সৌম্যা ঘোষ

বাঙালির একটা সত্তর দশক ছিল। সেই দশক নিয়ে বিস্তর নস্টালজিয়ার চর্চা হয়ে চলেছে আজও। কিন্তু, তারপর, চুপিচুপি এসেছে আশি-নব্বই দশক। সত্তরের দাউদাউ আগুন সেখানে না থাকলেও, বিশ্বায়ন-পূর্ববর্তী অজস্র হেরে যাওয়া ও মন কেমনের বাঙালিয়ানা জড়িয়ে ছিল সে-সব দশক জুড়েও।
সবুজ মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় এবং রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়— তিন জনের লেখাতেই ধরা পড়েছে সেই সব আলো-ছায়া। কেউ বা লিখেছেন উত্তর কলকাতার নস্টালজিয়া, কেউ লিখেছেন ভবানীপুরের পুরোনো ভাঙা বাড়ি ছেড়ে আসার যন্ত্রণা ও স্মৃতিকাতরতা, তো কেউ বিজয়গড় কলোনি পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তী ও পুজোর প্রেম। ট্রামলাইন খোঁজ নিল নব্বই দশকের এই সব অনালোচিত অধ্যায়ের।

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ‘নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা’ লিখতে লিখতেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপে’র কল্পনা ও নির্মাণ। এই বইটিতে উত্তর কলকাতার নব্বই দশকের জীবন বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে আছে, বিভিন্ন নামে…
উত্তর কলকাতার পুরোনো ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে একটা লোক। চোখের সামনে ভেসে উঠছে পরিষ্কার কিছু স্মৃতি… ছবির নাম ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’—
সরস্বতী পুজোর দিন রিকশা করে তিতির ওরফে সুরঙ্গনার আসা… ভারতনাট্যমের সাজ ও হলুদ পোশাক। ফোয়ারা তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে…
নব্বই দশকের গণেশের দুধ খাওয়া নিয়ে পাড়ায় অদ্ভুত শোরগোল পড়ে যাওয়া…
উত্তর কলকাতার সেন্ট মার্গারেট ইস্কুলের ছাত্রী তিতির। স্কুল-ফেরতা তিতিরের পিছু নিয়ে এগিয়ে চলেছে ফোয়ারা… ইনফ্যাচুয়েশনের চেনা ছবি।
তিতির-ফোয়ারার জীবনে প্রথম সূর্যগ্রহণ দেখা… একসঙ্গে। একটা এক্স-রে’র প্লেট, কালো চশমা, আর তারা দু’জন। একান্তে… প্রথম তাদের এতটা কাছকাছি আসা। তাদের জীবনের প্রথম চুম্বন…
গঙ্গার ঘাটে বসে তাদের প্রেমালাপ… খুব কম টাকায় একটা এগরোল…
আর, মতি নন্দীর বিভিন্ন চরিত্রদের মতোই রজতাভ দত্তের চরিত্রটি। নিজের জীবনে না পারলেও, ফুটবল ম্যাচে তার ছাত্ররা জিতে ফিরেছিল…

হিন্দি সিনেমায় যে উত্তর কলকাতা দেখি, এই ছবির সেই একই জনপদ কত যেন আলাদা…কানাগলিতে গাড়ি আটকে যাওয়া, ছোটবেলার প্রথম নেশা, যৌনতা, পুজো…আর, আস্ত একটা পাড়া বড় করছে এক বাবা-হীন নাবালককে…এই অপার মায়ার ছোটবেলার কথাই এঁকেছেন অনিন্দ্য, এ ছবিতে…যে সময়টা হারিয়ে গিয়েছে অজান্তেই বিগত দশকের আড়ালে…
নব্বই দশক নিয়ে এ হেন উত্তর কলকাতার চর্চার পাশেই আর এক জনপ্রিয় অধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার আর এক জনপ্রিয় পাড়ার গল্প, লিখেছিলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বাধীনতার পর থেকেই ওপার বাংলা থেকে আসা মধ্যবিত্ত বাঙালিরা জড়ো হয়েছিল এইসব কলোনিতে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয়গড় ছিল তেমনই এক পাড়া। সেখানে রবীন্দ্রজয়ন্তীর ভোরবেলায় গানের স্কুলের বান্ধবীরা যেমন আছে, তেমনই আছে দুর্গাপুজোর সাদামাটা অষ্টমীর সন্ধে। ঊষা কোম্পানির উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কলোনি পাড়ার বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। আজ তার পাশেই গড়ে উঠেছে সাউথ সিটি শপিং মল। তবু, অনেক না পাওয়ার মাঝেও খুব সাদামাটা নানান শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে রঙিন এক ছোটবেলা কাটিয়েছেন রাহুল। সেখানে রিকশাওয়ালা, বেলুনওলা, দোকানদার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গেই মিলেমিশে বেঁচে থাকে সাধারণ বাবা-মা থেকে অসাধারণ অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দারাও। রাহুল এই ‘কলোনি কল্লোললিনী’র কথা ধারাবাহিক লিখে গিয়েছেন বিজয়গড়কে ঘিরে।
একটু এগিয়ে যাওয়া যাক।
সত্তর-আশির দশক। শহরতলির এক ঝগড়ামাখা প্রেমের গল্প ‘বসন্ত বিলাপ’ চলচ্চিত্রে আমরা কে না দেখেছি!
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সেখানে রয়েছেন রবি ঘোষ, চিন্ময় রায়, অনুপ কুমার। ছেলেদের দল।
আর অপর্ণা সেনের নেতৃত্বে কাছেই আর একটা মেসে রয়েছে মেয়েদের দল। চলচ্চিত্র জুড়েই চলতে থাকে তাদের মধ্যে একের পর এক ঝগড়া। কখনও সরস্বতী পুজো, দোল, কখনও বিয়ের পাত্রের পোস্টার… অবশেষে চার জনের সঙ্গে চারজনের প্রেম! এই সহজসরল প্রেম আর ‘বসন্ত বিলাপ’।
এই সহজ-সরল ভালো

