(কথা বলার ভিত্তিতে লিখেছেন সৌম্যা ঘোষ)
দ্বিতীয় পর্ব

নবারুণদা একটা কথা খুব বলত, আমি মার্ক্সবাদের হয়েও যেমন বলতে পারি, তেমন মার্ক্সবাদের
বিরুদ্ধেও অনেক তথ্য আমার কাছে আছে।
মানে, একটা বিষয়ের উপর একজনের কতটা দখল, কতটা গভীর পড়াশোনা থাকলে এই কথাটা সে বলতে পারে!
এই কথাগুলো যখন আমাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা হত, তখন কিন্তু আলোচনা সভায় যতটা সিরিয়াসলি বলত, সেভাবে সিরিয়াস হয়ে বলত না। কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম যে কথাগুলোর মধ্যে অসম্ভব একটা গভীরতা আছে।
তাই আমাকে বলত, ‘প্রচুর পড়াশোনা করিস বা না করিস, সেটা নিয়ে আমি অত ভাবি না, কিন্তু তুই যে এই বিষয়গুলো বুঝতে পারিস, সেটা আমি বুঝতে পারি। এই জন্যই তোর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব।’ আর এই একই কারণে অজয়দা আমায় এত ভালোবাসে।
মনে আছে, আমাদের অফিস শুরু হত খুব সকালে। একদিন কাজের জন্য গড়িয়াহাট গিয়েছি। আমাদের অফিস বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে।
তো, বাসে উঠেই দেখি সামনের সিটে বসে আছে নবারুণদা! গল্ফগ্রিন থেকে বাসে উঠেছে। কিন্তু আমাকে দেখেই গম্ভীর ভাবে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। তো, আমি গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছি, তবু তাকাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বললাম, ‘মুখটা কেন ঘুরিয়ে নিলে?’
বলল, দেখ, এই আট ঘন্টা অফিসে ওই একই মুখ দেখতে হয়। এবার, গড়িয়াহাট থেকেই একই মুখ দেখা শুরু হলে, প্রায় ন’ঘন্টা সহ্য করতে হবে… তাই মুখটা বাধ্য হয়ে ঘুরিয়ে দিলাম। ভাবুন, কতটা মজার মানুষ হলে এটা করতে পারেন!
নবারুণদাকে আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ও সিপিএম কি না!
বলত, না… আমি কোনও সিপিএম-ও নই, সিপিআই-ও নই, কংগ্রেসও নই। আমি র্যডিকাল মার্ক্সিস্ট। আমি আমার মতো করে মাক্সিজিমকে বুঝি।
সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে নবারুণদার অত্যন্ত উচ্চ ধারণা ছিল। বিপ্লব থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিকাশ… কিন্তু সোভিয়েত নিজের চোখে দেখে এসে অসম্ভব গালাগাল করেছিল।
আমাদের অফিস থেকে প্রতি বছর এক-দু’জন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠানো হত। অভিজ্ঞতার জন্য, ঘুরে দেখার জন্য, লেখার জন্য…
নবারুণ দা বলেছিল, এরপর যদি আমাকে টাকা দিয়েও পাঠায়, আমি আর যাব না। বললাম, কেন?
বলল, একটা অদ্ভুত সোসাইটি! তুই ধর পার্কে বসে আছিস কিন্তু তুই ফিল করবি পেছনে পুলিশ বা সিভিল ড্রেসে কেউ তোকে ফলো করছে। তুই বিদেশ থেকে এসেছিস, ওদের কোনও খবর সংগ্রহ করছিস কি না, এইটা আমি মেন্টালি নিতে পারি না। আমার সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে অন্য ধারণা ছিল।
নবারুণদা এমনই…যা বিশ্বাস করত, বলে দিত…
রোজকার বাস্তব থেকেই নবারুণদার লেখা এসেছে।
আমি অজয়দা’র থেকে শুনেছি একটা সময় বিজনবাবুর সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী’র ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়… তখন বিজনবাবুর সঙ্গেই নবারুণদা..
আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না ওদের। অজয়দা বলছিল, নবারুণদা একটা জায়গায় লিখেছে, মাঝে মাঝে মহাশ্বেতা দেবী ওদের বাড়িতে আসতেন। বিজনবাবু থাকলেও আসতেন, না থাকলেও আসতেন। নবারুণদা লিখছে, ‘আজ বাড়িতে মা এসেছে, আজ আমাদের বাড়িতে ভাত রান্না হবে।’
এই যে কঠিন জীবনসংগ্রাম, এর মধ্যে দিয়ে নবারুণদা বড় হয়েছে। নবারুণদার বিশ্বাস ছিল যে, অনেক সময় অনেকের ক্ষেত্রে যে সরাসরি হয়তো সে কিছু করেনি, কিন্তু তার ফল তাকে ভোগ করতে হয়েছে। নবারুণদার সঙ্গে এটা ভীষণ ঘটেছে। সরাসরি নবারুণদা কিছু না করলেও অন্যের জীবনের নেতিবাচক প্রভাব তার জীবনে এসেছে। তাদের জন্যই নবারুণদার লেখা। তাই নবারুণদার লেখা অন্যরকম।
ভাবুন, দারিদ্র্য কোন জায়গায় যেতে পারে! কিন্তু তার সঙ্গেই স্ট্রাগল করে নবারুণদা লিখেছে, বাবার লেখা পড়ছে, বাবার নাটক দেখছে, তাঁকে অনুসরণ করছে, বিভিন্ন বই পড়ছে।
তবে, নবারুণদা কখনও মিথ্যে কিছু লেখেনি। তাঁর জীবনদর্শনটাই এটা ছিল। অনেক সাহিত্যিকই কত সহজে লেখে। কিন্তু, নবারুণের লেখায় পাঠক অতিরঞ্জিত কিছু পাবেন না।
কারণ, তার সব লেখাই জীবনবোধ থেকে লেখা। আজীবনের স্ট্রাগেল থেকেই লিখে গেছে নবারুণদা…
মনে পড়ে,
একবার বিহার বা অন্য কোথাও, কবি-সম্মেলনে গিয়েছিল নবারুণদা। সেখানে কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ নিয়ে হেঁটে ফিরছিল। ওই পথে একটা চায়ের দোকানে কোনও কারণে বচসা চলছিল। সেখানে ক’জন বাঙালিও ছিল। নবারুণদাকে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিনতে পেরে, ঝগড়ারত বাঙালিরা দলে টানার চেষ্টা করে। কিন্তু নবারুণদা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল, তিনি এসবে নেই। এরপর, তারা বলে, ঝগড়ায় বাঙালিদের সমর্থন করলেন না? আপনি কি আদৌ বাঙালি? উত্তরে নবারুণদা বলেছিল, ‘আমি খানকির ছেলে…’
এটাই নবারুণদা। বাঙালিদের চিরকাল ক্রিটিক্যালি দেখত নবারুণদা। বাঙালির এই দল পাকানো ব্যপারটাও পছন্দ করত না একদম নবারুণদা। এই বাঙালির কি ভবিষ্যৎ, তা নিয়ে নবারুণদা প্রায়ই নানা ব্যঙ্গ করত…
নবারুণদা দ্রুত কোনও ভাবনা এলেই, তা লিখে ফেলত। এটা বরাবর দেখেছি। অফিসে হয়ত ওর মাথায় কোনও আইডিয়া ঘুরছে, আমি তখন কিছু বলতে গেছি, হাত দেখিয়ে বলল, ‘চলে যা…’। কারণ, তখন লেখা ছাড়া কিছু মাথায় নেই ওর। লেখার শেষেই আমাকে শোনাল, তারপর অজয়দাকে…
আরেকটা মজার ঘটনা বলি, সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণের সঙ্গে এ ঘটনা জড়িয়ে।
তখন কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন বি.কে.সাহা। তো, সত্যজিতের মৃত্যুর পর তাঁর দেহ আনা হয়েছে ক্যাওরাতলা শ্মশানে। সেখানে একজন খুব নামকরা মাস্তান ছিল, স্বপন। তার সঙ্গে বি.কে সাহার সম্পর্ক ভালো ছিল। সত্যজিতের মৃতদেহ ঘিরে প্রচুর পুলিশ। বি.কে সাহাও ছিলেন সেখানে যথারীতি। কিন্তু স্বপনকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না।
ঢুকতে পারছে না দেখে ‘সাহাদা’ ‘সাহাদা’ বলে চিৎকার করে ওঠে স্বপন। এ ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়ায়।
সেটা পরের দিন কাগজে বড় করে বেরোয়।
নবারুণদা সে খবর পড়ে, তা নিয়ে মজার ছড়া লিখল এবং আমাকে পড়াল—
‘কাটলেট খায় আর লেটকাট মারে!
সাহা-দা সাহা-দা বলে স্বপন পুকারে’
এরকম মজার ছিল ছড়াটা…
অফিসে মাঝে মাঝে আমাদের ঝগড়া হত। তাতে ক’দিন আমি গম্ভীর হয়ে থাকতাম। তাতে নবারুণদা এসে বলত—
‘শোন, আমাদের যে ঝামেলাটা হয়েছে, সেটা কিন্তু এতটা সিরিয়াস নয় যে দু-দিন ধরে মুখ গম্ভীর করে থাকবি!’
আমি তখন হেসে ফেলতাম।
আর অজয় দা ছিল নবারুণের সম্পূর্ণ বিপরীত। মার্জিত ভাষায় কথা বলা, অসম্ভব আদর্শবাদী… তাই নবারুণ দা অজয় দাকে নিয়ে প্রচন্ড লেগপুলিংও করত।
চলবে