
নাটক দেখিস? উৎপল দত্তের আজকের শাজাহান নিয়ে কোনো আইডিয়া আছে? প্রশ্নকর্তার নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ।
সালটা ২০০৭। এক সাংবাদিক দাদা আমাকে বলেছিল, দেখা করতে। ইন্দ্রানী পার্কের বাড়িতে। ঠিক বিকেল ৫টায় পৌঁছেও গেছিলাম। চা-টা চলে এসেছিল, তারপর ঘরে ঢুকলেন ঋতুদা। প্রথম প্রশ্ন, আলমোদোভার না এঞ্জেলোপৌলস, নাকি সাউরা – কে বেশি পছন্দের চিত্রনির্মাতা।একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। এই প্রশ্নটা আগে অন্য রকম ভাবে ফেস করেছি। সেখানে চয়েস থাকত, সত্যজিৎ রায় না ঋত্বিক ঘটক? আসলে ঋতুদা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক দিয়ে শুরু করেছিলেন।
কর্মসূত্রে আমার প্রাক্তন কাজের জায়গায় এই তিন ইউরোপীয় পরিচালকের বেশ কিছু সিনেমা গত কয়েক বছরে দেখানো হয়েছে। সাদা মনে বললাম, তিনজনের বানানো সিনেমা তিন রকমের, প্রথম-দ্বিতীয়, এরকম কিছু নেই। মৃদু হাসলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, শেক্সপিয়ারের নাটক নিয়ে কী ধারণা? বললাম, স্কুলে একবছর মার্চেন্ট অফ ভেনিস এবগ পরের বছর জুলিয়াস সিজার পড়েছি। সিনেমায় কিছুদিন আগেই পিটার গ্রিনওয়ের প্রসপেরোস বুক (টেম্পেস্ট) দেখেছি, তাছাড়া বিশাল ভরদ্বাজের ওমকারা (ওথেলো) দেখেছি। লরেন্স অলিভিয়ের কে চিনেছি শেক্সপিয়ারের নাটক নিয়ে করা সিনেমা দিয়ে।

আমার উত্তর শুনে উনি যেন একটু মজাই পেলেন। তারপর এল আজকের শাজাহানের প্রসঙ্গ। বললাম, উৎপল দত্তের নাটক, এর চেয়ে বেশি আর কিছু জানিনা। বললেন, অসুবিধা নেই। শুনেছি ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে যাতায়াত আছে। সেখান থেকে শেক্সপিয়ারের নাটক নিয়ে বইপত্র লাগবে, বিশেষ করে যে সব বইতে নাটকের সিনগুলির ছবি আছে। জানালেন, আজকের শাহজাহান নিয়ে উনি একটি সিনেমা করতে চলেছেন। স্ক্রিপ্ট লেখার আগে একটু রিসার্চ দরকার। করতে পারব? সিনেমা নাহোক, নাটক, রিসার্চ তো। এরকম সুযোগ কতজনে পায়। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, পারব।
দিন সাতেকের কাজ ছিল আমার। ওই সাত দিনে তিনবার বাড়িতে গেছি। বইপত্র, যেরকম চেয়েছিলেন, কিছু পাওয়া গেছিল, কিছু পায় যায়নি। পরে শুনেছি লন্ডন থেকেও কিছু বই এসেছিল, নাটকের কস্টিউম নিয়ে। আমার করা প্রত্যেকটি নোটস উনি পড়েছিলেন, যেখানে যেখানে প্রশ্ন ছিল, আমাকে দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই সিনেমাটা ইংরেজিতে ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় করা যাবে না। ওই কদিনে শিখলাম ডিটেলিং কি করে করতে হয়। প্রপ্স থেকে পোশাক, ঘরের মধ্যে কোথায় কী থাকবে, ওন স্ক্রিন কে কি খাবে, দরজা জানালার পর্দার রং কি কি হতে পারে, এই সব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দেখতাম। লাইব্রেরি থেকে আনা বইগুলোর ছবিকে আরো বড়ো করে ডিটেল স্টাডি করা হতে দেখেছি। দর্শকদের লাস্ট লিয়ার সিনেমারটার এন্ড মোন্তাজ হয়ত মনে থাকবে।

‘কিং লিয়ার’ নাটক থেকে একটি আইকনিক ঘটনাকে উপজীব্য করেছিলেন ঋতু দা। অন্ধ আর্ল অফ গ্লস্টার-এর পাহাড়ের চূড়া থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা। নির্বাসিত এবং বর্তমানে ছদ্মবেশে থাকা সেই ‘সৎ’ পুত্রটি তার পিতার অন্ধত্বের সুযোগ নিয়ে এবং সমতল ভূমিকেই পাহাড়ের কিনারা বলে বিশ্বাস করিয়ে, পিতাকে কেবল মৃত্যু থেকেই নয়, বরং গভীর হতাশা থেকেও রক্ষা করে। এই দৃশ্যটি ‘মেটা-থিয়েট্রিক্যাল’ বা নাটকের ভেতরের নাটকীয়তার এক দৃষ্টান্ত; কারণ শেক্সপিয়রের মঞ্চে পাহাড়ের চূড়াকে তো এমনিতেই কেবল কল্পনার মাধ্যমেই অনুভব করে নিতে হয়। এই ব্যাপারটাকেই নিজের মতন করে সিনেমার স্ক্রিনে ফুটিয়ে তোলেন পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ। এই সব চিন্তাধারার জন্যই বোধহয় তিনি এতটা আলাদা ছিলেন, ।
পরে যখন কাস্টিং এর ডিটেলস জানলাম, শুটের সিডিউল জানলাম, খুব ইচ্ছে ছিল শ্যুটিং দেখার,কিন্তু ওই সময়তেই প্রায় মাসখানেক কলকাতার বাইরে টানা কাজ পড়ল। রিলিজ করার অনেক পরে সিনেমাটা দেখেছিলাম। তখন অন্যরকম অনুভূতি, যা বলার নয়।