বাসা-প্রেম-ঝগড়ার দিনকাল নব্বইয় পরবর্তী বিশ্বায়নের দাপটে হারিয়ে গিয়েছিল। আর, সে কথাই লিখেছেন সবুজ তাঁর স্মৃতিকথায়। সে কথায় আসব। কিন্তু, তার আগে আর এক হারানো বাঙালিয়ানার গল্প। তরুণ মজুমদারের পরিচালনায় ‘দাদার কীর্তি’ ছবিতে খোঁজ মেলে এইসব বাঙালির। ঘাটশিলা-সম্বলপুরের মতোই এক জনপদ এই গল্পের পটভূমি। সেখানেও অনুপ কুমারের নেতৃত্বে একদল ছেলেপিলে এবং ‘ছন্দবাণী’ ক্লাবকে ঘিরে এগোতে থাকে গল্প। পুজো আসতে আর ক’দিন বাকি। ঘনঘন চলছে নাটকের রিহার্সাল, তার মাঝেই কোথা থেকে এসে পড়ে এক সুবোধ বালক (তাপস পাল অভিনীত চরিত্রটি)। এই বালককে নানাভাবে মজার ছলে হেনস্থা করতে থাকে অনুপ কুমার বাহিনী। আর, এরই পাশে মহুয়া অভিনীত এক নিষ্পাপ যুবতীর সঙ্গে প্রেমও হয় সুবোধ বালকটির। এভাবেই, হাসি-রাগ-অভিমান-ঝগড়া-আপস মিলে হারিয়ে যাওয়া বাঙালিয়ানার এক চির দলিল হয়ে থাকে ‘দাদার কীর্তি’।
সবুজ মুখোপাধ্যায়ের ‘২৪ নম্বর শ্যামানন্দ রোড’। সবুজ লিখছেন, ‘নেহাতই এরকম নয় যে ছোটবেলাকার হজমিগুলি, লোডশেডিং-এর লম্ফ…র কথা…

একটু বৃষ্টি, দেওয়ালে ফাটল, একটা ঘুলঘুলি, টিউবলাইট, চিনির আকাল ঠিকই কিন্তু পাশের বাড়িই ভরসা, জাঁকজমকপূর্ণ থিম নয়— পাড়ার বারোয়ারি দুর্গাপুজো, স্রেফ একটা ডিসি পাখার জন্য পাশের বাড়িতে টিভি দেখার অসুবিধে— আর, একসাথে বেঁচে থাকার আনন্দ…
সবুজ যেন বা একটা প্রলাপ লিখে চলেন। স্মৃতিতাড়িত এক প্রলাপ। নিজের যা কিছু হারালো, তার অনিবার্য তালিকা যেন বা…
পি কে দে সরকারের ইংরেজি গ্রামার; প্রাথমিক ইংরেজি তুলে দেওয়াতে কংগ্রেসের বিক্ষোভ…
পুজোর ছুটিতে দুপুরবেলায় মৃণাল সেনের ‘একদিন প্রতিদিন’ রুদ্ধশ্বাসে গিলে ফেলা…
একদিন সকালবেলায় বেলতলা স্কুলের সামনে কী ভিড়! ‘খারিজ- এর শুটিং হল আমাদের পাড়ায়।’ সে সময়ে সিনেমা হলে সত্যজিতের ছবি দেখাটা কালীঘাটে পুজো দেওয়ার মতোই একটা পবিত্র কর্তব্য বলে মনে করত মধ্যবিত্ত বাঙালি।
দুর্গাপুজো তখনও এরকম কর্পোরেট রূপ ধারণ করেনি… একমাত্র পুরস্কার বলতে ছিল এশিয়ান পেইন্টস..
বিজয়া দশমীর দিনে সকাল থেকে মায়ের কুঁচো নিমকি ভাজা…বোরোলিনের সংসার, শনিবার দুপুরের রেডিও, জীবনবীমা করাতে আসা ভাঙাচেহারার মানুদি, কেওকারপিন তেলের গন্ধ…
এভাবেই বিশ্বায়ন পূর্ববর্তী একটা জনপদকে খাবলা মেরে তুলে আনেন সবুজ…

