
গত দু দিন অসম্ভব খাটনি গেছে। একটানা জার্নি।
উটি থেকে সারাদিন জার্নি করে ব্যাঙ্গালোর। সেখান থেকে আবার একটা ফ্লাইটে মালদ্বীপ। বিদেশ। রীতিমত ইমিগ্রেশান, ভিসা পেরিয়ে তবে আসা…
কিন্তু নীল সমুদ্র ঘেরা এই অদ্ভুত দেশে পা দিতেই সব ক্লান্তি ভ্যানিশ! ছিলাম উটির ঠান্ডা পাহাড়ে। এসে গেলাম গরম সমুদ্রের হাওয়ায়। তবু কোথায় যেন ম্যাজিক আছে…
দুপুর পেরিয়ে বিকেল তখন। সারা দুনিয়ার কত রকম মানুষ এখানে! নানা ভাষায় কথা বলছে সকলে…একসাথে স্পিড বোটে এলাম আমাদের আইল্যান্ডে…এর আগে, লাখ্যাদ্বীপে এমন জার্নি করেছিলাম…কিন্তু সে ছিল আরও ছোট স্কেলে…এ তো যাকে বলে, একেবারে, গালা…
নিকোনো আকাশের নীচে কি দীনা এই প্রিথিবী…মানিকের এ কথাটাই ফিরে ফিরে মনে পড়ছে…শ্রীলঙ্কা বা গোয়ার মতই এই দ্বীপ…নিজেদের ঘরে উঠে গোছগাছ করলাম। ছোট্ট দু কামরার ঘর। দু দিনের ক্লান্তি মুছেই গেলাম স্ন্যাক্স করতে বিকেলে তারপর…

বার সংলগ্ন সমুদ্রের ধারে তখন গান গাইছেন এক বিদেশি তরুণী…চারপাশে ছড়িয়ে বসে নানা দেশের মানুষ। কেউ মদ্যপান করছেন তো কেউ কফি। দূরের অন্য দ্বীপেও তখন গান বাজছে…শব্দ ভেসে আসছে…গুলিয়ে যাচ্ছে, কোনটা আমার দেশ..
খুব চিন্তায় ছিলাম, নেট পাব তো। আমাকে তো কাজ করতে হবে। লেখা, ছবি পাঠাতে হবে। দেশের বাইরে, তবু নেট পেলাম ঠিকই। ফোন যদিও বন্ধ। একমাত্র ওয়াটসাপ কলই ভরসা…
সন্ধ্যা নামছে সমুদ্রে। বড় শান্ত হয়ে আছে মন। গাছপালা ঘেরা এ দ্বীপ যেন কিছুটা শান্তিনিকেতনের মতও। একবার টাকা দিয়ে প্রবেশ করলে, তারপর যত খুশি খাও…বারবার কেউ টাকা চাইবে না..এই ব্যপারটা অদ্ভুত লাগল। টাকাটা নেহাত কম না। কিন্তু এই ব্যবহার তো আমার দেশে দেখি না! টাকা দিয়েও সেখানে থাপ্পর খাওয়াটাই দস্তুর!

ডিলানের অনুবাদে সুমন বিচ্ছেদের গানে লিখেছিলেন, নির্জন সৈকতে ওড়ে সিগারেটের ছাই। ডিলান যদিও লিখেছলেন, একা পিয়ানো রাখা সৈকতে…সুমন বদলে দিলেন ইমেজটা। কারণ এই যে আমি একা বাঙালি, এসেছি কত দূর থেকে…আমার এই নির্জন সৈকতে এসেই তো একা লাগবে, মনে পড়বে, প্রেম ভেঙে যাওয়া, তারপর? যাকে ভালোবাসি, সেই মেয়েটিকে, কি করছে সে এখন? কলকাতায়? অফিসে? বিকেল নামছে, ওই তো তাকে দেখছি রাস্তা পেরোতে…ঘাম মুছলেন তিনি দিনমানের…ভাবতে ভাবতে তো
অনিবার্যভাবেই, আমার ঠোঁটে উড়বেই সিগারেটের ধোঁয়া…
আমার এক মামা, রাজীব মামা, বহু বছর এখানে চাকরি সুবাদে আছেন। তার সূত্রেই এলাম আমরা এখানে। কি করে যে হাজরায় বড় হওয়া ছেলে, এতগুলো বছর এখানে থেকে গেলেন! দেখা হল, ওঁর সাথেও…
অনেকদিন হয়ে গেল কলকাতায় নেই। নানা খবর ঠিকই আসছে যদিও। ওই যে, ডিজিটাল দুনিয়া। অনীক দত্ত থেকে শুভেন্দু-মমতা কেউ বাদ নেই। তবু সচেতন ভাবে, সেসব থেকে দূরে আছি ক’টা দিন…

অনেকক্ষণ শুয়েছিলাম সমুদ্রের ধারে চেয়ারে। সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ। সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল। দীগন্তে অন্ধকার। দূরে আলো জ্বলে আছে। কি আছে? ওপারে? মহাসিন্ধুর ওপারে? একটা বড় কচ্ছপ ভেসে চলে গেল সামনে দিয়ে। কোথায় চলেছে সে? কোথা থেকে আসছিল সে? কোন দেশ? শুধু ওর উঁচু পিঠটা ভেসে আছে জলের ওপরে…
মহাকাল চলেছে। আমরাও এগিয়ে চলব। আবার আমাদের ফিরতে হবে রোজের জীবনে। কিন্তু এই যে এতটুকু একটা আধ্যাত্মিকতার বোধ পেলাম আবার, তা নিয়েই ফিরব। কত মানুষ হারিয়ে গেলেন, কত নতুনদের সাথে আবার আলাপ হবে। সেই মানিকের কথাটাই মনে পড়ছে, নিকোনো আকাশের নীচে কি দীনা এই দুনিয়া!…এ জীবন নিয়ে কি করব? কি করতে হয়?
