
বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘুম উধাও। রাত তিনটেয় খেলা দেখে সকাল আটটায় গড়িয়াহাট মার্কেটের চায়ের দোকানে হাজির—চোখের নীচে কালি, হাতে মাটির ভাঁড়, কিন্তু ফুটবল বিশ্লেষণে সবাই যে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, তা বলাই বাহুল্য!
“দেখতাছিস? এম্ব্যাপে দুটো গোল দিয়েছে! এবার ফ্রান্সকে কেউ আটকাতে পারবে না!”—চায়ের কাপ নামিয়ে ঘোষণা করলেন পাড়ার অরুণকাকু। ব্রাজিলের হালকা সাপোর্টার আগেরদিনের খেলা দেখে তিনি বেশ বিরক্ত। সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ ঘোষ জ্যেঠুর, “ধুর মশাই! মেসি হ্যাটট্রিক করেছে। বয়সটা শুধু পাসপোর্টে বেড়েছে, মাঠে এখনও জাদুকর!”
পাশ থেকে মাছওয়ালা নিতাই বলে উঠল, “মেসি-এম্ব্যাপে নিয়ে আপনারা মারামারি করুন, কিন্তু নেইমার আর রোনালদো কী করবে সেটা বলুন! ওরা কি শুধু ইনস্টাগ্রামে স্টোরি দেবে?” এদিকে, চায়ের দোকানের মালিক বছর পঞ্চাশের মন্টুদা ইতিমধ্যে দ্বিতীয় কেটলি বসিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি জানেন, এই তর্ক অন্তত আরও দেড় ঘণ্টা চলবে।
অরুনকাকু বিজ্ঞের মতোই বললেন, ফ্রান্স গত কয়েক বছরের হতাশা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে ফিরেছে। এম্ব্যাপের গতি আর আক্রমণভাগের ধার দেখে অনেকেই তাদের শিরোপার দাবিদার বলছেন। প্রায় ট্যাকল করে কাউন্টারে গেলেন ঘোষ জ্যেঠু। তার মতে আর্জেন্টিনা এখনও আত্মবিশ্বাসের চূড়ায়। মেসির প্রতিটি ছোঁয়া নিয়ে টেলিভিশনের স্টুডিওতে এমন আলোচনা চলছে, যেন তিনি শুধু ফুটবল খেলেন না—মহাকাশযানও চালান। ঘোষ জ্যেঠু আবার টিকিট কেটে মেসিকে না দেখতে পাওয়ার দলে। ৮৬তে মারাদোনা, তারপর ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা হয়ে এখন মেসি-সৰ্বস্ব!

এদিকে পাড়ার ফচকে রোনালদো-ভক্তরা চুপচাপ বসে নেই। তাঁদের যুক্তি, “শেষ হাসিটা সিআর সেভেনই হাসবে।” নেইমার-সমর্থকদের বক্তব্য, “যে লোক এক পায়ে নাচতে নাচতে ডিফেন্ডার কাটাতে পারে, তাকে কখনও বাতিল করা যায় না।”
মজার বিষয় হলো, গড়িয়াহাটের চায়ের দোকানে উপস্থিত প্রায় সবাই নিজেকে জাতীয় দলের কোচ ভাবেন। একজন বলছেন, “স্পেনের মিডফিল্ড বদলানো উচিত।” আরেকজনের দাবি, “হল্যান্ডের ডিফেন্স আমি হলে অন্যভাবে সাজাতাম।”
যাঁরা জীবনে স্কুল টিমেও খেলেননি, তাঁরাই সবচেয়ে জোরে কৌশল বোঝান। আর তর্কের উত্তাপ এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, চায়ের দোকানের বিস্কুটও যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়—একদল আর্জেন্টিনা, অন্যদল ফ্রান্স।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য কোনও সিদ্ধান্ত হয় না। শুধু আরও এক কাপ চা আসে, আর সবাই বলে, “দেখা যাক, মাঠই শেষ কথা বলবে!”
আসলে বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়। এটা বাঙালির রাতজাগা, আড্ডা, তর্ক, ভবিষ্যদ্বাণী আর চায়ের ভাঁড়ে ভেসে ওঠা এক অদ্ভুত উৎসব—যেখানে প্রত্যেক নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত দর্শকই মনে মনে নিজেকে বিশ্বকাপজয়ী কোচ বলে বিশ্বাস করেন।