কিন্তু এই মধ্যবিত্তের ভবানীপুর ছেড়ে চলে যেতে হল তাদেরও…ভিনদেশী উচ্চবিত্তদের জন্য হাজারো-হাজারো ফ্ল্যাট উঠতে লাগল পুরোনো বাড়িগুলো ভেঙে। তারপর বিশ্বায়নের এক ধাক্কায় ছিটকে গেল পুরোনো লোকজন থেকে শুরু করে আটপৌরে দোকানপাট—সবকিছুই।… বাঙালি মধ্যবিত্ত-পাড়ার আর্থ-সামাজিক-সংস্কৃতি ভারসাম্যটাই নষ্ট হয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল অনেক না পাওয়ার পরেও একসাথে হাতে হাত ধরে বেঁচে থাকার মধ্যবিত্ত জীবন…
সবুজ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, নব্বই দশক থেকে এটা ভেঙে পড়তে শুরু করে। বিকল্প কোনও ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না, শুধুই প্রোমোটারের বাড়ি ভাঙার শব্দ বাড়তে থাকে মাঝরাতে…বিশ্বায়ন মানুষকে বোঝায়, ব্র্যান্ডই এখন ‘স্টেটাস! একই ধরণের পোশাক, একই খাদ্যাভ্যাস, একই বিনোদন, মাল্টিপ্লেক্স, পাঁচ তারা হোটেল…যা কিছু ব্যতিক্রমী, অন্য রকম, নিজস্ব তা সবকিছুকেই যেন-বা এবারে ধ্বংস করতে নেমেছে বহুজাতিকরা…
নব্বই সালের পয়লা জুন।
ভবানীপুরের বাড়িটি ছাড়তে হয় সবুজদের।
তাঁর কথায়, ওই গোটা পাড়াটা যেন ছিল পরিবারেরই একটা অংশ। কে কখন পাশের বাড়িতে ঢুকে পড়ছে, গিয়ে টিভি দেখতে বসে যাচ্ছে… এই ব্যাপারগুলো অদ্ভুত রকম। বলছিলেন, ‘বাড়ি ছাড়ার পর থেকেই, আমি কিছু একটা লিখবো ভেবেই আঁকিবুকি কাটার মতো করেই লিখতাম, এক লাইন, দু’লাইন, আবার এক লাইন, দু’লাইন… চার-পাঁচ… হঠাৎ হতে হতে ছয়-সাত নাগাদ নির্দিষ্ট আকার নেয়। তখনই বইয়ের প্রোডাকশনটা শুরু হয়।”

বইটিতে অনবদ্য কিছু অলংকরণ রয়েছে। সাধারণ জলরঙে আঁকা, ফটোগ্রাফও রয়েছে অনেক। শিল্পী চন্দ্রানী বোস এঁকেছেন ছবিগুলি। সবুজ জানালেন, এ বই স্রেফ আত্মজীবনী নয়, নেহাত নস্টালজিয়াও নয়। নব্বই পরবর্তী উন্নয়নের যে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজ বদলের গল্প, তাই অন্যভাবে ধরা রয়েছে এখানে…
বইটি নিয়ে প্রথম রিভিউ লিখে প্রশংসা করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, নবারুণ ভট্টাচার্যরা। আজকের নব্বই চর্চার প্রথম বই বললেও, এ বইটি সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা হয় না..
বইটি পড়তে পড়তে নিঃসন্দেহে ফিরে যাওয়া যায় পুরোনো দিনগুলোতে।
চোখ বন্ধ হয়ে আসে… মনে পড়ে গরমের ছুটি, মায়ের আঁচলের গন্ধ… যারা বেঁচে থাকাকে সহজ করে দিয়েছিল।
মনে পড়ে, দেওয়ালের ফাটল-জল পড়া-শ্যাওলা ধরা উঠোন-নোনা ধরা পলেস্তারা… তবুও যে বাড়িতে এখনও অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায়।
বেঁচে থাকাই তো আসল। চাকচিক্য যে সহজকে কেড়ে নেয়…!
গত তিন-চার দশকের হারিয়ে যাওয়ার দলিল এভাবেই গেঁথে রাখা আছে এইসব বই ও সিনেমায়। বাঙালি দেশভাগ দেখেছে। দেখেছে সত্তরের আগুনের দিনকাল, দেখেছে বিশ্বায়নের ঝড়ে চুরমার হওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবন। সেই ঝড়ে হয়তো হারিয়ে গিয়েছে টেনিদা-ফেলুদা-ঘনাদারা… হারিয়েছে চাটুজ্জ্যেদের রকও। বাঙালির আজ খুব তাড়া!
সকাল দশটায় আজ তাদের কার্ড পাঞ্চ করতে হয় সেক্টর ফাইভে… তারপর বিকেল-সন্ধে তাদের কাটে ব্যাংকক বা মরিশাসে।
তবুও বেঁচে আছে কলকাতা…
বেঁচে আছে আটপৌরে বাঙালি জীবন…!