সন্দিপা নন্দী

প্রথম পর্ব :
ঝাড়খন্ডের লাতেহার জেলায় অবস্থিত একটি সুন্দর পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র নেতারহাট। প্রায় ১১২৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামটি ঘন জঙ্গল, সবুজ উপত্যকা, ঝর্ণা ও শীতল আবহাওয়ার জন্য বিখ্যাত। নেতারহাট তার শান্ত পরিবেশ ও কম ভিড়ের জন্যও জনপ্রিয়। এখানে শহরের কোলাহল নেই, বরং আছে নিস্তব্ধতা, ঠান্ডা হাওয়া এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—যা মনকে প্রশান্ত করে। জায়গাটি ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ, তাই আমরা যেহেতু গরমকালেই রওনা দিচ্ছিলাম তার জন্য বেশ চিন্তিত ছিলাম। তবে বৃষ্টির আগমনে সেই চিন্তা নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
গত শুক্রবার রাতে হাওড়া থেকে চার বন্ধু ট্রেনে চেপেছিলাম। ব্যাস! ভোর ভোর পৌঁছে গেলাম রাঁচি। সেখান থেকে ঝাড়খন্ডের অফবিট নেতারহাট, গাড়িতে প্রায় চার ঘণ্টার রাস্তা। তার আগে কাছেই সকালের জলখাবার খেয়ে রাঁচির দুটি বিশেষ স্থান ঘুরে নিলাম – জগন্নাথ মন্দির ও ধুরওয়া বাঁধ। এই মন্দিরটি রাঁচি শহর থেকে প্রায় ১০–১১ কিলোমিটার দূরে ধুরওয়া অঞ্চলে অবস্থিত। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে পুরো রাঁচি শহরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। এছাড়া ধুরওয়া বাঁধের ঘন নীল জল পর্যটকদের আকর্ষিত করে।

এরপর শুরু হল আমাদের আসল গন্তব্য নেতারহাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা। দুই দিকে পাহাড়, ঘন জঙ্গল ও মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম দেখতে দেখতে চলেছি ‘ছোটনাগপুরের রানী’র কাছে। এখান থেকে বয়ে গিয়েছে কোয়েল নদী। ড্রাইভার সেখানে গাড়ি দাঁড় করালেন। কিছুক্ষণ সেই দৃশ্য উপভোগ করে ও ক্যামেরাবন্দি করে আবার চড়লাম গাড়িতে। নেতারহাটে আমাদের বুক করা হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গিয়েছে।
তাপমাত্রার পারদ তখন বেশ চড়েছে। কিন্তু ঘুরতে গিয়ে আর এক জায়গায় বসে থাকি কি করে! চটপট তৈরি হয়ে নেতারহাট বাজারে লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম গ্রামটি ঘুরতে। নেতারহাটের দর্শণীয় স্থানগুলির মধ্যে একটি হল পাইন ফরেস্ট। সে এক রোমাঞ্চকর বন। পাইনের ঘন জঙ্গল পেরোলেই উপর থেকে গ্রামের এক অপরূপ দৃশ্য ভেসে ওঠে। এরপর চলে গেলাম আপার ঘাঘরি জলপ্রপাত দেখতে। জলপ্রপাতটি বিশেষ নজর না কাড়লেও তার আশেপাশের দৃশ্য মোহময়ী।

তবে এই গ্রামটির প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার মনোমুগ্ধকর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। তাই আর দেরি না করে চললাম ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট থেকে সূর্যাস্ত দেখতে। ততক্ষণে আকাশ কালো হয়ে এসেছে। তাপের দাবদাহ আর নেই। তখন শুধুই ঠান্ডা হাওয়া। পথের দুধারে অজস্র ন্যাসপাতির বাগান দেখতে দেখতে পৌঁছালাম ম্যাগনোলিয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্য আকাশে মেঘের কারণে সূর্যাস্ত আর দেখা হল না। কিন্তু ওই ভিউ পয়েন্টে আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখেও মনটা আনন্দে ভরে উঠল।
এরপর ড্রাইভার দাদা আমাদের নেতারহাটের কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখালেন – শেলি হাউস (Chalet House নামে পরিচিত)। এটি নেতারহাটের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি ২০ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয়। জানতে পারলাম, এটি তখনকার বিহার- ওড়িশার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এডওয়ার্ড গেইট-এর উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল। এটি ছিল মূলত ব্রিটিশ অফিসারদের গ্রীষ্মকালীন বিশ্রামস্থল। এই বাড়িটি সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি দুতলা একটি ভবন। এর ঢালু ছাদ, কাঠের সিঁড়ি, বড় বারান্দা এবং ইউরোপীয় ধাঁচের নকশা একে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তোলে।শেলি হাউসটি চারপাশে ঘন পাইন ও শাল গাছের জঙ্গলে ঘেরা। শেলি হাউসের কাছে ফাঁসির মঞ্চটি এখনো রয়েছে। এছাড়া ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত নেতারহাট আবাসিক স্কুলটিও সকলের নজর কেড়েছে।

এসব দেখতে দেখতেই ফিরে এলাম হোটেলে। আর শুরু হল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। সে এক অপরূপ দৃশ্য। বৃষ্টির সন্ধ্যায় নিমেষে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে গেল গোটা গ্রামটি। পাইনের বনও তখন দৃশ্যমান নয়। এরপর বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যেটা ওই হোটেলে বসেই উপভোগ করলাম। দেখলাম বর্ষার পাহাড়। এরপর রাতে চার বন্ধু মিলে গল্প করতে করতে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি ঘুম দিলাম। সকালে আবার দীর্ঘ যাত্রা – ঝাড়খন্ডের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে।