ইতালির মেয়ে মর্গানার কলকাতার স্মৃতিকথা। আজ দ্বিতীয় পর্ব ট্রামলাইনে। অনুবাদ করেছেন প্রত্যূষা পান।

আমি প্রথম কলকাতায় পা রাখি মার্চের শুরুর এক গরম দিনে। আমার জীবনের প্রথম ভারত-যাত্রা। পৃথিবীর দুই প্রান্তকে জুড়ে দেওয়া দীর্ঘ ভ্রমণের পর যখন বিমানবন্দর থেকে বাইরে বেরোলাম, তখন মনে পড়ে – এক ঢেউ উষ্ণ বাতাস আমাকে স্পর্শ করেছিল। শরীরের গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল সেই স্পর্শ। যেন প্রথমবার এক অপরিচিত নদীর জলে ডুব দিয়েছি। এই সর্বাঙ্গে হাওয়া-মাখা অনুভূতিটাই আজও আমি কলকাতায় ফিরলেই পাই। এই অনুভূতিই শহরটার সত্ত্বার এক অপরিহার্য অংশ বলেই আমার বিশ্বাস।
শহরটা এমন এক ছন্দ, এমন আশ্চর্য গতি যা তখনও আমি ভালো বুঝে উঠতে পারিনি। সময় লাগছিল। তবে অবিরাম হর্নের শব্দ, ধীরে বয়ে চলা হলুদ ট্যাক্সি, দিনের প্রতিটি প্রহরে রাস্তায় মানুষের স্রোত… অথচ, এসবের কিছুই আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা বলে মনে হয়নি। মনের গভীরে কোথাও এই ছন্দ যেন বাজছিলই, যেন আমার শরীর এমন এক ছোঁয়ায় আলোড়িত যার নাম তখনও আমার মন জানে না…

কলকাতার রাস্তার জীর্ণ, বিবর্ণ বাড়িগুলোতে জীবন ছড়িয়ে সর্বত্র। ফুটপাথে রান্না করছেন মানুষ, খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে বাচ্চারা, চায়ের দোকানিরা ছোট মাটির ভাঁড়ে চা ঢালছেন। সবকিছুই যেন উন্মুক্ত, দৃশ্যমান, প্রবলভাবে জীবন্ত। ব্যক্তিগত আর জনজীবনের মধ্যে দূরত্ব খুবই কম। আর আমি সেই জীবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতায়। তাই যতটা বিচ্ছিন্ন বা অপরিচিত লাগার কথা ছিল, ততটা একবারও লাগেনি…
আমি তখন একা, পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে এসেছি গ্রামাঞ্চলে গবেষণার কাজ করতে। প্রবল ভয় আর আশঙ্কা নিয়েই প্রথম পরিচয় এই শহরের সাথে। তবু নিজেকে কখনও নিঃসঙ্গ লাগেনি। বরং হয়তো জীবনে প্রথমবার, নিজের দেশ সুদূর ইতালির থেকে অনেক দূর এই শহরে এসে নিজেকে ঘরের মানুষ বলে মনে হয়েছিল।

সেই প্রথম কয়েকটা দিনের স্মৃতি আজও আমার কাছে এক আলো-আঁধারির মতো বিভ্রান্তি আর পরিচিতির মিশেল। মনে আছে, চারপাশে সব নাম না-জানা গাছপালা দেখে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলো ছিল আমার অভ্যস্ত আল্পস-পাহাড়ি প্রকৃতি বা ভূমধ্যসাগরীয় উদ্ভিদের জগতের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কলকাতার আবাহওয়ার উষ্ণতার সঙ্গে মানিয়ে নিতেও আমার সময় লেগেছিল। কিন্তু এখন যখন কলকাতার কথা ভাবি সেই উষ্ণতাই মনে পড়ে। মনে পড়ে এই শহরের মানুষের উষ্ণতা, যে উষ্ণতা আজও আমাকে ছুঁয়ে থাকে।
কয়েকদিন পর আমি শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম নতুন দিগন্ত আর অচেনা ভূদৃশ্যের দিকে। তাদেরও ধীরে ধীরে চিনতে ও ভালোবাসতে শিখেছিলাম। তবু পৃথিবীতে যদি এমন কোনও জায়গা থাকে, যেখানে আমি সত্যিই নিজেকে ঘরের মানুষ বলে অনুভব করি, তবে সেটা কলকাতার বিশৃঙ্খল রাস্তাগুলোর মধ্যেই, কলকাতার সমস্ত বৈপরীত্য আর অদ্ভুত সৌন্দর্যের ভিতরে।
