“একুশে আইন আর গণেশ পাইন।
আমাদেরই জন্য। সব আমাদেরই জন্য।”
– কবীর সুমন

একটি নীলাভ অন্ধকার। তার মধ্যে ভেসে উঠছে একটি মুখ, একটি কঙ্কাল, কিংবা কোনো অদ্ভুত পাখি। যেন বাস্তব আর অবচেতনের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে তারা। গণেশ পাইনের ছবি দেখার অভিজ্ঞতা যেন একটি রহস্যময় জগতের সামনে এসে দাঁড়ানো।
১৯৩৭ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন গণেশ পাইন। তাঁর শৈশব কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অস্থির সময়ে। শৈশবের দেখা মৃত্যু, ভয় এবং অনিশ্চয়তা তাঁর কল্পনার জগৎকে নির্মাণ করেছে, যার ফলে তাঁর ছবিতে মৃত্যুর উপস্থিতি বারবার ফিরে আসে। কখনও কঙ্কাল, কখনও মুখোশ, কখনও বা কোনো অদ্ভুত পৌরাণিক প্রাণীর রূপে।

কলকাতার আর্ট কলেজে পড়াশোনা করে তিনি একটি অ্যানিমেশন স্টুডিওতেও চাকরি করতে শুরু করেন। প্রথম দিকের ছবিতে তিনি জলরঙে কাজ করতেন। সেই সময়ের ছবিগুলোতে দেখা যায় প্রকৃতির প্রভাব আর সূক্ষ্ম রেখার ব্যবহার। ষাটের দশকে তাঁর কাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। জলরঙের বদলে তিনি গৌয়াশ ও পরে টেম্পেরা মাধ্যম ব্যবহার করতে শুরু করেন। টেম্পেরার স্তরে তাঁর ছবির মধ্যে গভীরতা ও আলোক-অন্ধকারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সময় থেকেই তাঁর ছবিতে রহস্যময় চরিত্র, মুখোশ, ছায়াময় অবয়ব এবং স্বপ্নের মতো দৃশ্য বেশি দেখা যায়।
সত্তর ও আশির দশকে তাঁর শৈশবে প্রত্যক্ষ করা দাঙ্গার স্মৃতি, মৃত্যু ও সহিংসতার অভিজ্ঞতা দেখা যায়। সমাজের অস্থিরতা এবং মানুষের অস্তিত্বসংকট তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে আসে। কঙ্কাল, ভাঁড়, নৌকা, প্রাণী, অস্ত্র কিংবা পৌরাণিক ইঙ্গিত, এ সবই যেন মানুষের ভয়, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতীক।

পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্প আরও অন্তর্মুখী ও দার্শনিক হয়ে ওঠে। মহাভারত, বাংলা লোককথা এবং ইতিহাসের উপেক্ষিত চরিত্রদের তিনি নতুন ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। মৃত্যুচেতনা তখনও তাঁর কাজে উপস্থিত, কিন্তু তা আর শুধু ক্ষয় বা ভয়ের প্রতীকের ঊর্ধ্বে তা এখন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সত্য। তাঁর ছবির চরিত্রগুলি যেন কোনো রূপকথা থেকে উঠে আসা মানুষ। রাজা, যোদ্ধা, জাদুকর, কঙ্কাল, পাখি কিংবা ঘোড়া, সবাই যেন কোনো গোপন গল্পের অংশ। ছবির গভীর নীল অন্ধকারের ভিতরেই যেন লুকিয়ে থাকে মানুষের অস্তিত্ব এবং বিস্ময়ের অনন্ত অনুসন্ধান।
চিত্রকর এবং অধ্যাপক পরাগ রায় জানালেন, গণেশ পাইনের শিল্পভাষা একদিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সূত্রে গড়ে ওঠা ভারতীয় শিল্পধারার উত্তরাধিকার বহন করে, অন্যদিকে সেই ঐতিহ্যকে আধুনিকতার আলোয় নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। একই সঙ্গে তাঁর শিল্পে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নানা শিল্পভাবনার সৃজনশীল সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। পরাগবাবুর কথায়, তিনি শিল্পকে নিয়ে নিরন্তর ভাবতেন এবং নিজের কাজকেও কঠোর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বিচার করতেন। একটি ছবি দীর্ঘ সময় ধরে নানা সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতো। অসংখ্য স্কেচ, নোট, ভাবনা এবং দীর্ঘ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাঁর ছবি চূড়ান্ত রূপ নিতো। পরাগবাবু আরও জানালেন, তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে বিকাশ ভট্টাচার্য, লালুপ্রসাদ সাউ, যোগেন চৌধুরী প্রমুখও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাজেই দেশজ সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য এবং শিকড়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক দেখা যায়। গণেশ পাইনের শিল্পও সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, তবে তাঁর কল্পলোক, প্রতীকী ভাষা এবং রহস্যঘন আবহ তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

চিত্রকর এবং শিক্ষক রজত ঘোষ জানালেন, গণেশ পাইনের গ্রাফ পেপারের উপর নির্মিত কাজ, ফ্রেমের ক্রমবর্ধমান বিস্তার এবং ছবির গঠন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দুর্গা-চিত্রগুলিতে দৃষ্টি, রঙের ব্যবহার এবং অয়েল প্যাস্টেলের অভিনব প্রয়োগ ভারতীয় শিল্পকলায় অন্যন্য। রজতবাবু আরও জানালেন, ছবিতে ঘোড়া বা অন্যান্য মোটিফের সঙ্গে রঙ ও পটভূমির ব্যবহার তাঁর দ্বিমাত্রিক ছবিগুলোকেও গভীর করে তোলে। রজতবাবুর মতে গণেশ পাইনের ছবিতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় কম্পোজিশন। ছবির প্রতিটি উপাদান এত নিখুঁত ভারসাম্যে স্থাপিত যে কিছু বদলানো অসম্ভব বলে মনে হয়।
ঐতিহ্য, আধুনিকতা, লোককথা, নিঃসঙ্গতা, এবং কল্পনার অসীম বিস্তার, এ সব কিছুর অনন্য সমন্বয়ের মাধ্যমে, গণেশ পাইনের ছবি আজও বাঙালির গর্ব এবং ভারতীয় শিল্পকলার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
