কৌশিক গুহঠাকুরতা

সে ছিল একদিন আমাদের কৈশোরে কলকাতা/ খেলেছিল বলেই সবার কিনেছিল মাথা…তখন জ্যৈষ্ঠ মাস; দীর্ঘ তপ্ত দিন; তৃষিত হৃদয় তখন আবেগে আকুল; কারন রজনী নিদ্রাহীন; না, কোনো অগ্নিবাণ নয়- সেই সুদূর মধ্য আমেরিকার এক প্রাচীন সভ্যতার দেশে মখমলি তৃণভূমির উপর এক চর্মগোলক ঘিরে কিছু ভীনদেশী মানুষের চোখ ধাঁধানো কেরামতির নিত্য সাক্ষী থাকার বাসনায় নিদ্রা গিয়েছিল নির্বাসনে। গোটা শহর তখন রোজ রাতে বোকা বাক্সে পাড়ি দেয় কালাপানির ওপারে। কেনই বা দেবে না? যে চর্মগোলকে পা না ঠ্যাকালে তাদের জাত যায় সেই তাকে ঘিরে বিশ্বসেরা বাজিকরদের যে উৎসব তার থেকে বঙ্গবাসী কেমনে থাকে বঞ্চিত? আর আমি? যৌবন হাতছানি দিচ্ছে -কাজেই বেঁচে ছিলাম বলেই কিনেছিলাম মাথা! উপরন্তু সদ্য বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোনোর পরীক্ষা সমাপ্ত -অখন্ড অবসর(আমরা তখনো বাজারের বীজমন্ত্র ‘প্রতিযোগিতা’ কায়মনোবাক্যে জপ করতে শিখি নি)…
প্রতি চার বৎসর অন্ত দুমাস ব্যাপী এই চর্মগোলক মহোৎসবকে ঘিরে বঙ্গদেশের ছিল স্বাভাবিক উন্মাদনা (বেরসিকেরা বলবেন আদেখলাপনা) কিন্তু সে বছরটা ছিল এক মাত্রাহীন আনন্দের খোরাক। কারন সে বছর প্রথম বোকা বাক্স মনুষ্যকৃত উপগ্রহের ল্যাজ ধরে আমাদের পৌঁছে দিচ্ছিল সরাসরি উৎসব প্রাঙ্গনে। কিন্তু সেটাই সব নয়। আমাজন নদীর ধারে সাম্বা নাচের দেশের পদগোলকের জাদুকরদের প্রতি এ শহরের বরাবরই একটা অন্ধ আনুগত্য ছিল। তার একটা প্রধান কারন অবশ্যই কৃষ্ণ মুক্তা, যে কিনা চর্মগোলকের রাজা, সে এবং তার নব রত্ন সঙ্গী সাথীদের ঘিরে তৈরী হওয়া রূপকথা। সেবার কিন্ত সেই আনুগত্যের দূর্গের প্রাচীরে বড়সড় ফাটল ধরেছিল। বর্হেস, সোলানাসের দেশ থেকে আগত এক নতুন রাজার অভিষেক ঘটেছিল আগের উৎসবেই। কিন্তু এইবার তার অশ্বমেধের ঘোড়া দিগ্বিজয়ে বেরিয়েছিল। তার প্রখর দীপ্তি গোটা পর্দা আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। বাকি সব ফিকে। যদিও এক বিড়ি খেকো ডাক্তার আর তার বৃদ্ধ জাদুকর সঙ্গী দেখাচ্ছিল কিছু সাম্বা নাচের ভেল্কী। আর ছিল সেজান গগ্যাঁ মাতিসের দেশের তিন বৃদ্ধ মাস্কেটিয়র। কিন্তু সবই তখন পানসে। চর্মচক্ষে দেখছি ইতিহাসের জন্ম। আর কি কিছু চোখে লাগে?

