এরকম বাজে প্রশ্ন ফিল্ম স্টারকে কেউ করে! আর কথা পেলে না!
কোয়েলও না কি প্রশ্নটা শুনে অস্বস্তিতে পড়ে যান। বলেছিলেন ‘আসলে, আমি তো কম খাই…’
নবারুণদা তারপর আবার না কি বলেছে, ‘খাবে। এত কম খাও কেন!’
এসব শুনে আমি আবার বুঝিয়েছিলাম, ক্যামেরায় তো মোটা লাগবে। তাই কম খায়। রোগা কি মোটা… ওইটুকু মেয়ে, তুমি দেখতে গেছ কেন!
এরকমই প্রচন্ড সহজ-সরল ছিল নবারুণ দা। আসলে আমাদের জীবনটাই সব মিলে ছিল অনেক সরল…
(শেষ)