ওই দ্যাখো- লালমুখো বাঁদরের দল জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে..আজ বদলা নেওয়ার দিন! আজ সব তৃতীয় বিশ্ব আবার ফকল্যান্ডের পাশে। শ্বাসরোধ করে বসে আছি; উত্তেজনার পারদ চড়ছে;হঠাৎ হঠাৎ ঝলকে উঠছে সেই অতিমানবিক বাঁ পায়ের অপার্থিব কারুকার্য: কিন্তু আস্তে আস্তে ধৈর্য্য চ্যুতি ঘটছে; ওই ওই বুঝি জালে বল জড়াল! হৃদয়ের গতির ওঠা নামা যেন প্রতি মুহূর্তে বাড়িয়ে দিচ্ছে বয়স এক যুগ; এর মধ্যে যখনই শত্রুপক্ষ অতর্কিতে হানা দিচ্ছে প্রায় অরক্ষিত দুর্গে ক্ষনিকের জন্য স্তব্ধ হচ্ছে ধমনী ; কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত? এ তো কেবল রোমক দর্শকের নেশাসক্তির জোগান নয়, এ হল রণাঙ্গন, ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতি বিজিতের সদম্ভ প্রত্যাঘাত; এ যুদ্ধ হানাদারের বিরূদ্ধে লুন্ঠিতের জেহাদ! কিন্তু কই, যা ঘটার তা তো ঘটছে না! ঠিক তখনই শত্রুর ঘাঁটির বুকের মধ্য থেকে যেন হাওয়ায় ভর করে শূণ্যে ভেসে উঠল সেই খর্বকায় পেশীবহুল দেহ আর ঘন কুঞ্চিত কেশ আর যেন অলৌকিকভাবে সেই চর্মগোলক তাঁর মাথা ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে গেল… বাঁধ ভেঙে গল। আনন্দের প্লাবনে যখন ভাসছি ঠিক তখনই দেখলাম ওরা বলছে মাথা নয় হাত! সম্ভবত বিচারকের নজর এড়িয়ে শ্রেষ্ঠ কারিগর এবার চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে! যদিও মুখে বল্লাম এ সব লালমুখো বাঁদরদের কারসাজি তবু মনটা কেমন দমে গেল। নায়ক শেষে ফাঁকি দিয়ে জিতবে? ইতি গজের এই কলঙ্ক, এতো কাম্য নয়। ঝিমুনির মাঝেই চমকে উঠে দেখলাম সেই খর্বকায় প্রস্তর মূর্তি দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে শত্রুপক্ষের রক্ষণ ফালাফালা করে: শুরু হল সেই অবিশ্বাস্য দৌড়; চর্মচক্ষে এ কী অবলোকন করছি- এ কি মায়া না স্বপ্ন? মহাভারতে মহারথীদের কথন পড়েছিলাম, একা শত্রু সংহার করে তারা এগিয়ে যায়; মনে পড়ে গেল বিরাটের গোশালায় একা বৃহন্নলার যুদ্ধজয়; কিন্তু এ তো যোদ্ধা নয় এতো শিল্পী, এক অপরূপ নৃত্যরত ব্যালে নর্তক যার পদস্পর্শে ওই সাধারণ চর্মগোলক যেন হয়ে উঠেছে মহাদেবের সুবর্ণ গোলক, যার ফলে শত্রু নতমস্তক হয়ে লুটিয়ে পড়ছে পথপার্শে; যখন শেষ সৈনিক, এক কিংবদন্তি দুর্গরক্ষক, লুটিয়ে পড়ল তাঁর পদপ্রান্তে আর সেই চর্মগোলক জড়িয়ে গেল জালে তখন কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম; কারন আমি তো জানি কিসের সাক্ষী থাকলাম ; সেই মুহুর্তে জন্ম হল ফুটবলের ইশ্বরের; তাইতো শত্রু মিত্র সকলেই কুর্নিশ জানাল এক সঙ্গে এক সুরে…
কেমন ছিল আমাদের ইশ্বর? কোকেন মাদাকাসক্ত, মাতাল বেহিসাবি বেসামাল, নৈরাজ্যবাদী, বিলাসাসক্ত, ভোগী, প্রতিবাদী, উশৃঙ্খল ; তাতে কী এসে গেল? আমরা তো জানি যখন ব্যাঘ্রচর্মধারী গঞ্জিকা সেবনকারী নটরাজ তান্ডবে মাতেন তখন প্রলয় ঘটে; এ মহাবিশ্বের নবজন্ম ঘটে। ইশ্বর তো আমাদের মাঝেই পূর্ণতা পায়। তাই তো আমাদের ইশ্বরও গ্যালারিতে বসে শিশুর মতো উল্লাস প্রকাশ করতে পারে; পরিনতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক মন্তব্য করতে পারে; ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে মাতলামি করতে পারে; এই ভঙ্গুরতাই তাকে হৃদয়ে আসন দেয়….
একলা বারান্দায় বসে নক্ষত্রের হদিশ করছিলাম…খবর এসেছে সে নেই; মাত্র ষাট বছর এই গ্রহে কাটিয়েই সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল…চমকে উঠেছিলাম , নীৎশের সেই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায়; তারপর একটু হাসিই পায়; কিসের শোক? ব্যাক্তির মৃত্যু হয়, হয়ত বা ইশ্বরেরও। কিন্তু দিয়েগো তো কোনো ব্যাক্তির নাম নয়। কোনো ইশ্বরেরও নয়। দিয়েগো একটি আবেগের নাম। আবেগের কি মৃত্যু হয়?